২০০১: আ স্পেস অডিসি


২০০১: আ স্পেস অডিসি যে সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর একটি সে কথা আমরা অনেক জায়গাতেই শুনে বা পড়ে থাকি। কিন্তু দেখার পর হয়ত অনেকেই মেলাতে পারি না, কেন এটা এত মহৎ, এত প্রশংসিত। এ সিনেমায় স্ট্যানলি কুবরিকের মেধার পরিচয় পাওয়া যায় তার পরিমিতিবোধে, প্রাচুর্যবোধে নয়। এতে কত বেশি জিনিস দেখানো হয়েছে বা কী লঙ্কা কাণ্ড বাধানো হয়েছে সেটা মুখ্য নয়, বরং কত কম দেখানো হয়েছে সেটাই মুখ্য। কুবরিক এটা নির্মাণের সময় এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, দর্শকদের কেবল মন মাতানোর জন্য একটা দৃশ্যও তৈরি করেন নি, আমাদের লঘু ইন্দ্রিয়সুখের কোনো ধার ধারেন নি। এমনকি প্রত্যেকটা দৃশ্যকে তিনি নিংড়াতে নিংড়াতে একেবারে নিঃস্ব করে ফেলেছেন, তারপর তার কেবল নির্যাসটা আমাদের সামনে মেলে ধরে বলেছেন, প্রাণভরে দেখো, একদৃষ্টে চেয়ে থাকো যতক্ষণ না দৃশ্যটা অন্তরে গেঁথে যায়, যতক্ষণ না তা মনের গহীনে প্রবেশ করে মহাকাব্য রচনা শুরু করে। ২০০১ একমাত্র কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র যা আমাদেরকে শিহরিত করার চেষ্টা করে না, বরং চেষ্টা করে মনে সশ্রদ্ধ বিস্ময়বোধ জাগিয়ে জনশূন্য মহাশূন্যের ‘পরে আমাদের মাথা ঠেকিয়ে দিতে।

জড়বিশ্বের প্রতি এই সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলার পেছনে সঙ্গীতের অবদান অনেকখানি। ধ্রুপদী সুর ব্যবহারের পরিকল্পনা কুবরিকের প্রথমে ছিল না, এমনকি শুরুতে অ্যালেক্স নর্থকে একটা আবহসঙ্গীত রচনার দায়িত্বও দিয়েছিলেন। নর্থ যখন গান লেখায় ব্যস্ত কুবরিক তখন সম্পাদনায়; সম্পাদনার সুবিধার্থে তিনি সাময়িকভাবে কিছু ধ্রুপদী সঙ্গীত ব্যবহার করতে থাকেন এবং পরবর্তীতে দেখা যায় ধ্রুপদী সুরই ছবির সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে, তাই সেটা আর পরিবর্তন করেননি। এই সিদ্ধান্তটা ২০০১-এর ভবিষ্যতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নর্থের আবহসঙ্গীত আলাদা ক্যাসেটে পাওয়া যায় এবং সেটা খারাপও হয়নি। কিন্তু ২০০১-এর জন্য সেটা যথার্থ হতো না। কারণ তার সঙ্গীত অন্য সব আবহসঙ্গীতের মতোই সিনেমার ক্রিয়াকে সঙ্গ দেয়ার চেষ্টা করে, অর্থাৎ পর্দার কোন ঘটনা দেখে আমাদের কেমন অনুভূতি হওয়া উচিত তার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কুবরিকের নির্বাচিত ধ্রুপদী সুর ক্রিয়াকে সঙ্গ তো দেয়ই না, উল্টো সকল ক্রিয়া তথা পর্দার সব ঘটনার একেবারে বাইরে অবস্থান করে। বাইরে থেকে সে ক্রিয়াকে আরো উত্তোলিত করে, সে মহীয়ান হতে চায়, চিত্রের মাঝে গাম্ভীর্য সঞ্চার করে তাকে এক তুরীয় স্তরে নিয়ে যেতে চায়।

দু’টো উদাহরণই এক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে। ইয়োহান স্ট্রাউসের ওয়ালৎস “আন ডের স্খ্যনেন ব্লাউয়েন ডোনাউ” বা “নীল দানিউব” বাজতে থাকে নভোখেয়াযানের নভোস্টেশনে ভিড়ার সময়। এখানে ক্রিয়া যতটা ধীর, স্ট্রাউসের সুরও ততটা ধীর। এ যুগের যেকোনো কল্পবিজ্ঞান নির্মাতা এই মহাকাশ নৃত্যকে বেশ বোরিং ভাববে এবং হয়ত মারমার কাটকাট সঙ্গীত জুড়ে দিয়ে দর্শকদের মন মাতানোর ও প্রাণ ভোঁতা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু এখানে সেটা করা খুবই ভুল হতো। কারণ এখন অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি মহাশূন্যে তরী ভিড়ানো আসলেই প্রচণ্ড সময়সাপেক্ষ ও ক্লান্তিকর ব্যাপার। সেই ক্লান্তি থেকে মুক্তির মিথ্যা বাহানা না খুঁজে যে কুবরিক উল্টো অবসাদের মাঝেই চলচ্চৈত্রিক নাচের মুদ্রা খুঁজে পেয়েছেন সেটাই বিস্ময়কর।

এই দৃশ্যে আমাদের দায়িত্ব মহাশূন্যে দাঁড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি নিবিষ্টভাবে অবলোকন করা। সঙ্গীতটা আমাদের চেনা, সুর কিভাবে এগোবে আমরা জানি। মহাশূন্যে খেয়া পারাপার ধীর হলেও ‘সাধারণত’ সেটা কোনো ধ্রুপদী সুরের লয় অনুসরণ করে না! কিন্তু কুবরিকের খেয়া নৌকাগুলো তা-ই করে, ওয়ালৎস-টির লয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে। সেই সাথে পটভূমির সুর তার মহিমান্বয়ন ক্ষমতা দিয়ে দৃশ্যটিকে আমাদের কাছে আরও ঐশ্বর্যময় করে তোলে।

রিচার্ড স্ট্রাউসের “আল্জো স্প্রাখ জারাথুস্ট্রা”-র (“যবে কহিলেন জরথুস্ত্র”) ব্যবহার আরেকটি উদাহরণ। স্ট্রাউস এই সুর লিখেছিলেন নিৎশের বই থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে। নিৎশে যেমন অতিমানবের ধারণা পত্তনের মাধ্যমে মানুষকে জড়দেহের বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন তেমনি স্ট্রাউসের সুরের পাঁচটি দুর্দান্ত উদ্বোধনী নোট মর্ত্যের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের অমর্ত্যলোকে আরোহণের ঘোষণা দেয়। সেই অপার্থিব জগৎ ভয়ানক শীতল, আতঙ্কজনক কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণ।

