হেগেল ও মার্ক্স

বিবিসি থেকে সম্প্রচারিত ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান দ্য গ্রেট ফিলোসফরাস (১৯৮৭) এ ব্রিটিশ দার্শনিক ব্রায়ান ম্যাজি অস্ট্রেলীয় দার্শনিক পিটার সিঙারের সাথে মূলত হেগেল এবং কিছুটা মার্ক্সকে নিয়ে কথা বলছেন। এটি একটি স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ।

ভূমিকা

ম্যাজি: বিশ্বের আমূল পরিবর্তনে হেগেলের মতো এত স্পষ্ট ভূমিকা খুব কম দার্শনিকই রাখতে পেরেছে। তার প্রত্যক্ষ প্রভাবটা রূপায়িত হয়েছে জার্মান জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে, আর পরোক্ষটা প্রকাশিত হয়েছে তার সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক শিষ্য কার্ল মার্ক্সের (বর্তমানের অনেকগুলো দেশই যার নামে নিজেদের পরিচয় দেয়) মধ্য দিয়ে। সুতরাং হেগেলের চিন্তাধারার ব্যবহারিক ফলাফলগুলো দেখার জন্য বর্তমানে আমাদের চারদিকে তাকানোটাই যথেষ্ট। আকাদেমীয় দর্শনেও হেগেলের প্রভাব বিশাল: অনেকে বলেন হেগেল-পরবর্তী দর্শনের ইতিহাসকে হেগেলের প্রতি বিভিন্ন দিক থেকে দেয়া কিছু জবাবের সমষ্টি হিসেবে দেখা যায়।

গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিশ হেগেল ১৭৭০ সালে জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় সারা জীবনই তিনি বিভিন্ন রকমের শিক্ষকতা করেছেন এবং ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে প্রথমে হাইডেলবার্গ এবং পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হয়েছিলেন। দার্শনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে তার অনেক দেরি হয়েছিল—প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইটি লিখেছিলেন ৩৭ বছর বয়সে—কিন্তু ১৮৩১ সালে যখন মারা যান তখন তিনি নিঃসন্দেহে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলো হচ্ছে Phänomenologie des Geistes (মনের রূপতত্ত্ব), Wissenschaft der Logik (যুক্তির বিজ্ঞান), Grundlinien der Philosophie des Rechts (ন্যায়ের দর্শন), Vorlesungen über die Philosophie der Weltgeschichte (ইতিহাসের দর্শন)।

হেগেলের অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই অনেক বিখ্যাত হয়েছেন, কিন্তু অন্য যে কারো চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত নিঃসন্দেহে কার্ল মার্ক্স। মার্ক্স ১৮১৮ সালে জার্মানির ট্রিয়ারে জন্মেছিলেন এবং ছাত্রাবস্থায় পুরোদস্তুর হেগেলবাদী ছিলেন। পঁচিশ বছর বয়সের আগে তিনি নিজেও সমাজতন্ত্রী হননি, এবং এই বয়স থেকেই জার্মান দর্শন, ফরাসি রাজনীতি ও ব্রিটিশ অর্থনীতিকে একত্রিত করে একটা সুবিস্তৃত, মৌলিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে শুরু করেন যার বর্তমান নাম মার্ক্সবাদ। তরুণ, ধনী শিল্পপতি ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস এর সাথে মিলে ১৮৪৮ সালে তিনি বিখ্যাত Manifest der Kommunistischen Partei লিখেন। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের জুটি সম্ভবত চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী জুটি। মার্ক্সের নির্ঝঞ্জাট কর্মজীবন নিশ্চিত করতে এঙ্গেলস আজীবন তাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে গেছেন, এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে মার্ক্সকে প্রায় পুরোটা জীবনই নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে: একত্রিশ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে আসেন এবং ১৮৮৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই ছিলেন। উত্তর লন্ডনের হাইগেইট গোরস্থানে তাকে কবর দেয়া হয়েছ। লন্ডনে তিনি একটা বড় সময় ধরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পাঠকক্ষে কাজ করেছেন এবং এখানে বসেই তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই Das Kapital লিখেছেন যা ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

মার্ক্সবাদকে প্রথাগত অর্থে ঠিক দর্শন বলা যায় না, কিন্তু এর মধ্যে একটা বড় দার্শনিক উপাদান রয়েছে এবং এই উপাদানটা প্রায় আগাগোড়াই হেগেলবাদী। এই আলোচনায় আমরা মূলত হেগেলকে নিয়ে কথা বলব এবং তারপর দেখব কিভাবে হেগেলীয় দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো মার্ক্সবাদে স্থান করে নিয়েছে। আমার সাথে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত আছেন পিটার সিঙার যিনি হেগেল ও মার্ক্স দুজনের দর্শন নিয়েই চমৎকার ভূমিকাসূচক বই লিখেছেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। [বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। হেগেল ও মার্ক্সকে নিয়ে তার চমৎকার ভূমিকামূলক বই দুটো এখানে এবং এখানে পাওয়া যাবে।]

আলোচনা

ম্যাজি: সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিকদের মধ্যে হেগেল সবচেয়ে দুর্বোধ্য ও দুর্পাঠ্য হিসেবে বহুল পরিচিত, কিন্তু তাকে নিয়ে আপনার ছোট্ট বইটিতে তার মূল ধারণাগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আশাকরি এই আলোচনায়ও আপনার সেই স্পষ্টতাটা থাকবে। তো, কোত্থেকে হেগেল আলোচনা শুরু করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সিঙার: আমি সবসময় তার ইতিহাসের দর্শন অর্থাৎ Philosophie der Weltgeschichte বইটি থেকে শুরু করি, কারণ তার ইতিহাস বিষয়ক ধারণাগুলোই সবচেয়ে পাকাপোক্ত। হেগেল বুঝার একটা অসুবিধা হচ্ছে তিনি খুব বিমূর্ত। কিন্তু Philosophie der Weltgeschichte যেহেতু সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলে সেহেতু এটা তার দর্শনের অপেক্ষাকৃত বিমূর্ত অংশে ঢুকার একটা ভাল দরজা।

ম্যাজি: এই ইতিহাসচেতনাটাই পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে খুব নতুন একটা জিনিস: হেগেলের আগের কোনো বিখ্যাত দার্শনিকই ইতিহাস বা ইতিহাসের দর্শনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভাবেননি। এক্ষেত্রে ডেভিড হিউম বোধহয় একটা ব্যতিক্রম যেহেতু তিনি History of England লিখেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের দর্শন বলতে আমরা এখন যা বুঝি সেরকম কিছু তিনি তৈরি করেননি। একইভাবে গটফ্রিড লাইবনিৎস একটি পরিবারের ইতিহাস লিখেছিলেন কিন্তু কোনো ইতিহাসের দর্শন তৈরি করেননি।

