সময়ের দশকাহন

ব্লগাণ্ডের পরিমাপ সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও শন ক্যারল ২০১১ সালে তার কসমিক ভ্যারিয়েন্স ব্লগের সেরা লেখাগুলোর তালিকা প্রকাশের চেষ্টা করলেন। সেই তালিকা খুঁজে পেলাম সময় নিয়ে একটি মজার লেখা। সেটাই অনুবাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

যে কোন ভাষায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বিশেষ্য বোধহয় সময়, অথচ সেই সময় আজও রহস্যাবৃত রয়ে গেল। আমরা সম্প্রতি সমের প্রকৃতি নিয়ে একটি চমৎকার আলোচনসভা শেষ করেছি, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষকরা, আলোচনাগুলো ছিল খুব গভীর ও আলোকিত। আলোচনসভাটি থেকে আসা আমার মাথায় এখন হাজারো ধ্যান-ধারণা আর প্রশ্ন গিজগিজ করছে। সারাংশ তৈরির পরিবর্তে আমি এখানে সময় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করছি যা সবার জানা প্রয়োজন। আর আলোচনসভার ভিডিও অচিরেই অনলাইনে পাওয়া যাবে।

[এই সবগুলো বিষয়ই আমি সত্য বলে মনে করি। সবাই অবশ্যই এর সাথে একমত না যদিও তাদের হওয়া উচিত।]

১। সময়ের অস্তিত্ব আছে। প্রথমেই এই সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়া উচিত। সময় অবশ্যই অস্তিত্বশীল- অন্যথায় আমরা আমাদের অ্যালার্ম ঠিক করতাম কিভাবে? সময় মহাবিশ্বকে বিভিন্ন মুহূর্তের একটি ক্রমান্বয়িক ধারায় পরিণত করে। মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে যদি বাস্তবতা বদলে যেতো তাহলে কি অসুবিধা হতো একবার ভেবে দেখুন। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, সময় কি মৌলিক বা একটু অন্যভাবে বললে উত্থানশীল? আগে আমরা ভাবতাম তাপমাত্রা প্রকৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু এখন জানি তা পরমাণুর গতির ফলাফল ছাড়া কিছুই নয়। সময়ের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে উত্তর হবে: কেউ জানে না। আমি বাজি ধর বলতে চাই, হ্যাঁ। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, উত্তরটি জানতে হলে কোয়ান্টাম মহাকর্ষ আরও ভালভাবে বুঝতে হবে।

২। অতীত ও ভবিষ্যৎ সমিপরিমাণ বাস্তব। এটি সবাই পুরোপুরি গ্রহণ করে না যদিও করা উচিত। স্বজ্ঞা বলে- একমাত্র বর্তমানই বাস্তব, অতীত বইয়ের পাতায় লেখা ধ্রুব জিনিস, আর ভবিষ্যৎ এখনও ঘটেইনি। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান আমাদেরকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শেখায়: অতীত এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি ঘটনা বর্তমান মুহূর্তটিতে নিহিত আছে। প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতায় এটি মেনে নেয়া কষ্টকর, কারণ কোন এক মুহূর্তে বাস করে আমরা মহাবিশ্বের অতীত ও ভবিষ্যতের সবকিছু জানতে পারি না, এবং ভবিষ্যতেও কোনদিন পারব না। কিন্তু সমীকরণ মিথ্যা বলে না। আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন, “সুতরাং ভৌত বাস্তবতাকে ত্রিমাত্রিক অস্তিত্বের বিবর্তন নয় বরং একটি চতুর্মাত্রিক অস্তিত্ব হিসেবে ভাবাই বেশি স্বাভাবিক”।