এই সুর প্রথম ব্যবহৃত হয় সিনেমার শুরুতে যখন মহাবিশ্বের সচেতনতার নদীস্রোতে মানুষ প্রথম গা ভাসায়, এবং এরপর একেবারে শেষে যখন সেই চৈতন্যের স্রোত গিয়ে সমুদ্রে মেশে, আর তারকশিশুর বেশে মানব দেহ ইন্দ্রিয়ের মায়া ত্যাগ করে অতীন্দ্রিয় সমুদ্র-ঊর্মি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। নাগরিক বিনোদনে ধ্রুপদী সঙ্গীত ব্যবহার করা হলে সাধারণত সঙ্গীতটি অকিঞ্চিৎকর হয়ে যায়, সুরের চেয়ে ছবি বড় হয়ে উঠে, লোকজন ছবিটির মাধ্যমেই সুরটি মনে রাখে যা সুরটির জন্য মানহানিকর। যেমন, উইলিয়াম টেল ওভার্চার শুনলে লোন রেঞ্জারের (মার্কিন ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতির আইকন) কথা মনে না হয়ে পারে না। কিন্তু কুবরিকের এই সিনেমায় উল্টো সঙ্গীতের মাহাত্ম্য চিত্রের গুণে আরও বেড়ে গেছে।

যারা সিনেমাটি দেখে আশাহত হন, তাদের জন্য আশার কথা এই যে, ১৯৬৮ সালে লস এঞ্জেলেসের প্যান্টাজেস থিয়েটারে শুভ মহরতের দিনও এটি অধিকাংশ মানুষের আশাভঙ্গ করেছিল। এর অন্যতম কারণ কুবরিকের গোপনীয়তা প্রীতির কারণে গড়ে ওঠা বেশ কিছু নাগরিক পুরাণ, তখনকার অন্যতম জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের গল্প, স্পেশাল ইফেক্টের রাজা ডগলাস ট্রাম্বাল-এর উপস্থিতি, নভোস্টেশন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লোগোর নকশা পর্যন্ত সবকিছুতে ভবিষ্যতের ছোঁয়া আনার জন্য অসংখ্য পণ্ডিতের পরামর্শ গ্রহণ, ইত্যাদি। দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে সবকিছু করলেও শেষ মুহূর্তে কুবরিককে বেশ তাড়াহুড়ো করতে হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা প্রায় শেষ হয়ে আসলেও বিমানভীতির কারণে কুবরিক ইংল্যান্ড থেকে কুইন এলিজাবেথ জাহাজে চড়ে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। জাহাজে আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার সময় এবং ট্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অতলান্তিক উপকূল থেকে প্রশান্ত উপকূলে যাওয়ার সময়ই সিনেমাটির সম্পাদনার কাজ শেষ করতে হয়। অবশেষে লস এঞ্জেলেসে মনে পূর্বের অনেক ধারণা এবং বুকে ভবিষ্যতের অনেক আশা নিয়ে উপস্থিত দর্শকদের সামনে উন্মুক্ত হয় ২০০১-এর পর্দা।

অন্য অনেকের সাথে রজার ইবার্টও সেদিন প্যান্টাজেস থিয়েটারে উপস্থিত ছিলেন এবং তার মতে মহরৎটিকে কোনোভাবেই পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায় না। কারণ যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে ছিলেন তারা জানতেন যে, সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা দেখে ফেলেছেন। অবশ্য এদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। রোমান্টিক ড্রামার জনপ্রিয় অভিনেতা রক হাডসন আসনগুলোর মধ্যবর্তী সরু পথ ধরে নেমে এসে জিজ্ঞাস করছিলেন, “কেউ কী আমাকে একটু বুঝবে এখানে কী ঘটছে?” আরও অনেকেই মাঝপথে বেরিয়ে গিয়েছিল, এছাড়া সিনেমার ধীর গতির জন্য দর্শক সারিতে এক ধরণের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। প্রথম স্ক্রিনিং-এর পর সাথে সাথেই কুবরিক সিনেমার প্রায় ১৭ মিনিট কেটে বাদ দেন, একটি পড দৃশ্য পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়, কারণ হুবহু তেমন একটা দৃশ্য সিনেমার আরেক জায়গায় ছিল। তবে এই সংক্ষেপণ দর্শকদের অস্থিরতা ও অধৈর্য্য কতটুকু প্রশমন করতে পেরেছিল তা বলা কঠিন।

দর্শকরা যে ধরণের স্বচ্ছ ধারাবর্ণনা ও সহজ বিনোদন আশা করে তার কিছুই এই সিনেমায় ছিল না। বৃহস্পতি পার হয় কোনো এক অজানা অচেনা দেশের এক অদ্ভুত ঘরে নভোচারীটির কার্যকলাপের কোনো অর্থ দর্শকরা করতে পারেনি। শুভ্র আলোকচ্ছটায় চোখ ঝলসে দিলেও ঘুমন্ত মস্তিষ্ককে তা জাগাতে পারেনি। সেই রাতে হলিউডের আপামর সিনেমাখোরদের মন্তব্য ছিল, কুবরিক স্পেশাল ইফেক্ট ও বিভিন্ন দৃশ্যের সেট বানাতে গিয়ে এতই ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে যে শেষ পর্যন্ত একটা সিনেমা বানাতেই ব্যর্থ হয়েছে, মোদ্দাকথা ২০০১-কে কোনো সিনেমাই বলা যায়না।

হ্যাঁ, সত্যিই ২০০১-কে কেবল সিনেমা বলা যায়না, কুবরিক কেবল চলচ্চিত্রের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি মানব সভ্যতার লক্ষ বছরের ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে নতুন উপায়ে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। যুগে যুগে মানুষ বিভিন্ন উপায়ে মহাবিশ্বে নিজের অবস্থান আবিষ্কারের বা উদ্ভাবনের চেষ্টা করে গেছে, কেউ সঙ্গীত, কেউ চারুকলা আর কেউ বা প্রার্থনার মাধ্যমে। কুবরিক সেই কাজটাই করেছেন ধ্বনিময় গতিময় চিত্রের মাধ্যমে। এই প্রার্থনা সঙ্গীত আসলে উপভোগের জন্য নয়, বরং তুর্যধ্যানের মন্ত্র শেখার জন্য, যে ধ্যানের মাধ্যমে ২০০১-এর জগতের বাইরে থেকে জগৎটিকে একজন দার্শনিকের চোখ দিয়ে দেখা যায়। সাধারণ বিনোদনমূলক সিনেমা দেখার সময় আমরা সাধারণত সিনেমাটির ভেতরে ঢুকে যাই, অনেককে বলতেও শোনা যায়– সিনেমাটা এতই ভালো যে একেবারে ভেতরে ঢুকে যেতে হয়; ২০০১-এ এই ভালোত্বের কোনো বালাই নেই। বরং ২০০১ এমনভাবে বানানো হয়েছে যাতে কেউ তার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, বরং তার বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল ভাবতে বাধ্য হয়।

পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের যেমন বেশ কিছু মুভমেন্ট থাকে কুবরিকের অডিসিও তেমনি কয়েকটি মুভমেন্ট নিয়ে গঠিত। প্রথম মুভমেন্টে মানুষের কয়েক নিযুত বছর প্রাচীন পূর্বপুরুষ বিনরেরা একটি অদ্ভুত মনোলিথের সান্নিধ্য লাভের পর হাড়ের যৌদ্ধিক গুণ আবিষ্কারে সমর্থ হয়। এই হাড়ই বিনরজাতির তৈরি প্রথম হাতিয়ার; এটা দিয়ে বিনরদের এক দল অন্য দলকে নির্মমভাবে পরাজিত করে। মনোলিথটির কৃত্রিম মসৃণ পৃষ্ঠ স্পর্শ করার পরই হয়ত বিনর মস্তিষ্কে খেলে গিয়েছিল যে, কোনো ভোঁতা বস্তুকে শান দিয়ে মসৃণ যন্ত্রে পরিণত করা যায়। মনোলিথটি সেদিক থেকে মানুষ-বানর নির্বিশেষে সকল বিনরদের উপর অবতীর্ণ প্রথম ঐশী বাণী।

বিজয়ের আনন্দে বিনর দলনেতা হাড়টি শূন্যে ছুঁড়ে মারে, কুবরিকের ক্যামেরা সেই স্বাধীনচেতা হাড়টিকে পদে পদে অনুসরণ করতে থাকে। স্বাধীনেচ্ছা বিসর্জন দিয়ে হাড়টি যেই নিচে পড়তে শুরু করে, তখনই হঠাৎ দৃশ্যটি প্রলীন হয়ে যায়; স্থান-কাল দুই দিকেই প্রচুর পথ পাড়ি দিয়ে আমরা চলে যাই একটি নভোখেয়াযানে, ২০০১ সালে। এটাকে অনেক সময় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম ফ্ল্যাশ-ফরোয়ার্ড বা কালঝাঁপ বলা হয়। খেয়াযানে দেখা হয় ডঃ হেইউড ফ্লয়েড-এর সাথে, যিনি নভোস্টেশন হয়ে চাঁদে যাচ্ছেন। খেয়াযান দৃশ্যটি ইচ্ছা করে আখ্যানবিরোধী করা হয়েছে; সেখানে কোনো রোমাঞ্চকর দৃশ্য-সুর বা কথোপকথন ব্যবহার করে আসন্ন মিশনের ভয়াবহতা বা চ্যালেঞ্জ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়নি। এর বদলে কুবরিক সময়টা কাজে লাগিয়েছেন নভোযাত্রার খুটিনাটি, যেমন কেবিনের ডিজাইন, যাত্রাকালীন পরিসেবা, অভিকর্ষহীনতার অনুভূতি ইত্যাদি দেখিয়ে।

এরপর আসে নভোযান ভিড়ানোর দৃশ্য। নভোযানটি ওয়াল্‌ৎজের তালে স্টেশনে ভিড়ে; অন্তত এই দৃশ্যের সময় প্যান্টাজেস থিয়েটারের অস্থির দর্শকরদের মধ্যেও পিনপতন নিরবতা নেমে এসেছিল। স্টেশনে ভিডিওফোনের মতো কল্পবৈজ্ঞানিক বস্তু দেখানোর লোভ সামলাতে পারেন না কুবরিক, তবে সেটাও করেন খুব সুন্দরভাবে। এরপর স্টেশন থেকে ডক্টর হেইউড যান চাঁদের বন্দরে। নভোযাত্রার সময় কুবরিক প্রধানত কল্পবৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি দেখাতে ব্যস্ত থাকেন, যেমন শূন্যাভিকর্ষ টয়লেট, কিছু পরিচিত ব্র্যান্ডের ভবিষ্যম্ভাবী পণ্য ইত্যাদি। চাঁদের বন্দরে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি অধিবেশন বসে।

চাঁদের দৃশ্যান্বয়টি (যার সাথে এক বছর পরের প্রকৃত চন্দ্রাভিযানের ভিডিওর পার্থক্য করা খুব কষ্টকর) সিনেমার প্রথম দৃশ্যেরই আরেক প্রকরণ। প্রাগৈতিহাসিক বিনরদের মতো মানুষও এখন একটি মনোলিথের দেখা পায়, তবে পৃথিবীতে নয়, চাঁদে। মনোলিথটি দেখে বিনরদের মতো তারাও একই উপসংহারে পৌঁছায়- এটা নিশ্চয়ই কারো তৈরি। প্রথম মনোলিথ যেমন প্রথম হাতিয়ারের জন্ম দিয়েছিল দ্বিতীয় মনোলিথ তেমনি মানুষের আরেক বিস্ময়কর উদ্ভাবনকে উস্কে দেয়: ডিসকভারি নামক নভোযান। ডিসকভারি চালনার পুরো দায়িত্ব অর্পিত হয় মানুষেরই হাতে তৈরি একটি অত্যুন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট কম্পিউটারের হাতে, নাম তার হ্যাল ৯০০০।