সিঙার: হ্যাঁ, এটা আসলেই খুব নতুন। যেমন একে কান্টের সাথে তুলনা করা যায়। কান্টের দৃষ্টিতে মানব প্রকৃতি চিরন্তনভাবে যুক্তি ও কামনা এই দুই ভাগে বিভক্ত; মানুষকে যুগে যুগে যেমন দেবদূত ও বিনরের মাঝামাঝি কিছু একটা ভাবা হয়ে এসেছে অনেকটা সেরকম। কান্ট বলেন, মানব প্রকৃতিটাই এমন যে সে চিরকাল এই দুই মেরুর মধ্যে ছুটোছুটি করতে বাধ্য। কিন্তু হেগেল দাবী করেন, এই ব্যাপারটা অপরিবর্তনীয় নয়। মানব প্রকৃতিকে তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তিনি বলেন, প্রাচীন গ্রিসে মানব প্রকৃতি তুলনামূলকভাবে বৈরিতামুক্ত ছিল। মানুষ তখন নিজেদের মধ্যে যুক্তি ও কামনার বৈরিতা নিয়ে অতটা সচেতন ছিল না। সুতরাং কান্ট যে বৈরিতা দেখেছেন সেটা নিশ্চয়ই ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে উদ্ভূত হয়েছে। আসলে হেগেল বলেন, প্রটেস্ট্যান্ট ইউরোপে ব্যক্তিগত বিবেক এর ধারণাটির জন্মের সাথে সাথেই এর উদ্ভব ঘটেছে। এটা যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে ঘটেছ সেহেতু এর চিরস্থায়ী হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভবিষ্যতে কখনো হয়ত এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে এবং আবার ঐকতান প্রতিষ্ঠিত হবে।

ম্যাজি: হেগেল শুধু এটাই নয় বরং সব গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকেই ঐতিহাসিকভাবে দেখতেন, ঠিক না? তিনি মনে করতেন আমাদের ধারণাগুলো আমাদের জীবনপদ্ধতির মধ্যে এবং সে হিসেবে সমাজের মধ্যে প্রোথিত; এবং যখন সমাজ পরিবর্তিত হয় তখন ধারণাও পরিবর্তিত হয়।

সিঙার: হ্যাঁ, সেটা পুরোপুরি ঠিক। ইতিহাস যেভাবে চলে তাতে তিনি এক ধরণের উন্নয়ন দেখেছিলেন, অর্থাৎ ইতিহাস সবসময় সামনের দিকে ধাবমান। এটা সবসময়ই একটা প্রক্রিয়া, সুস্থির কিছু নয়।

ম্যাজি: এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তিনি একটা নামও দিয়েছিলেন; ‘দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া’, যাকে অনেক সময় কেবলই ‘দ্বান্দ্বিকতা’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। হেগেলের দৃষ্টিতে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন ছিল একটু ব্যাখ্যা করতে পারবেন?

সিঙার: আগের উদাহরণটাতে ফিরে যাওয়া যাক। হেগেল প্রাচীন গ্রিক সমাজকে এমন একটা সমাজ মনে করতেন যাতে যুক্তি ও কামনা’র মধ্যে ঐকতান ছিল; কিন্তু সেটা ছিল সরল ঐকতান। সরল কারণ প্রাচীন গ্রিসে মানুষ তখনো ব্যক্তিগত বিবেকের আধুনিক ধারণাটি তৈরি করেনি। সুতরাং তখন ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ঐকতান ছিল, কারণ ব্যক্তিমানুষেরা তখন নিজেদেরকে তাদের নগররাষ্ট্র থেকে আলাদা কোনো সত্তা ভাবতে শুরু করেনি যে ভাল ও মন্দের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। এই সরল ঐকতানের মধ্যে আবির্ভূত হন সক্রেটিস যাকে হেগেল ঐতিহাসিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি মনে করতেন যেহেতু তিনিই প্রথম সবকিছুকে প্রশ্ন করার ধারণাটি উত্থাপন করেছেন। সক্রেটিস পথে ঘাটে মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেন: ‘ন্যায়বিচার কী?’, ‘গুণ কী?’ এবং মানুষ সেগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতদিন তারা গতানুগতিক অনুমানগুলোকে সত্য ধরে নিয়েছে যেগুলোর ত্রুটি সক্রেটিস খুব সহজেই দেখিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই গ্রিক সমাজের সরল ঐকতানটি ভেঙে গিয়েছিল। আসলে হেগেল মনে করতেন, এথেনীয়দের সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াটা ন্যায্যই ছিল। সক্রেটিস আসলেই এথেনীয় সমাজকে কলুষিত ও ভিত্তিচ্যুত করছিল। কিন্তু এটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির একটি আবশ্যকীয় অংশ ছিল এবং এরই ধারাবাহিকতায় একসময় ব্যক্তিগত বিবেকের জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিক অগ্রগতির দ্বিতীয় আবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে এই বিবেক। এটা গ্রিক সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী নীতিটির একেবারে বিপরীত। হেগেলের ভাষায়, আমরা সরল ঐকতান এর ‘থিসিস’ থেকে ব্যক্তিগত বিবেকের ‘এন্টিথিসিস’ এ সরে এসেছি যা প্রটেস্ট্যান্ট ইউরোপে সবচেয়ে চরম রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু এটাও ছিল অস্থিতিশীল। এর ফলশ্রুতিতেই ফরাসি বিপ্লবের ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিপ্লবপরবর্তী ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে; সুতরাং এটাও একসময় ‘সিন্থেসিস’ এর জন্য জায়গা করে দিয়েছে। এটা একটা তৃতীয় ধাপ যাতে সরল ঐকতান ও ব্যক্তিগত বিবেকের সমন্বয় ঘটেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই সিন্থেসিসটা একটা নতুন থিসিস হিসেবে কাজ করে এবং তার বিপরীতে নতুন আরেকটি এন্টিথিসিস আবির্ভূত হয়; এবং এভাবে প্রক্রিয়াটা চলতেই থাকে।

ম্যাজি: প্রক্রিয়াটা চালু হওয়ারই বা কারণ কী? ঐতিহাসিক পরিবর্তন বলে কিছু একটাকে কেন ঘটতেই হবে? হাজার হোক একেবারে স্থির সমাজের কথাও তো আমরা ভাবতে পারি, প্রাচীন মিশর যার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একটা ভারসাম্যপূর্ণ ও ঐকতানপূর্ণ সমাজ—হেগেলের মতে প্রাচীন গ্রিস যা ছিল—অনন্তকাল ধরে সেরকম অবস্থাতেই থাকতে পারে না কেন? মলমের উপর মাছি বসে আবশ্যিকভাবেই একটা পরিবর্তনের উস্কানি কেন দেয়?