৩। প্রত্যেকে সময়কে ভিন্নভাবে অনুভব করে। পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান উভয়ের প্রেক্ষিতেই এটি সত্য। পদার্থবিজ্ঞানে আগে আমরা আইজ্যাক নিউটন সাহেবের সময়ের ধারণা বিশ্বাস করতাম যাতে বলা হয়েছিল এটি সর্বজনীন এবং সবার জন্যই এক। কিন্তু পরে আইনস্টাইন এসে দেখালেন, কোন ব্যক্তির জন্য সময় কিভাবে অতিক্রান্ত হবে তা নির্ভর করে সে স্থানের মধ্য দিয়ে কিভাবে ভ্রমণ করছে (বিশেষ করে যদি বেড় আলোর বেগের কাছাকাছি হয়) বা তার উপর ক্রিয়ারত মহাকর্ষ বলের (বিশেষত যদি কৃষ্ণবিবরের কাছাকাছি থাকে) কতটুকু তার উপর। জীববিজ্ঞান বা মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পারমাণবিক ঘড়ির মাধ্যমে নির্ণয় করা সময়ের চেয়ে আমাদের দেহের অভ্যন্তরীন তাল এবং স্মৃতিসমষ্টি দিয়ে নির্ণীত সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুভবনির্ভর সময়চেতনা ব্যক্তি এবং অভিজ্ঞতা বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন বয়স্কদের সময় ছোটদের চেয়ে দ্রুত কাটে

৪। আমরা অতীতে বাস করি। আরও সূক্ষ্ণভাবে বললে বলতে হয় আমরা ৮০ মিলিসেকেন্ড অতীতে বাস করি। একই সাথে এক হাত দিয়ে নাক এবং অন্য হাত দিয়ে পা ধরার চেষ্টা করুন। আপনি স্পর্শ দুটি একই সময়ে অনুভব করবেন। কিন্তু এটা রহস্যময়- নিউরনের মাধ্যমে পা থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছাতে নাকের চেয়ে বেশি সময় লাগার কথা। সুতরাং বলতে হয়, আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতা সংগঠিত হতে সময় নেয়, আপনার মস্তিষ্ক বর্তমানকে অনুভব করার আগে সংশ্লিষ্ট সকল সম্ভরণের (ইনপুট) জন্য অপেক্ষা করে। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে ঘটনা সংঘটনের প্রায় ৮০ মিলিসেকেন্ড পর আমরা তা অনুভব করি। (আলোচনাসভায় অংশগ্রহণকারী ডেভিড ইগলম্যান এর বদৌলতে)

৫। স্মৃতি যতোটা মনে করা হয় ততো ভাল নয়। মস্তিষ্ক অতীত স্মরণ এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার জন্য অনেকটা একই পদ্ধতি ব্যবহার করে। পদ্ধতিটি যতোটা না ভিডিও রিপ্লে করার মত তার চেয়ে বেশি নাটক মঞ্চায়িত করার মত। লিখিত নাটকে ভুল থাকলে যেমন মঞ্চায়নেও ভুল থাকবে, তেমনি পদ্ধতিতে গলদ থাকলে আমরা মিথ্যা স্মৃতি পেতে পারি যা সত্য স্মৃতির মতোই ভাস্মর। এজন্যই দেখা যায়, আদালতে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা সবচেয়ে কম নির্ভরযোগ্য প্রমাণগুলোর একটি। (ক্যাথলিন ম্যাকডার্মট ও হেনরি রোডিগার এর মাধ্যমে)

৬। চেতনা সময় নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করে। অবধারণের অনেক ক্ষমতাই চেতনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যদিও এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এখনও যথেষ্ট নয়। কিন্তু সন্দেহ নেই যে, উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সময় এবং সম্ভাব্যতা নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। জলচরদের তুলনায় স্থলচর জীবদের দৃষ্টিভিত্তিক স্নায়ুক্ষেত্র অনেক বেশি বিস্তৃত বলে তারা সম্ভাব্য অনেকগুলো পদক্ষেপ বিবেচনা করে সর্বোত্তমটি বেছে নেয়ার যথেষ্ট সময় পায়। ব্যকরণ আবিষ্কারের ফলে আমরা এ ধরণের অনুকল্পিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যের সাথে কথাও বলতে পারি। অন্যান্য সময়ের ধারণা না থাকলে চেতনার বিকাশ অসম্ভব। (ম্যালকম ম্যাকাইভার)