ডিসকভারিতে নভোচারীদের জীবন খুব একঘেয়ে। নিয়মিত ব্যায়াম, নভোযানের তথাকথিত সুস্থতার জন্য গৎ-বাঁধা চেক-আপ, আর হ্যালের সাথে দাবা খেলাই তাদের একমাত্র বলার মতো কাজ। হ্যালকে নিয়ে যখন নভোচারীরা সন্দিহান হয়ে পড়ে তখনই প্রথমবারের মতো একটু সাসপেন্সের জন্ম হয়। হ্যালকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে যে সে বিশ্বাস করে, “এই মিশন এত গুরুত্বপূর্ণ যে কোনোভাবেই তা বানচাল হতে দেয়া যাবে না”। হ্যালের ঐশ্বরিক খলনায়ক চরিত্র প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর মানুষ নভোচারীদের চিন্তার বিষয় হয়ে পড়ে, কিভাবে হ্যালকে ফাঁকি দিয়ে সলাপরামর্শ করা যায়। এই চেষ্টা থেকেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃশ্যের জন্ম। হ্যালকে জানতে না দিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য নভোচারী দু’জন একটি নভোপডে উঠে সব বৈদ্যুতিন সংযোগ বন্ধ করে দেয়। হ্যালকে কয়েকবার ডেকে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে আসলেই তারা একা কি না। কিন্তু কথা বলা শুরু করলে বোঝা যায় হ্যাল ঠোঁট পড়তেও পটু। কুবরিক এই দৃশ্যা চমৎকারভাবে সম্পাদনা করেছেন, হ্যাল যে ঠোঁট পড়তে পারছে সেটা পরিষ্কার হয়, কিন্তু সেটা ঢাকঢোল পিটিয়ে জানান দেয়া হয় না। কুবরিক দর্শকদের বুদ্ধিমত্তার উপর আস্থা রাখেন।

এরপর আরেকটি বিখ্যাত দৃশ্যান্বয়– তারকদ্বার বা স্টারগেট– শব্দ আর বর্ণীল আলোর সহযোগে নভোচারী ডেভিড বাউম্যানের স্থান-কাল-মাত্রা-ভেদী যাত্রা যাকে এখন হয়ত অনেকে উষ্ণবিবর দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু কুবরিকের ক্ষেত্রে যাত্রাটা কোন্ বিবর দিয়ে হয়েছে তা যেমন মুখ্য নয় তেমনি যাত্রার শেষে ঠিক কোন্ প্রজাতির এলিয়েনের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাও মুখ্য নয়। যাত্রার শেষে একটি শুভ্র ঘরে বাউম্যান জীবনের শেষ দিনগুলো অদ্ভুতভাবে পার করে, দেখে কখনও মনে হয় মানুষকে বুঝি কেউ চিড়িয়াখানায় বন্দি করে রেখেছে প্রদর্শনের জন্য, আমরা যেমন চিড়িয়াখানার ভেতর গাছপালা দিয়ে পশুদের পরিচিত একটা পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা করি তেমনি হয়ত তাকে কিছু পরিচিত পার্থিব জিনিসপত্র দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, চিড়িয়াখানায় বুঝি মানুষ নামক প্রজাতিটির পুরো জীবনচক্রের প্রদর্শনী চলছে। এই শ্বেতমঞ্চের নাট্যানুষ্ঠান শেষ হলে আমরা সিনেমার শেষ মুভমেন্টে পৌঁছে যাই: যা তারকশিশু দৃশ্যান্বয় হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে।

এখানে এই “অন্য” প্রজাতি, এই অতি বুদ্ধিমান সত্তা, এই অদ্ভুত এলিয়েন, যারা নিযুত বছর আগে পৃথিবীতে একটি এবং চাঁদে আরেকটি মনোলিথ স্থাপন করেছিল পৃথিবীর বিনরেরা কখন চাঁদে পাড়ি জমানোর দক্ষতা অর্জন করে তার হিসাব রাখার জন্য, তাদের সাথে কখনোই আমাদের পরিচয় হয় না। কিন্তু এই ঋণজগতেই তাদেরকে বেশি ভালো মানায়, তাদের অদৃশ্য অস্তিত্ব আমাদেরকে যতটা আচ্ছন্ন করে কোনো দৃশ্যমান এলিয়েন দিয়ে সেটা কোনোদিন হবার নয়।

“২০০১: আ স্পেস অডিসি” অনেক দিক দিয়ে একটি নির্বাক চলচ্চিত্র। এখানে কথোপকথন খুব কম; যা একটু আছে তার কাজ নির্বাক ছবির মতো ইন্টারটাইটেল দিয়েই সারা যেত, এবং এখানে চরিত্রগুলো একে অপরের সাথে কেবল কথার জন্যই কথা বলে, কী কথা বলছে তার কোনোই গুরুত্ব থাকে না। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ চান্দ্র বন্দরে অনুষ্ঠিত অধিবেশনটির কথাবার্তা। আয়রনিটা এখানেই যে, ২০০১-এর সবচেয়ে অর্থবহ কথাগুলো বলে হ্যাল, যখন সে প্রাণভিক্ষা চায়, যখন সে ডেইজি বেল গায়।

সিনেমা তৈরি হয় ছবি ও শব্দের সমন্বয়ে, সেই শব্দকে কথানির্ভর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কুবরিক সেটা মনে রেখেছেন। তার কাছে ছবি মানে ছিল ভিজ্যুয়াল কারসাজি, আর শব্দ মানে সুর। এই দুয়ের সমন্বয়ে তিনি একটি ধ্যাননিষ্ঠ সিনেমা তৈরি করেছেন। সেই ১৯৬০-এর দশকে নির্মীত হলেও ২০০১ আজ পর্যন্ত একটুও পুরনো হয় নি, এর আবেদন কোনোদিন ফুরনোর সম্ভাবনাও নেই। আজকের যুগে আমরা যত প্রযুক্তি প্রতিদিন ব্যবহার করি তার একটিও ২০০১ নির্মাণের সময় ছিল না। তারপরও এই সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক কোনো প্রযুক্তি দিয়ে এর কোনো দৃশ্য কোনোদিন পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কেউ বোধ করবেন বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে ট্রাম্বালের কাজ এতই বাস্তবসম্মত যে কল্পচিত্রের বদলে তাকে প্রামাণ্যচিত্রের ফুটেজ মনে হয়।