সিঙার: প্রাচীন গ্রিসের ক্ষেত্রে কারণটা হচ্ছে তাদের ঐকতানটা ছিল সরল—আরো ভাল একটা শব্দ হতে পারে কাঁচা (নাইভ)—এবং যুক্তির নীতি আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই সরলতা বজায় রাখা আর সম্ভব ছিল না। হেগেল গ্রিক মননে যুক্তির নীতি তৈরি হওয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এটা অবধারিত ছিল। যৌক্তিক মানুষদের পক্ষে কোনো প্রশ্ন ছাড়া সামাজিক রীতি মেনে নেয়া আর সম্ভব ছিল না। ঠিক সেই সময়েই কেন প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল সেটা বুঝতে হলে ইতিহাসের অনেক খুটিনাটি নিয়ে কথা বলতে হবে; কিন্তু মোদ্দাকথা হচ্ছে, যৌক্তিক সত্তা হিসেবে এক সময় না এক সময় আমাদেরকে সরল ঐকতানকে প্রশ্ন করতেই হয়। প্রশ্ন শুরু হওয়ার পরই ব্যক্তিগত বিবেক জাগ্রত হয়ে সমাজ যে কাঁচা ঐকতানের উপর ভিত্তি করে গঠিত তা ধ্বংস করে দেয়।

ম্যাজি: এই ‘দ্বান্দ্বিক পরিবর্তন’ হেগেলের পর থেকেই এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে—এবং মার্ক্সবাদীদের মধ্যে তা এখনো প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ—যে ব্যাপারটা আমাদের একেবারে পরিষ্কার করে নেয়া উচিত। আইডিয়াটি হচ্ছে, আমরা মানুষেরা একটা চিরন্তন পরিবর্তনের প্রক্রিয়াতে জড়িত কারণ প্রতিটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই কিছু পরস্পরবিরোধী উপাদান থাকতে বাধ্য; এবং এই উপাদানগুলো যেহেতু অস্থিরকারক সেহেতু পরিস্থিতিটা কখনো অনন্তকাল ধরে বজায় থাকতে পারে না। এসব অন্তর্কলহের চাপে পরিস্থিতিটা ধ্বসে পড়ে এবং এরপর একটা নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয় যাতে সেই অন্তর্কলহগুলো থাকে না, বা অন্তত প্রশমিত হয়। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিটাতে অবশ্যই নতুন কিছু অন্তর্কলহ থাকে। এবং তাই পরিবর্তন চলতেই থাকে। এই অনন্তকাল ধরে চলা প্রক্রিয়াটাই ইতিহাস গঠন করে। সুতরাং এখানে দ্বান্দ্বিকতা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির চালিকাশক্তি, সবকিছুর সদা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা। এবং পরিবর্তনটা কেমন রূপ ধারণ করে তাও এখানে বলা হয়েছে: প্রথমে থিসিস, তারপর এন্টিথিসিস, তারপর সিন্থেসিস, যা পরবর্তীতে একটা নতুন থিসিসের জন্ম দেয় যার পরে আসে আরেকটা এন্টিথিসিস, এবং এভাবে চলতেই থাকে।

এতক্ষণ পর্যন্ত হেগেলের কথা শুনে মনে হচ্ছে পরিবর্তন ঘটতেই হবে এটা ঠিক হলেও পরিবর্তনের প্রকৃত গতিপথটা অনির্ধারিত, অসংখ্য দৈব অন্তর্কলহে সৃষ্ট অনিশ্চিত ফলাফল। কিন্তু হেগেল আসলে তা মনে করেন না, ঠিক না? উল্টো তিনি মনে করেন যে, পরিবর্তনটা একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে—যে, এর একটা লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে।

সিঙার: ঠিক। হেগেলের মতে লক্ষ্যটা হচ্ছে মুক্তির দিকে মনের উত্তরোত্তর উন্নয়ন। আমরা সবসময় মানব স্বাধীনতা বা মুক্তি উপলব্ধির দিকে এগিয়ে চলেছি; এই প্রক্রিয়ায় মুক্তির চেতনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়, এবং আমাদের আত্মজ্ঞানও দিনদিন বৃদ্ধি পায়।

ম্যাজি: আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে মুক্তি ও জ্ঞান ইতিহাসের মধ্যে একেবারে প্রোথিত, এমনকি মনে হচ্ছে ঐতিহাসিক পরিবর্তনটা যেন এই ধারণাগুলোরই মূর্তরূপ। এক্ষেত্রে বার্ট্রান্ড রাসেলের বিদ্রুপটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, তিনি বলেছিলেন, হেগেলের মতে ইতিহাস হচ্ছে ‘jellied thought’।

সিঙার: হ্যাঁ সেটা ঠিক, ইতিহাস এই ধারণাগুলোর উন্নয়নের প্রতিনিধিত্ব করে। ইতিহাস অনেকগুলো দুর্ঘটনার সমষ্টি নয়। এটা কোনো হাবা’র বলা গল্প নয়। এটা হলো মুক্তি ও জ্ঞানের উদ্দেশ্যময় অগ্রযাত্রা।

ম্যাজি: পরিবর্তনটা আসলে কার ঘটছে? মানে আমরা যখন কোনো পরিবর্তন নিয়ে কথা বলি তখন ধরেই নেই যে পরিবর্তনটা কিছু একটার ঘটছে। সেই কিছু একটা এখানে কী? হেগেল নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতে পারেন না যে এই বিমূর্ত ধারণাগুলোই ইতিহাসের সাবয়ব রূপ—ধারণা তো আর কোনো সারবস্তু (substance) নয়, এমনকি বিমূর্ত সারবস্তুও নয়। সুতরাং আমরা এখানে কিসের কথা বলছি? মানব ব্যক্তি? সমাজ? কে বা কী এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?

সিঙার: ছোটো উত্তর হচ্ছে তিনি এখানে ব্যক্তির কথাও বলছেন না আবার সমাজের কথাও বলছেন না, বরং বলছেন ‘Geist’ এর কথা। ‘গাইস্ট’ একটা জার্মান শব্দ যা অনুবাদ করা বেশ কঠিন। সবচেয়ে সহজ করে বললে বলা যায় যে, হেগেল এখানে ‘মন’ এর কথা বলছেন। অনেক সময়ই এর অনুবাদ করা হয় ‘মন’। যেমন জার্মান শব্দ ‘Geisteskrankheit‘ এর অর্থ ‘মানসিক অসুস্থতা’। সুতরাং আমরা বলতে পারি, হেগেল মনে করতেন ইতিহাসটা অর্থাৎ পরিবর্তনটা ঘটছে মনের উপর, আমার মনের উপর, আপনার মনের উপর, আমাদের সবার ব্যক্তিগত মনের উপর। কিন্তু ‘গাইস্ট’ এর আরেকটা অর্থ আছে যা এই ধারণাকেও ছাড়িয়ে যায়, সেটা হলো ‘আত্মা’ বা ‘স্পিরিট’। আমরা অনেক সময় ‘Zeitgeist‘ অর্থাৎ ‘সময়ের স্পিরিট’ এর কথা বলি। বা জার্মানরা যখন পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা’র কথা বলে তখনও গাইস্ট শব্দটা ব্যবহার করে—Heilliger Geist মানে Holy Ghost। সুতরাং এর একটা আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দিকও আছে—যা বলে এক অর্থে আমার ব্যক্তি মনের বাইরেও হয়ত কোনো এক রকমের বাস্তবতা আছে। সুতরাং এখানে আপনি বলতে পারেন প্রক্রিয়াটা ‘মনের’ উপর ঘটছে, তবে সাধারণ ব্যক্তি মনের উপর নয়, বরং উদ্ধৃতিচিহ্নওয়ালা ‘মনের’ উপর। [ইংরেজিতে এক্ষেত্রে Mind বড় হাতের M দিয়ে লেখা হয়।]