৭। সময়ের সাথে সাথে বিশৃঙ্খলা বাড়ে। অতীত এবং ভবিষ্যতের মাঝে সকল পার্থক্য যেমন, স্মৃতি, বৃদ্ধায়ন, কার্যকারণ সম্বন্ধ, স্বাধীন ইচ্ছা ইত্যাদির কেন্দ্রে আছে একটি সত্য- মহাবিশ্ব শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলার দিকে বিবর্তিত হচ্ছে, বা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এনট্রপি বাড়ছে। শৃঙ্খলের (নিম্ন এনট্রপি) চেয়ে বিশৃঙ্খল (উচ্চ এনট্রপি) হওয়ার উপায় অনেক বেশি, তাই এনট্রপির বৃদ্ধি স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু অতীতের নিম্ন এনট্রপি অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হলে একেবারে মহা বিস্ফোরণে চলে যেতে হয়। আমরা এখনও কঠিন প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারিনি: মহা বিস্ফোরণের নিকটে এনট্রপি এত কম ছিল কেন, এবং এনট্রপি বৃদ্ধি কিভাবে স্মৃতি, কার্যকারণ সম্বন্ধ এবং সময়ের অন্য সব ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারে? (ডেভিড অ্যালবার্ট, ডেভিড ওয়ালেস এ নিয়ে চমৎকার বক্তৃতা দিয়েছে)

৮। জটিলতা আসে যায়। সৃষ্টিবাদী ছাড়া অন্য কারও “সুশৃঙ্খল” (নিম্ন এনট্রপি) এবং “জটিল” এর মাঝে পার্থক্য করতে সমস্যা হয় না। এনট্রপি বাড়ে, কিন্তু জটিলতা ক্ষণস্থায়ী; এটি জটিলভাবে বাড়ে এবং কমে যা মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। জটিল কাঠামোর অন্যতম একটি কাজ হচ্ছে এনট্রপি বাড়ানো, যেমন প্রাণের উদ্ভবের মাধ্যমে। অবশ্য এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতে এখনও অনেক দেরি আছে। (মাইক রাসেল, রিচার্ড লেনস্কি, রাইসা ডি’সুজা-র বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ)

৯। বৃদ্ধায়ন উল্টে দেয়া সম্ভব। আমরা সবাই দিনদিন বুড়ো হই যা সময়ের সাথে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বের এনট্রপি বাড়ার কথা, তার প্রতিটি খণ্ডাংশের নয়। অন্যথায় তো কোন হিমায়নযন্ত্র নির্মাণই অসম্ভব হয়ে পড়তো। জীবিত সত্ত্বাদের ক্ষেত্রে সময়ের তীর উল্টে দেয় প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের উপর নির্ভর করে, দৈহিকভাবে এটা অসম্ভব নয়। এবং কিছু ক্ষেত্রে আমরা এরই মধ্যে উন্নতি করছি: স্টেম কোষ, ঈস্ট এবং কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইঁদুরমানুষের পেশীকলা। একজন জীববিজ্ঞানী তো আমাকে বললেন, “আমি-তুমি চিরকাল বাঁচবো না, কিন্তু আমাদের নাতি-নাতনিরা অমর হবে না সে নিয়ে আমি বাজি ধরতে চাই না।”

১০। একটি জীবনকাল শত কোটি হৃদস্পন্দন। জটিল জীবেরা মৃত্যুবরণ করে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটা দুঃখজনক হলেও, বৃহৎ পরিসরে তা আসলে খুবই দরকারি; বৃদ্ধদেরকে সরিয়ে দিয়ে জীবন নতুনদের জন্য জায়গা তৈরি করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রাণীর বিপাক ক্রিয়ার সাথে তার দেহভরের আনুপাতিক সম্পর্ক আছে। বড় প্রাণীরা বেশিদিন বাঁচে এবং তাদের বিপাক ক্রিয়াও ধীরে ঘটে যে কারণে তাদের হৃদস্পন্দনের হার কম। এজন্য কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে নীল তিমি পর্যন্ত সকল প্রাণীর জীবনেই হৃদপিণ্ডের মোট কম্পন সংখ্যা সমান- আনুমানিক ১৫০ কোটি। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে সকল প্রাণী প্রজাতিই সমান সময় বেঁচে থাকে। ৯ নং বিষয়টি রপ্ত করে অমর হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরাও অন্য সব প্রাণীর সমান সময় বাঁচব।

এই লেখাতে মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s