তুরীয় বা অতীন্দ্রিয় সিনেমা খুব কম, কিন্তু সেগুলোই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। পল শ্রেডার-কে জিজ্ঞাস করলে সাথে সাথেই জানা যাবে যে, কুবরিক তুরীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, সে খ্যাতি কেবল ইয়াসুজিরো ওজু আর রোবের ব্রেসোঁ-র। এবং তার কথার সাথে দ্বিমত করারও কিছু নেই, কুবরিক আসলেই তুরীয় সিনেমা বানাতেন না। কিন্তু তার অন্তত এই একটি সিনেমা কোনো না কোনো পর্যায়ে তুরীয় স্তরে উন্নীত হয়েছে। কারণ একে কেবল সিনেমা বলে চালানো যায় না, প্রার্থনা, প্রার্থনাসঙ্গীত বা অভূতপূর্ব কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে মনে যে অধিজাগতিক সংজ্ঞাতীত অনুভূতির জন্ম হয় ২০০১ দেখলেও তেমনটি হতে পারে। চলচ্চিত্র সাধারণত কিছু চরিত্র নিয়ে যাদের কিছু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে, এবং যারা সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন করে কোনো প্রাহসনিক বা বিয়োগান্তক উপায়ে। ২০০১-এ তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু সন্ধান আছে। এর কোনো নির্দিষ্ট আখ্যানফলক নেই; যাত্রাপথে সে কোনো চরিত্রের সাথে সমব্যথী হয় না, কোনো চরিত্রকেই আপন করে নেয় না। ২০০১ আমাদেরকে এক অদ্ভুত ধরণের মানবতা শিখাতে চায়। সে বলে, মানুষ যখন চিন্তা করতে শিখেছে তখন থেকেই মানুষ হয়েছে, যখন কল্পনা করতে শিখেছে তখন থেকে নয়। বলে, আমরা পৃথিবীর পৃষ্ঠে “বিচরণ” করলেও আসলে যে একটা বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অগুনতি গ্যালাক্সি-তারা, গ্রহ-উপগ্রহের মাঝে “বাস” করি সেটা কেবল কল্পনা করলে বৌদ্ধিক বিবর্তনের পরবর্তী স্তরে যাওয়া যাবে না, সেটা চিন্তা করতে হবে, সেই চিন্তাটা ছুঁয়ে দেখতে হবে, হতে হবে তারকশিশু; দেহটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের বৌদ্ধিক আধেয় সংরক্ষণের জন্য সন্ধান করতে হবে একটি নিরাকার আধারের।

— রজার ইবার্টের রিভিউয়ের ছায়াবলম্বনে লিখিত।

Posted in চলচ্চিত্র | মন্তব্য দিন

রেড রক ওয়েস্ট

রেড রক ওয়েস্টকে কোনো বিশেষ ঘরানা বা ধরণের মধ্যে ফেলা যায় না। এক কথায় এটা একটা নারকীয় রম্য সিনেমা। এর অবস্থান নব্য-নোয়া আর কৃষ্ণকমেডির মাঝামাঝি, ওয়েস্টার্ন এবং থ্রিলারের মাঝামাঝি। ইবার্ট একে কোয়েন ভাইদের ব্লাড সিম্পল ও ডেভিড লিঞ্চের সিনেমাগুলোর সাথে তুলনা করেছেন, যেগুলো প্রচণ্ড মমতা, দরদ ও পরীশ্রম দিয়ে বানানো হয়। লিঞ্চের একজন নায়িকাও সিনেমাটিতে আছে: টুইন পিক্‌স টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করা লারা ফ্লিন বয়েল (ডনা হেইওয়ার্ড; লরা পামারের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু)।

টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে শুভ মহরৎ হওয়ার পর সেখানে সিনেমাটি খুব প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেশব্যাপী (যুক্তরাষ্ট্র) প্রেক্ষাগৃহে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায়নি। সেই ব্যর্থতার দায় সম্ভবত সিনেমাটির অদ্ভুত অনন্যতার ঘাড়েই ফেলা যায়। পরবর্তীতে অবশ্য সান ফ্রান্সিস্কো’র রক্সি থিয়েটারের মালিক সিনেমাটি দেখে এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নিজ দায়িত্ব প্রেক্ষাগৃহে দেখানো শুরু করেন, এবং সেভাবেই অবশেষে নির্মাতাদের ভাগ্য খুলে।

এ ধরণের সিনেমার জন্য খুব খামখেয়ালী বা হুইমজিক্যাল অভিনয়শিল্পী লাগে, যারা সিনেমার বিভিন্ন মুহূর্তের আয়রনিক রসটাকে উপভোগ করতে পারেন, যার প্রমাণ লিঞ্চ আর কোয়েন ভাইরা বারবার দিয়েছেন। এখানে তেমন অভিনেতার অভাব নেই; নিকোলাস কেইজ, জে টি ওয়ালশ, ডেনিস হপার, আর লারা ফ্লিন বয়েল, কেউ কারো চেয়ে কম যায় না।

সিনেমায় কেইজের চরিত্র (মাইকেল) এক দরিদ্র সৎ ভবঘুরে; কিন্তু ভবঘুরে সে আর থাকতে চায় না, সেজন্যই সুদূর টেক্সাস থেকে ওয়াইয়োমিং আসা চাকরির সন্ধানে। সেই চাকরি হয়নি, কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে চলে সে আসে রেড রক নামক একটি ছোট্ট শহর বা গ্রামের রেড রক নামক এক বার-এ। বার-এর মালিক তাকে “ডালাসের লাইল” ভেবে ভুল করে, যার এই সপ্তাহেই আসার কথা, যাকে দিয়ে সে তার বউকে খুন করাতে চায়। মাইকেল খেলে যায়, স্বামীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে স্ত্রীকে খুন করতে তার বাড়িতে যায়, কিন্তু গিয়ে খুন করার বদলে স্ত্রীকে সব বলে দেয়; স্ত্রী তখন তাকে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে স্বামীকে খুন করতে বলে। দু’জনের টাকা নিয়ে সুবোধ বালক মাইকেল শহরের শেরিফের কাছে বিপজ্জনক ঘটনাটি নিয়ে একটি চিঠি লিখে শহরটি ছেড়ে চিরতরে চলে যেতে চায়। কিন্তু পথে ঘটে দুর্ঘটনা, আহত লোকটিকে নিয়ে রেড রকে ফিরে আসার পর সে জানতে পারে, স্বামীটিই এই শহরের শেরিফ। সেদিনই ডালাস থেকে অবশেষে লাইল আসে। লাইল আর বার-মালিকের শিকারোন্মাদনা আর স্ত্রীটিকে বাঁচানোর ইচ্ছার কারণে বারংবার চেষ্টা করেও আর মাইকেল রেড রক ত্যাগ করতে পারে না। সবাই একটি অবশ্যম্ভাবী কুরুক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যায়।