ম্যাজি: হেগেল কি বলতে চাইছেন যে, পুরো বাস্তবতা একটি একত্ব এবং সেটা মানসিক বা আত্মিক। সুতরাং আমরা যে প্রক্রিয়াটা নিয়ে কথা বলছিলাম তা পুরোই ঘটছে এই মানসিক বা আত্মিক কিছু একটার উপর।

সিঙার: হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত হেগেলের দৃষ্টিতে বাস্তবতা হচ্ছে গাইস্ট। এটা শেষ পর্যন্ত মানসিক, বা বুদ্ধিবৃত্তিক। আমরা যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছি তা গাইস্টের উপর ঘটে, অর্থাৎ ইতিহাসের পথ ধরে গতিশীল ‘মনের’ উপর ঘটে।

ম্যাজি: এই আলোচনা যারা শুনছেন তাদের অনেকের কাছে এটা খুব অদ্ভুত লাগতে পারে। সুতরাং আমার মনে হয় এখানে বলে নেয়া উচিত যে, এর কাছাকাছি অনেক রকমের ধারণার সাথে আমরা খুবই পরিচিত, যেমন ধর্মীয় বিশ্বাস; আমরা নিজেরা ধর্মবিশ্বাসী না হলেও এই বিশ্বাসটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। অনেক ধর্মবিশ্বাসী, যেমন অনেক খ্রিস্টান, বিশ্বাস করেন যে বাস্তবতা পুরোটা শেষ পর্যন্ত আত্মিক, এবং সমগ্র বাস্তবতার শেষ পর্যন্ত একটা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আছে। আমার মনে হয় হেগেল এর সাথে নিকটসম্পর্কিত কিছু একটাই বলতে চাচ্ছেন, যদিও হয়ত তার ধারণাগুলো ঠিক প্রথাগত অর্থে ধর্মীয় নয়।

সিঙার: পার্থক্য হচ্ছে, গোঁড়া খ্রিস্টানরা ঈশ্বরকে আত্মিক এবং বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচনা করে, বিশ্বটা বস্তুগত ও মামুলি, আর ঈশ্বর অবস্তুগত ও মহান। খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে বিশ্বের একটা আত্মিক তাৎপর্য আছে, কিন্তু বিশ্বটা নিজে আত্মিক নয়। সুতরাং খ্রিস্টানরা ঈশ্বর ও বিশ্বের মধ্যে একটা বিশাল পার্থক্য টেনে রাখে। বলা যায় হেগেল এর একেবারে বিপরীত কথা বলছেন—অর্থাৎ, কেউ হয়ত বলতে পারে হেগেল সর্বেশ্বরবাদী, যেহেতু তিনি মনে করেন ঈশ্বরই বিশ্ব, এবং সবকিছু আত্মিক যেহেতু সবকিছুই ঈশ্বরের অংশ। কিন্তু সেটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলে হেগেলকে গতানুগতিক খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বেশ্বরবাদের মাঝামাঝি কোথাও ফেলতে হবে। হেগেলের মতে, গাইস্ট সবকিছুতে প্রকাশিত হয়, যদিও এটা অস্তিত্বশীল সবকিছুর সাথে অভিন্ন নয়; [বিশ্বটাই গাইস্ট নয়, তবে বিশ্বে গাইস্ট প্রকাশিত হয়।]

ম্যাজি: ঘটনা হচ্ছে, হেগেলের পর থেকেই অনেক হেগেল বিশেষজ্ঞ ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন: হেগেলের দর্শন শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় কি না? অনেকে জোড়ালোভাবে দাবী করে যে এটা ধর্মীয়, অনেকে আবার বিপরীত কথা বলে। এই বিতর্কে আপনার অবস্থান কোথায়?

সিঙার: আমি মনে করি হেগেলকে অধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেক্ষেত্রে আপনি বুঝতে পারবেন যে তার দর্শনের একটা বিশাল অংশের একেবারে অধর্মীয় ব্যাখ্যা দেয়া যায়। সে যখন গাইস্টের কথা বলে তখন আমরা সেটা দিয়ে কোনো ব্যক্তির মন বুঝাতে পারি, বা সকল মানুষের মনের সমষ্টিকেও বুঝাতে পারে যেটা অনেক ক্ষেত্রে একটা একক ‘মন’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এই অভিন্ন মন দিয়ে আমাদের সবার মনে যে অভিন্ন জিনিসগুলো রয়েছে সেগুলো বুঝানো যায়, যেমন আমাদের যুক্তি প্রদর্শনের সাধারণ ক্ষমতা, কিংবা আমাদের মনের গাঠনিক দিকটা যেটা মূলগতভাবেই সবার ক্ষেত্রেই এক। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, এই ব্যাখ্যাটা অনেকদূর এগিয়ে নিতে পারলেও এর মাধ্যমে হেগেলকে একেবারে একশ ভাগ ব্যাখ্যা করা যায় না। শেষ দশ শতাংশে আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে, হেগেলের কথার অন্তরালে মন বা আত্মার একটা ধর্মীয় বা আধা-ধর্মীয় ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে।

ম্যাজি: আমরা এতক্ষণ পাশ্চাত্য দর্শনে হেগেল প্রবর্তিত দুটি একেবারে মৌলিক ধারণা নিয়ে কথা বলেছি। প্রথম ধারণাটি হচ্ছে, সমগ্র বাস্তবতা একটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। হেগেলের আগে একমাত্র যে দার্শনিক এর কাছাকাছি কিছু একটা বলেছিলেন তিনি হলেন সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিক হেরাক্লিতোস, কিন্তু তিনি এর সামাজিক দিকটা নিয়ে একেবারেই কথা বলেননি। এটা বলা একেবারেই অত্যুক্তি হবে না যে, হেগেল-পরবর্তী সকল সামাজিক ধারণা তার দ্বারা প্রভাবিত—এবং কেবল সামাজিক ধারণাই নয়। তার দ্বিতীয় ধারণাটি হচ্ছে দ্বান্দ্বিকতা, যেটা মার্ক্সবাদের কারণে আমাদের বর্তমান বিশ্বেও খুবই প্রভাবশালী। এর সাথে আমরা তৃতীয় আরেকটা ধারণা যোগ করতে পারি: সেটা হলো ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ (‘এলিয়েনেশন’)। এটাও হেগেল পত্তন করেছিলেন। এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছিলেন?