রেড রক শহরের “স্বাগতম” পোস্টারটি সিনেমার আয়রনির প্রতীক; ছেড়ে যেতে ব্যর্থ হয়ে যতবার শহরে ফিরে আসে মাইকেল, ততবারই পোস্টারটি দেখানো হয়। আসল “ডালাসের লাইল” চরিত্রে ডেনিস হপার বরাবরের মতোই হাস্যোজ্জ্বল, রসিক, আর ঠাণ্ডামাথার ভয়ংকর খুনী। সে নিজের অপরাধটা নিপুণভাবে সম্পন্ন করতে চায়, যেকোনো মূল্যে। আর জে টি ওয়ালশ বরাবরের মতোই নিরব ঘাতক। এই ভিলেনের কোনো উচ্চবাচ্য নেই, হু-হা-হা-হা নেই, সে ব্যতিক্রমী রকমের যুক্তিবাদী। আর মেয়েটির চরিত্র শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে কষ্ট হয়, মাইকেলের প্রতি ভালোবাসা, না-কি টাকা, কোনটার পিছনে সে ছুটছে বুঝা দায় হয়ে যায়। মাইকেল এমন মানুষ, যাদেরকে লাইলের মতো মানুষেরা মনে করে যে, তারা নিজেদেরকে অন্য সবার চেয়ে ভালো মনে করে; মাইকেলরা আসলেই অন্য সবার চেয়ে না হলেও অনেকের চেয়ে ভালো, সে-ই তাই রেড রক ওয়েস্ট এর হিরো।

রেড রক ওয়েস্ট এর মতো সিনেমা বানানোর জন্য সিনেমার প্রতি ভালোবাসা লাগে, পুরনো সিনেমার সাথে অনেক দিন ঘরসংসার করা লাগে। এই সিনেমার পরিচালক জন ডাল, এবং লেখক তার ভাই রিক ডাল যে তেমন সিনেমাখোর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রেড রক নতুন কোনো শহর নয়, ধ্রুপদী যুগের ওয়েস্টার্ন, নব্য-নোয়া সিনেমায় এমন শহরের অভাব ছিল না। এমন শহর পৃথিবীর আট দশটা শহরের মতোই, সবখানের মতোই এখানে টাকার মূল্য সবচেয়ে বেশি, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে ঘুরতে ঘুরতে এক ভবঘুরে এখানে এসে জুটে যায়, যে আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে একটি অত্যাভিন্ন মহাকাব্য।

Posted in চলচ্চিত্র, Uncategorized | মন্তব্য দিন

ডারউইন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

আমার ইদানিং একটা নতুন অভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে। কোন শব্দ বা বিষয় মাথায় আসলে প্রথমেই আন্তর্জালের রবীন্দ্র রচনাবলীতে অনুসন্ধান করি। ডারউইন এবং ওয়ালেস নিয়ে আমার অনেক মোহ, কিন্তু কখনো রবীন্দ্রনাথ এদের সম্পর্কে কিছু লিখেছেন কিনা জানতাম না। সাধারণ বুদ্ধি বলে রবীন্দ্রনাথের অবশ্যই তাদের সম্পর্কে অবহিত থাকার কথা। কারণ তিনি ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে খুব উৎসাহী ছিলেন এবং অন্য অনেক ভারতীয় পণ্ডিতদের মত পাশ্চাত্য বিজ্ঞানকে হেয় করার ফাঁদে পা দেননি। “বিশ্বপরিচয়” এবং আরও অনেক কিছুতেই বিজ্ঞান নিয়ে তার মোহটা টের পাওয়া যায়।

“ডারউইন” লিখে একটা সন্ধানযজ্ঞ চালিয়ে দিলাম। উল্লেখ্য এর আগে ওয়ালেস প্রসঙ্গে কিছু পাই নি, পাওয়ার আশাও ছিল না। তবে ডারউইন প্রসঙ্গে একটা বাক্য পাওয়া গেছে, বেশ সার্কাস্টিক ভঙ্গিতে লেখা, “বাংলা শব্দতত্ত্ব” বইয়ের “অভিভাষণ” নামক প্রবন্ধে–

যাঁরা মনে করেছেন বাইরে থেকে বাংলাকে সংস্কৃতের অনুগামী করে শুদ্ধিদান করবেন, তাঁরা সেই দোষ করছেন যা ভারতে ছিল না। এ দোষ পশ্চিমের। ইংরেজিতে শব্দ ধ্বনির অনুযায়ী নয়। ল্যাটিন ও গ্রীক থেকে উদ্ভূত শব্দে বানানের সঙ্গে ধ্বনির বিরোধ হলেও তাঁরা মূল বানান রক্ষা করেন। এই প্রণালীতে তাঁরা ইতিহাসের স্মৃতি বেঁধে রাখতে চান। কিন্তু ইতিহাসকে রক্ষা করা যদি অবশ্যকর্তব্য হয় তবে ডারউইন-কথিত আমাদের পূর্বপুরুষদের যে অঙ্গটি খসে গেছে সেটিকে আবার সংযোজিত করা উচিত হবে।

এখানে যে “অঙ্গ”-টির কথা বলছেন তা নিশ্চিত লেজই হবে। আর এই লেজের মাধ্যমে ডারউইনকে নিয়ে রঙ্গ অন্তত ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকায় যতোটা হয়েছে তাতে রবীন্দ্রনাথের সেটা অজানা থাকার কথা নয়।

কিন্তু আরেকটু ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে আসলটা বেরিয়ে এলো। আমি আশা করছিলাম ডারউইনের তত্ত্ব যে ঐক্যের কথা বলে সেটা রবীন্দ্রনাথের পছন্দ না হয়ে পারে না। সেটাই সত্য হল। “ডারুইন” লিখে সার্চ দেয়াতে “ভারতবর্ষে সমবায়ের বিশিষ্টতা” নামক প্রবন্ধে পেলাম এই কথা:

বৈজ্ঞানিক মহলে এক কালে প্রত্যেক জীবের স্বতন্ত্র সৃষ্টির মত প্রচলিত ছিল। জীবের স্বরূপ সম্বন্ধে তখন মানুষের ধারণা ছিল খণ্ডিত। ডারুইন যখন জীবের উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি মূলগত ঐক্য আবিষ্কার ও প্রচার করলেন তখন এই একটি সত্যের আলোক বৈজ্ঞানিক ঐক্যবুদ্ধির পথ জড়ে জীবে অবারিত করে দিলে।