সিঙার: যে জিনিসটা আমাদের একেবারে নিজস্ব বা আমাদেরই অংশ সেটাকে আমাদের বাইরের, বা এমনকি আমাদের প্রতি সহিংস ও এলিয়েন কিছু ভাবাকে হেগেল বলেছিলেন ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ বা ‘এলিয়েনেশন’। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। হেগেল আমাদের সামনে একটি ‘অসুখী আত্মা’-র ছবি তুলে ধরেছিলেন, যা ধর্মের বিচ্ছিন্নতাবোধক ব্যাখ্যার মাধ্যমে তৈরি হয়। অসুখী আত্মা বলতে এমন একজন ব্যক্তিকে বুঝায় যে একজন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বোত্তম ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, এবং এর বিপরীতে নিজেকে শক্তিহীন, অজ্ঞ ও নিকৃষ্ট মনে করে। এই মানুষটি অসুখী কারণ সে নিজেকে অবমূল্যায়ন করে এবং নিজের সব ভাল বৈশিষ্ট্যকে তার থেকে ভিন্ন আরেকটি সত্তার প্রতি অর্পণ করে। হেগেল বলেন এটা ঠিক নয়। আসলে আমরা ঈশ্বরেরই অংশ, বা আপনি ভাবতে পারেন, আমরা আমাদের গুণগুলোকে প্রক্ষিপ্ত করছি ঈশ্বরের উপর। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে মুক্তি পেতে হলে বুঝতে হবে যে আমরা এবং ঈশ্বর এক, এবং যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা ঈশ্বরের উপর আরোপ করি সেগুলো আসলে আমাদেরই বৈশিষ্ট্য, এগুলো আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বা এলিয়েন কিছু নয়।

ম্যাজি: তিনি অবশ্য এগুলোকে কেবল মানব বৈশিষ্ট্য বলতেন না, ঠিক না? বরং হয়ত বলতেন এই বৈশিষ্ট্যগুলোতে মানুষেরও ভাগ আছে।

সিঙার: এগুলোকে কেবলই মানব বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রথম দাবী করেছিলেন হেগেলের একজন শিষ্য, লুডভিগ ফয়ারবাখ। হেগেল এমনটা বলতেন না, কিন্তু বলতেন ঐ ধরণের দিব্য আত্মা এবং আমরা সবাই একই বাস্তবতার অংশ, এবং বাস্তবতাটি হলো গাইস্ট বা ‘মন’।

ম্যাজি: আপনি স্পষ্ট করেছেন যে, হেগেল সমগ্র বাস্তবতাকে একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতেন এবং মনে করতেন এই পরিবর্তন দ্বান্দ্বিকতার মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসরমান। এটুকু শোনার পর যে প্রশ্নটা সাথেসাথে মাথায় আসে সেটাই আমি একটু আগে আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম: দ্বান্দ্বিক পরিবর্তনটি কিসের দিকে অগ্রসরমান? সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আগেই আমরা একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেছি। এবার চলুন তাতে ফিরে যাওয়া যাক। হয়ত এর উত্তর দেয়ার জন্য আমরা এখন অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায় আছি। ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কি কোনো লক্ষ্য আছে?

সিঙার: দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি এমন দিকে অগ্রসর হয় যাতে ‘মন’ নিজেকে পরম বাস্তবতা হিসেবে জানতে পারে, এবং যাতে এতদিন সে যে জিনিসগুলোকে পরকীয় এবং নিজের প্রতি সহিংস ভেবে এসেছে সেগুলোকে নিজেরই অংশ ভাবতে পারে। হেগেল এর নাম দিয়েছিলেন ‘পরম জ্ঞান’। একইসাথে এটা পরম মুক্তি, কারণ বাইরের শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পরিবর্তে এখন সে বিশ্বকে যৌক্তিক উপায়ে সাজাতে পারে। এটা তখনই সম্ভব যখন ‘মন’ বুঝতে পারে যে সে-ই বিশ্ব। এরপর বিশ্বকে যৌক্তিকভাবে সাজানোর জন্য ‘মন’ তার নিজের অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতাকেই অনুসরণ করতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হচ্ছে, এই চূড়ায় তখনই পৌঁছানো যায় যখন ‘মন’ বুঝতে পারে যে সে নিজেই একমাত্র পরম বাস্তবতা। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: এমনটা আসলে কখন ঘটে? উত্তর হচ্ছে এটা তখনই ঘটেছে যখন হেগেল তার দার্শনিক চেতনা দিয়ে বুঝতে পেরেছেন যে যা কিছু বাস্তব তা-ই ‘মন’। সুতরাং হেগেল যে কেবল লক্ষ্যটা—পরম জ্ঞান ও পরম মুক্তির দশা যার দিকে অতীতের সকল মানবেতিহাস অচেতন সংগ্রামের মাধ্যমে ধাবিত হয়েছে—বর্ণনাই করেছেন তা নয়, বরং তার দর্শনটাই এই পুরো দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটির চূড়া।

ম্যাজি: আমি ভাবি হেগেল কি আসলেই নিজের এই গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন কি না, তিনি কি আসলেই জানতেন যে তিনি নিজের দার্শনিক সত্তাটিকে বিশ্ব ইতিহাসের চূড়া হিসেবে উপস্থাপন করছেন? মনে হয় না।

আপনি বলেছেন এই চূড়ায় পৌঁছালে একইসাথে পরম জ্ঞান এবং পরম মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু জ্ঞান ও মুক্তি কেন এক হতে হবে তা একেবারেই সহজবোধ্য নয়। হেগেল কি মনে করতেন তারা এক?

সিঙার: আত্মজ্ঞান মুক্তিতে পর্যবসিত হয়, কারণ হেগেল মনে করতেন ‘মন’ বিশ্বের পরম বাস্তবতা। ‘মনের’ নিজেকে পরম বাস্তবতা হিসেবে বুঝতে পারার আগে মানুষের গোটা ইতিহাসে মানুষ ছিল দাবার গুটি। আমরা সেই ইতিহাস কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কারণ আমরা নিজেদের অজ্ঞাতে অন্য কিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিলাম, এবং কেন আমাদের জীবনে এমনটা ঘটছিল তা বুঝতেও পারছিলাম না। আমরা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না কারণ আমরা নিজেদের অন্তর্নিহিত একটা অংশকে পরকীয় এবং নিজেদের প্রতি সহিংস ভাবতাম। যখন বুঝতে পারলাম বিশ্বে যা কিছু আছে আমরা তা-ই, তখন আমরা প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারলাম; ভাবতে পারেন, আমরা অবশেষে ঐতিহাসিক অগ্রগতির নীতিগুলো বুঝতে পেরেছি। এবং তারপর বুঝতে পেরেছি যে এই নীতিগুলো আসলে আমাদের অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতারই নীতি, আমাদের মন এবং চিন্তার নীতির সাথে তার কোনো পার্থক্য নেই।

ম্যাজি: আমার মনে হয় এই প্রসঙ্গেই হেগেলের সেই বিখ্যাত উক্তিটা বলা হয়ে থাকে: “বাস্তবতাটাই যৌক্তিকতা, যৌক্তিকতাটাই বাস্তবতা।”

সিঙার: ঠিক। এবং এটা বুঝতে পারার পরই আমরা মুক্ত হয়ে যাই। মুক্তি বাস্তবতার জ্ঞানের উপরই নির্ভর করে, কারণ বাস্তবতার যৌক্তিকতাটা বুঝতে পারলে আমরা আর বাস্তবতার বিরুদ্ধে বৃথা সংগ্রাম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে বাস্তবতার সারধর্ম হচ্ছে আমাদের নিজেদেরই যৌক্তিক নীতি। এরপর থেকে আমরা এর সাথে ভেসে চলতে পারি, এমনকি ঐ যৌক্তিকতার নীতিগুলোর আলোকে এটাকে সাজাতে পারি, নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

ম্যাজি: হেগেলের চিন্তাধারার যে বিষয়টা আপনি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা হলো, তিনি কোনো আইডিয়াকে বিমূর্ত, কালহীন, চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ভাবতেন না (যেমনটা প্লেটো ভাবতেন), বরং সব আইডিয়াকে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রোথিত হিসেবে দেখতেন, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে দেখতেন যেগুলো পরিবর্তিত হয়। এটা যদি ঠিক হয় তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ধরণের সমাজে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পরম পূর্ণতা ঘটতে পারে বলে হেগেল মনে করতেন?

[চলবে…]

সিঙার: সেটা আমাদের এতক্ষণের আলোচনা থেকেই অনুমান করা যায়, সেই সমাজটি হলো একটি যৌক্তিকভাবে সংগঠিত সমাজ। কিন্তু হেগেল এর দ্বারা কী বুঝাতে চান তা আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার, তিনি কেবল বিশুদ্ধ যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজ বুঝাচ্ছিলেন না। হেগেলের কাছে বিশুদ্ধ যুক্তির সমাজের আদর্শ উদাহরণ ছিল ফরাসি বিপ্লবীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সমাজটি। তারা যে কেবল রাজা, রাজন্য বা ধর্মই বিলুপ্ত করেছিল তাই নয়, বরং তারা একেবারে সবকিছুকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করেছিল।

হিউমের মৃত্যুশয্যা

হিউমের মৃত্যুশয্যা

এক দার্শনিক বলেছিলেন ইউরোপে না কি মানুষ একেক যুগে নিজের অজান্তেই বাঁচার একেক রকম সংজ্ঞা বানিয়ে নিয়েছে, এবং কোনো সংজ্ঞাতেই বেশিদিন স্থির থাকতে পারেনি। প্রাচীন গ্রিসে মিথোস আর লোগোসের মহাভারসাম্যের মাঝে মানুষ এক পুরোদস্তুর প্রাকৃতিক জীব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেই মানুষদের চেতনা ছিল রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষের মতো। একটা বৃক্ষ এই পৃথিবীর বুকে যেমন প্রবল স্থৈর্য্য ও আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকে প্রাচীন গ্রিকরা যেন প্রকৃতির কোলে তেমনভাবেই অধিষ্ঠিত ছিল। ধরিত্রীর কোলে তারাই এভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে যারা প্রকৃতির বুকের উপর মানুষের ক্ষণস্থায়ী আস্ফালনে সম্মোহিত না হয়ে মানুষের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা বুঝে এবং পৃথিবীর অন্য সব সত্তার মাহাত্ম্যকে পূজা করে। এই চেতনায়ই হয়ত রবীন্দ্রনাথ বৃক্ষের শক্তিমত্তাকে বন্দনা করেছিলেন আর হোমার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকা মানুষের বন্দনা করে বলেছিলেন,

Of all creatures that breathe and move upon the earth,
nothing is bred that is weaker than man.

বিস্তারিত পড়ুন

সিরীয় শরণার্থীরা কোথায়?

বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে মানবেতর অবস্থায় জীবন যাপন করছে সম্ভবত সিরিয়ার মানুষেরা। ২০১১ সালে আরব বসন্তের ধারাবাহিকতা হিসেবে সিরিয়ায় রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং আসাদ প্রচণ্ড সহিংসভাবে তা দমনের চেষ্টা করেন, শুরু হয় সিরীয় গৃহযুদ্ধ যা এখনও চলছে। গৃহযুদ্ধের অস্থিরতাকে কাজে লাগানোর জন্য বেশ কিছু সশস্ত্র বাহিনী তৈরি হয়। প্রথমে আরব বসন্তের সমর্থকরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে ২০১১ সালে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গঠন করেছিল। আরব বসন্তকে রাজনৈতিক ইসলামের সমর্থকদের কাজে লাগানোর ধারাবাহিকতা হিসেবে ২০১৩ সালে সশস্ত্র ইসলামিক ফ্রন্ট গঠিত হয়। পরবর্তীতে বীভৎস রূপ নিয়ে হাজির হয় পূর্বাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত الدولة الإسلامية في العراق والشام অর্থাৎ ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট, সংক্ষেপে ISIL বা শুধু IS।

এই মহামরণযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার যথারীতি সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ শুরুর আগে সিরিয়ার মোট জনসংখ্যা ছিল ২ কোটির মতো। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় ১.২ কোটি বর্তমানে গৃহহারা, বাস্তুচ্যুত। এরা সবাই শরণার্থী এবং এদেরকে আশ্রয় দেয়াটা অন্য দেশগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ১.২ কোটি শরণার্থীর মধ্যে ৮০ লক্ষ সিরিয়ার ভেতরেই আছে, তারা নিজেদের বিপদসংকুল ভিটা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় কোনোমতে খেয়ে পরে বেঁচে আছে। আর ৪০ লক্ষ পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশেষ করে তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডানে যেতে পেরেছে; তুরস্কে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) সিরীয় শরণার্থীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র আড়াই লক্ষ জন পৌঁছাতে পেরেছে, যা মোট শরণার্থীর ২% এর চেয়েও কম। আর আমরা সবাই জানি যে ইউরোপের কোনো দেশে অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন করতে হলে আগে সেই দেশে পৌঁছাতে হয়, ইউরোপের বাইরে থেকে ভিতরে অ্যাসাইলামের আবেদন করা যায় না। তার মানে বর্তমানে যে আড়াই লক্ষ ইউরোপে পৌঁছেছে তাদের সবাইকে প্রচণ্ড ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, অবৈধ উপায়ে ইউরোপে প্রবেশ করে তারপর অ্যাসাইলাম খুঁজতে হয়েছে।