যেমন জ্ঞানের ক্ষেত্রে তেমনি ভাবের ক্ষেত্রে তেমনি কর্মের ক্ষেত্রে সর্বত্রই সত্যের উপলব্ধি ঐক্যবোধে নিয়ে যায় এবং ঐক্যবোধের দ্বারাই সকল-প্রকার ঐশ্বর্যের সৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাপারে ঐক্যবোধের যোগে য়ুরোপে জ্ঞান ও শক্তির আশ্চর্য উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে এত উন্নতি মানুষের ইতিহাসে কোথাও আর-কখনো হয়েছে বলে আমরা জানি নে। এই উৎকর্ষলাভের আর-একটি কারণ এই যে য়ুরোপের জ্ঞানসমৃদ্ধিকে পরিপূর্ণ করবার কাজে য়ুরোপের সকল দেশের চিত্তই মিলিত হয়েছে।

Posted in রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | মন্তব্য দিন

দে রেরুম নাতুরা: সর্গ ১: প্রস্তাবনা (০১)

রোমান দার্শনিক ও কবি লুক্রেতিওস (Lucretius, খ্রিস্টপূর্ব ৯৯-৫৫) মহান গ্রিক দার্শনিক এপিকুরোসের (Epicurus, খ্রিস্টপূর্ব ৩৪১-২৭০) পুরো দর্শনকে একটি মহাকাব্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন, সেই কাব্যগ্রন্থের নাম “দে রেরুম নাতুরা” (De rerum natura), “On the nature of things” বা “বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে”। এপিকুরোস যেহেতু প্রথমবারের মত পুরো মহাবিশ্বের একটি যৌক্তিক বা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন সেহেতু লুক্রেতিওসের লাতিন ভাষায় লেখা মহাকাব্যকে প্রাচীন গ্রেকো-রোমান পদার্থবিদ্যা বা প্রাকৃতিক দর্শন সম্পর্কে মানুষের সকল ধারণার সমষ্টিগত প্রকাশ বলা যায়। এটাই হয়তো মানব সভ্যতার ইতিহাসে একমাত্র বিজ্ঞান বিষয়ক মহাকাব্য।

ঊনবিংশ শতকে এই কাব্যের ইংরেজি গদ্য-অনুবাদ করেছিলেন ব্রিটিশ পাদ্রী জন সেলবি ওয়াটসন (John Selby Watson, ১৮০৪-৮৪)। বিংশ শতকে এর একটি মেট্রিক্যাল অর্থাৎ প্রতিটি চরণের হুবহু ইংরেজি পদ্য-অনুবাদ করেছেন বিখ্যাত মার্কিন কবি উইলিয়াম এলরি লেনার্ড (William Ellery Leonard, ১৮৭৬-১৯৪৪)। আমি এটার বঙ্গানুবাদ পদ্য না গদ্য হিসেবে করব সে নিয়ে অনেকদিন দ্বিধায় ছিলাম। কাব্যের আমি “ক”-ও জানি না। কিন্তু হিসাব করে দেখলাম, চরণগুলো আলাদা করা থাকলে অর্থাৎ হুবহু লুক্রেতিওসের স্টাইলে লিখলে পড়তে বেশি আরাম লাগে। আবার গদ্যানুবাদে অর্থ বেশি পরিষ্কার হয়। তাই ঠিক করলাম, লেনার্ডের ইংরেজি পদ্যানুবাদ থেকেই চরণ অনুযায়ী অনুবাদ করব, কিন্তু অর্থ ঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য ওয়াটসনের গদ্য কাজে লাগাবো। এটাকে তাই ওয়াটসন ও লেনার্ডের বই দুটোর যৌথানুবাদ বলা যেতে পারে।

তবে অবশ্যই, শেষ পর্যন্ত এটা কিছুই হয়নি, না গদ্য, না পদ্য। একে সর্বোচ্চ- মোটামুটি আরাম করে পড়া যায় এবং অর্থ বুঝতে সমস্যা হয় না এমন একটা জগাখিচুড়ি বলা যেতে পারে।

*****
দে রেরুম নাতুরা
সর্গ ১
প্রস্তাবনা

রোমের জননী, দেবতা ও মানবের পরমানন্দ,
প্রিয়তম ভেনাস, যে তুমি ভাসমান তারকারাজির পটভূমিতে বসে
প্রাণ সঞ্চার করছো বহুভ্রমণে মুখরিত উত্তাল সমুদ্র
আর অগুনতি ফলবতী ভূমিতে,
তোমার কারণেই চরাচরের সমস্ত জীব অস্তিত্ব লাভ করে
এবং সূর্যের আমন্ত্রণে বসন্ত বরণ করে–
তোমার জন্যই, দেবী, বায়ু বয়, তোমার আগমনেই
স্বর্গের মেঘমালা হয় ছত্রভঙ্গ,
তোমার জন্যই বিচিত্রিতা পৃথিবী তার সুগন্ধী ফুলের পসরা সাজায়,
তোমার জন্যই সাগরের জলরাশি
হেসে ওঠে, এবং প্রশান্ত আকাশ
অত্যুজ্জ্বল আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে!
যখন বসন্তের আগমনবার্তা ধ্বনিত হয়,
এবং ফাভোনিওসের[১] সদয় প্রবাহ তার শক্তির স্ফূরণ ঘটায়,
তখন আকাশের পাখিরা, তোমার প্রবল প্রতাপে আবিষ্ট হয়ে,
হে দেবী, তোমারই আগমনের সাক্ষ্য দেয়,
অতঃপর বুনো পশুর দল আনন্দময় চারণভূমিতে চরে
এবং খরস্রোতা নদীতে সাঁতড়ে বেড়ায়। সুতরাং সকল
জীব তোমার মায়া এবং সম্মোহনে বিমোহিত হয়ে তোমাকেই অনুসরণ করে,
তুমি তাদেরকে যেদিকেই নিয়ে যাও না কেন।
জগতের শত সাগর, পাহাড়, আর চঞ্চল স্রোতধারায়,
কত পাখির নীড় আর সবুজের প্রান্তরে,
প্রতিটি জন্তুর অন্তরে প্রেম জাগিয়ে,
তুমিই প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভ্যুদয় ঘটাও,
একের পর এক। যেহেতু তুমি একাই
মহাবিশ্বের বিধানকর্ত্রী, এবং তোমার অনুমতি ছাড়া
একটি সত্ত্বাও ভুবনের আলোর মেলায় সামিল হতে পারেনা,
আনন্দ ও প্রেম নিয়ে জন্মাতে পারে না,
সেহেতু তোমাকেই আমার এই গানের সহযোগী মানলাম,
“বস্তুর প্রকৃতি” নিয়ে যে গান আমি রচনা করছি
আমার একান্ত বন্ধু মেম্মিওসের[২] জন্যে, যাকে, হে দেবী, তুমি
সকল গুণে গুণান্বিত করে সর্বদা সকল কাজে সফল করেছো–
সেজন্যে, হে স্বর্গচারিণী, আমার প্রতিটি শব্দকে
আরো অমর কর। সাথে ঘুমপাড়ানির গান শুনিয়ে
জল আর স্থলের সব বিধ্বংসী যুদ্ধের অবসান ঘটাও,
কেবল তুমিই তো মর্ত্যবাসীদের হৃদয় শান্ত
করতে পার; কেননা যে শোষক
“মঙ্গল”[৩] যুদ্ধের নৃশংসতায় নেতৃত্ব দেয়, সে-ই তো
ক্ষণে ক্ষণে তোমার কোলে ঢলে পড়ে–
তোমার চিরন্তন প্রেমদাহে পরাভূত হয়ে,
এবং তারপর শুকনো গলায় কামাতুর নয়নে
হাঁ করে তোমার মুখপানে চায়,
চোখজোড়া তার লোভে চকচক করে, আর তার গরম নিঃশাস
ছুঁয়ে যায় তোমার ঠোঁট। সেই অবদমিত “মঙ্গল”-কে তুমি
তোমার দেহের সব পবিত্রতা দিয়ে জড়িয়ে ধর!
তোমার ঠোঁট থেকে অমিয় বাণী ঝরিয়ে তাকে জিতে নাও,
মহিমান্বিত নারী, তোমার রোমান-দের জন্যই এটুকু কর!
কারণ রাষ্ট্রের এই অস্থির অরাজক সময়ে
আমিও আমার এই মহান কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারব না
আর এই বিশৃঙ্খলা ও দূর্যোগের মাঝে
মহান মেম্মিওসের পক্ষেও
জনগণের কথা ভুলে কাব্যপাঠ করা সম্ভব হবে না।