ইইউ সম্প্রতি গোটা বিশ্ব থেকে ২০ হাজার মানুষকে বিশেষ কোটা’র আওতায় অ্যাসাইলাম দেয়ার কথা ভাবছে। এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলে উক্ত ২০ হাজার ইউরোপের বাইরে থেকেই ইউরোপে অ্যাসাইলামের আবেদন করতে পারবে। কিন্তু এই সংখ্যাটা গোটা বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। আর পুরো ২০ হাজার যদি কেবল সিরিয়ার পিছনেও খরচ করা হয় তারপরও সেটা মোট সিরীয় শরণার্থীর ০.২% এর চেয়েও কম। মোদ্দাকথা মৃত্যুর মুখোমুখি বসে থাকা এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেয়ার পরিবর্তে আমরা এমন ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত যাতে তারা কোনোভাবেই আমাদের দেশে ঢুকতে না পারে। আমাদের দেশ নয় অবশ্যই, ইউরোপের দেশ। কিন্তু ইউরোপীয় দেশ ছাড়া অন্যদের তো ২০ হাজার নেয়ার ইচ্ছাটুকুও নেই।

হান্স রসলিং খুব সুন্দরভাবে এই ফ্যাক্টপডে পরিস্থিতিটা তুলে ধরেছেন।

হুসার্ল, হাইডেগার ও আধুনিক অস্তিত্ববাদ – ২

হুসার্ল, হাইডেগার ও আধুনিক অস্তিত্ববাদ – ২

<< গত পর্বের পর

ম্যাজি: এই ধারণাগুলো দিয়ে হাইডেগার শুধু মানুষের পরিস্থিতিই নয় বরং স্বয়ং মানব সত্তার অর্থাৎ মানুষের পরিচয়েরই একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছিলেন যা গতানুগতিক যেকোনো দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একেবারে আলাদা। সেই দৃষ্টিভঙ্গিটার সাথে কি এবার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন?

ড্রাইফাস: আচ্ছা। এটা তো নিশ্চিত যে তিনি কর্তা, ব্যক্তি, মন বা চেতনা থেকে শুরু করতে পারবেন না। আমাদের সত্তার যৌথ উপলব্ধির পটভূমিতে আমাদের চলমান কর্মকাণ্ডকে বর্ণনা করার একটা উপায় তার বের করতে হবে। এটা করার জন্য তিনি মারাত্মক একটা শব্দ বেছে নেন: Dasein (উচ্চারণ: ডাজাইন)। জার্মান ভাষায় ‘ডাজাইন’ অর্থ অস্তিত্ব, একেবারে নিত্য নৈমিত্তিক অস্তিত্ব। কিন্তু শব্দটির দুটো অক্ষরকে যদি আলাদা করে ফেলা হয় তাহলে ‘Da-sein’ অর্থ দাঁড়ায় ইংরেজিতে ‘being-there’ বা ‘সেথা-বিরাজন’। যে পরিস্থিতির সাথে আমরা মানিয়ে চলি, বা যে পরিস্থিতিতে আমরা বিভিন্ন কিছুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করি, ডাজাইন বলতে সেই পরিস্থিতিটা হয়ে যাওয়াকেই বুঝানো হচ্ছে। [এখানে ‘ডা’ বা ‘সেথা’ দিয়ে পরিস্থিতিটার দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে, এবং এরকম ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা থেকে যে আমাদেরকে একেবারেই আলাদা করা যায় না সেটাই বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।] বিস্তারিত পড়ুন

মহাপৃথিবী

ধানের রসের গল্প পৃথিবীর—পৃথিবীর নরম অঘ্রান
পৃথিবীর শঙ্খমালা নারী সেই—আর তার প্রেমিকের ম্লান
নিঃসঙ্গ মুখের রূপ, বিশুষ্ক তৃণের মতো প্রাণ,
জানিবে না, কোনোদিন জানিবে না; কলরব করে উড়ে যায়
শত স্নিগ্ধ সূর্য ওরা শাশ্বত সূর্যের তীব্রতায়।
— জীবনানন্দ দাশ, সিন্ধুসারস (মহাপৃথিবী)

আমরা কি সম্ভাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বে বাস করি? জার্মান গণিতবিদ গটফ্রিড লাইবনিৎস তাই মনে করতেন; ১৭১০ সালে তিনি লিখেছিলেন, পৃথিবী “সম্ভাব্য সর্বোত্তম বিশ্ব” (Die beste aller möglichen Welten)। লাইবনিৎসের ধারণাকে পরবর্তিতে পুরোদস্তুর অবৈজ্ঞানিক অভিলাষী কল্পনা হিসেবে বাতিল করেছেন অনেকে, বিশেষ করে ফরাসি সাহিত্যিক ভলতেয়ার, তার মান্যুমোপুস কাঁদিদ এ। তারপরও অন্তত এক গোত্রের বিজ্ঞানীদের সাথে লাইবনিৎসের মতাদর্শ বেশ ভালই মিলে যায়—সেইসব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গোত্র যারা কয়েক দশক ধরে সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য আকর্ষণীয় গ্রহ খোঁজার ক্ষেত্রে পৃথিবীকে আদর্শ নমুনা হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। বিস্তারিত পড়ুন

কৃষ্ণবিবর খোঁড়াখুঁড়ি

কৃষ্ণবিবর খোঁড়াখুঁড়ি

আজি যত তারা তব আকাশে
সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে।।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একদিন সূর্য মারা যাবে। তার নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। তখন পৃথিবী যদি আদৌ টিকে থাকে তবে তার আকাশে আলোর খরা নেমে আসবে আর মানুষ সব এক চিরশীতের দেশে বন্দি হবে। বেঁচে থাকতে হলে আমাদের বংশধরদেরকে অন্য কোনো উপায় দেখতে হবে। হয়ত তারা প্রথমে পৃথিবীর সম্পদ শেষ করবে, তারপর সৌরজগৎ নিঃশেষ করবে, এবং একসময় যত তারা আছে মহাবিশ্বাকাশে সব প্রাণ ভরে উজাড় করে ছাড়বে। পোড়ানোর আর কিছু না পেয়ে তাদের দৃষ্টি নিশ্চিত নিবদ্ধ হবে আপাতদৃষ্টিতে অবশিষ্ট একমাত্র অবলম্বন—কৃষ্ণবিবর—এর দিকে। তারা কি আসলেই কৃষ্ণবিবরের শক্তি আবাদ করে সভ্যতাকে পরমধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে? বিস্তারিত পড়ুন

মহাগর্জনের মহাকর্ষণ

মহাগর্জনের মহাকর্ষণ

… অকস্মাৎ
পরিপূর্ণ স্ফীতি-মাঝে দারুণ আঘাত
বিদীর্ণ বিকীর্ণ করি চূর্ণ করে তারে
কালঝঞ্ঝাঝংকারিত দুর্যোগ-আঁধারে।
— নৈবেদ্য (৬৫), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্ফীতি একটা বুনো আগুন—একবার শুরু হলেই হলো, পুরো বন না জ্বালিয়ে থামবে না। আর বনটার যদি কোনো শেষ না থাকে? গুথ, স্তারোবিনস্কি এবং লিন্দে কহেন, মহাস্ফীতি’র (cosmic inflation) কারণেই নাকি আমাদের মহাবিশ্বকে অনস্তিত্বের বদলে অস্তিত্ব বেছে নিতে হয়েছে।

গত বছরের মার্চে এক মার্কিন বিজ্ঞানীদল অ্যান্টার্কটিকায় স্থাপিত অণুতরঙ্গ (মাইক্রোওয়েভ) দুরবিন বাইসেপ২ দিয়ে করা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দাবী করেছিলেন, মহাস্ফীতি প্রমাণিত। তারা একেবারে স্থানকালের জন্মলগ্ন থেকে আসা একটা সংকেত পর্যবেক্ষণের দাবী করেছিলেন। মহাবিশ্বের আদিলগ্নে—মহাগর্জনের (big bang) এক সেকেন্ডের শতকোটি ভাগের শতকোটি ভাগের শতকোটি ভাগের এক ভাগ সময় পর—মহাস্ফীতির মাধ্যমে সৃষ্ট মহাকর্ষতরঙ্গ তখনকার ফোটনের মধ্যে একটা সংকেত পুরে দিয়েছিল। অণুতরঙ্গরূপী ফোটনের কাঁধে ভর করে সেই সংকেতের আমাদের কাছে আসার কথা। সংকেতটা হয়ত আসলেই আছে, কিন্তু আবিষ্কারের দাবীটা শুরু থেকেই ছিল বড্ড গোলমেলে। অবশেষে এ বছরের জানুয়ারিতে এক ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদল বাইসেপ২-দলের সাথে মিলে প্লাংক উপগ্রহ আর বাইসেপ২ দুরবিনের পর্যবেক্ষণ যৌথভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন: বাইসেপ২ ভুল, আদিম মহাকর্ষতরঙ্গ পাওয়া যায়নি, মহাস্ফীতি প্রমাণিত নয় (অবশ্যই অপ্রমাণিতও নয়)। বিস্তারিত পড়ুন

মহাবিশ্বের ঊষালগ্ন

মহাবিশ্বের ঊষালগ্ন

“তিমির কাঁপিবে গভীর আলোর রবে”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজ থেকে প্রায় ১৩৭৪.৯ কোটি বছর আগে, মহাবিস্ফোরণের (big bang) মাত্র ৪ লক্ষ বছর পরে মহাবিশ্বের সব বাতি প্রায় ধপ করেই নিভে গিয়েছিল। এর আগে মহাবিশ্ব ছিল একটা ভয়ানক গরম, ফুটন্ত, ছুটন্ত প্লাজমা—প্রোটন, নিউট্রন আর ইলেকট্রনের এক চঞ্চল, ঘন মেঘ। সেইখানে কেউ থাকলে চারিদিকে দেখত শুধু ধোঁয়াশা আর ধোঁয়াশা, তবে একইসাথে সেটা হতো অন্ধ করে দেয়ার মতো উজ্জ্বল। বিস্তারিত পড়ুন

স্পোরলোস

স্পোরলোস

ফ্রয়েডের সাইকোএনালাইসিসে মানব মনের তিনটি স্তর আছে- ইগো, সুপারইগো এবং ইড। ইগো হচ্ছে চেতন মন যা আমাদেরকে একজন সামাজিক মানুষে পরিণত করে। ইড এবং সুপারইগো দুটিই অবচেতন বা অচেতন জগতের ব্যাপার। সুপারইগো হচ্ছে মনের ড্রাইভিং ফোর্স, সে আমাদেরকে চরমপন্থী সব নৈতিক বা অনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। আর ইড হচ্ছে ইতর সব অভিলাসের চালিকাশক্তি, ক্ষণস্থায়ী কিন্তু নগদ সুখের খোঁজ করাই তার কাজ। এর সাথে কিন্তু ধর্মচিন্তারও মিল করা যায়। সুপারইগোকে বলা যায় ঈশ্বর, তবে মনে রাখতে হবে ঈশ্বর মানে ভাল নয়, ঈশ্বর মানে এমন একজন যে মনে করে, আমি যা বলি তাই মানুষকে শুনতে হবে। ইগো হচ্ছে মানুষ আর ইড হচ্ছে শয়তান। বলা যায় না, হয়ত ফ্রয়েড ভেবেছিলেন, মানুষ যেহেতু ধর্ম সৃষ্টি করেছে সেহেতু তার মানসিক কাঠামো ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে একটা মিল থাকা আবশ্যিক। বিস্তারিত পড়ুন

কয়ানিসকাৎসি

কয়ানিসকাৎসি

কয়ানিসকাৎসি মার্কিন মিডিয়া-বিপ্লবী গডফ্রি রাজিওর প্রথম সিনেমা। তিনি সিনেমা বানানোর জন্য সিনেমা বানাতে আসেননি, বরং নিজের ভেতর জমে থাকা একটি গভীর বোধকে প্রকাশের কোনো ভাষা না পেয়ে কথাহীন ছবিমালা বেছে নিয়েছেন। এই সিনেমায় কোনো কথা নেই, আছে কেবল চলমান-চিত্র, টাইম-ল্যাপ্স ভিডিও, শব্দ, আর সুর। টাইম-ল্যাপ্স এর মাস্টার রন ফ্রিকি চিত্রগ্রহণের কাজ করেছেন, আর সুর দিয়েছেন প্রখ্যাত মার্কিন সুরকার ফিলিপ গ্লাস যিনি সিনেসুর নিয়ে আগেও অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু এইবার রাজিও এসে তাকে বলেছিলেন, তার না-কি সিনেমার সঙ্গীত-সুর ভালো লাগে না, তিনি এমন কিছু চান যা সিনেমায় সচরাচর দেখা যায় না। তারা তিনজন মিলে এত চমৎকার একটা কাজ করেছেন যে, যিনি সিনেমার নিহিতার্থ, গূঢ় তাৎপর্য ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না তিনিও এটি দেখে মোহগ্রস্ত হতে বাধ্য। কেবল সুর, শব্দ, আর ছবির উপর নির্ভর করে এর চেয়ে সুন্দর কোনো সিনেমা এর আগে নির্মীত হয়নি। বিস্তারিত পড়ুন