এখন, হে মেম্মিওস, সকল পূর্বধারণা ঝেড়ে ফেলে তোমার
উদার কর্ণজোড়া আমায় ধার দাও,
সব পিছুটান ভুলে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে ব্রতী হও,
এবং বিশ্বস্ত উৎসাহে আমি তোমার জন্য যে ডালি সাজিয়েছি
তা পুরোপুরি বোঝার আগে হেয় জ্ঞান করে উঠে যেও না।
কারণ আমি এখন তোমার সামনে স্বর্গ ও দেবতাদের পুরো জগৎ ও
সকল বস্তুর মৌলিক উপাদানের[৪] রহস্য উন্মোচন করব,
যে উপাদান দিয়ে প্রকৃতি সবকিছু নির্মাণ, বর্ধন ও প্রতিপালন করে, এবং
যাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত সবকিছুকে সে আবার বিলীন করে দেয়।
আমাদের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি এই উপাদানকে বলব
“পদার্থ”, “বস্তুর জন্মদায়ক কণা” বা “বস্তুর বীজ”;
এবং যেহেতু এরাই সকল কিছুর মৌলিক গাঠনিক উপাদান
সেহেতু কখনও কখনও “পরম কণা” নামটিও ব্যবহার করবো।

যখন জগতের সব মানুষ
শোচনীয়ভাবে পিষ্ট হচ্ছিলো–
আমাদের চোখের সামনে, ধর্মের ভারে,
যখন সে আকাশের সীমানায় তার বীভৎস রূপ দেখিয়ে
মর্ত্যের মানুষকে ভয় দেখাচ্ছিলো,
এক গ্রিক-ই[৫] প্রথম তার দিকে নশ্বর চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখিয়েছিলো,
যাকে দেবতাদের গল্পগাঁথা, বজ্রের হুঙ্কার,
কিংবা ভয়ংকরদর্শন আকাশের অশনি গর্জন কোনকিছুই
দমাতে পারেনি, বরং উল্টো আরও প্রাণশক্তিতে ভরপুর করে তুলেছে,
তাঁর নির্ভীক হৃদয়ই প্রথম চূর্ণ করেছে–
সেই পুরাতন প্রকৃতির লৌহ কপাট।
পরিশেষে তাঁর বলিষ্ঠ প্রজ্ঞার জয় হয়েছে
তাঁর প্রগতির বাণী ছড়িয়ে গেছে দিক থেকে দিগন্তরে–
স্বর্গ-মর্ত্যের সকল সীমানা ছাড়িয়ে,
চিন্তায় ও বুদ্ধিতে তিনি বিচরণ করেছেন অপরিমেয় ব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রান্তে,
বিজয়ীর বেশে ফিরে এসে জানাচ্ছেন
কোন জিনিসের উৎপত্তি ঘটতে পারে, কোনটির পারে না;
কোন নীতি দিয়ে নির্ধারিত হয় কোনো জিনিসের ক্ষমতা, বা
কোনকিছুর অনন্ত কাল ধরে অটল সীমান্তরেখা।
তাই এখন উল্টো ধর্মই আমাদের পায়ের তলে আর
আমরা তাঁর বিজয়মাল্য পরে উঠে গেছি স্বর্গের সমতলে।

পাদটীকা: এখানে

[TO BE CONTINUED…]

Posted in অনুবাদ, দে-রে-না | মন্তব্য দিন

ভার্টিগো: রজার ইবার্টের রিভিউ

“Did he train you? Did he rehearse you? Did he tell you what to do and what to say?”

আহত ও বেদনার্ত একটি চরিত্রের মুখে সিনেমার একেবারে শেষদিকে এই কথাগুলো শোনা যায়। ততক্ষণে আমরা চরিত্রটির প্রতি পুরোপুরি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছি। সে এমন এক নারীর প্রেমে পড়েছে যার কোন অস্তিত্ব নেই, এবং এই অস্তিত্বহীনাকে যে অস্তিত্ব দিয়েছিল সেই বাস্তব নারীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েই সে কথাগুলো বলছে। কিন্তু কাহিনী আরও স্পর্শকাতর। বাস্তবের নারীটি তার প্রেমে পড়ে গেছে, তাকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে নিজেই ফাঁদে পড়ে গেছে। আর পুরুষটি নিজের স্বপ্নকে রক্তমাংসের একজনের উপরে স্থান দিতে গিয়ে দুটোই হারিয়েছে।

এর উপরে আছে আরেক স্তর। আলফ্রেড হিচকক ইতিহাসের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রণকাতর চলচ্চিত্রকারদের একজন, বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলোর প্রতি। তার সব সিনেমাতেই ঘুরেফিরে নারী চরিত্রগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে: তাদের চুল সোনালী, তারা বরফ শীতল ও দূর দ্বীপবাসিনী, তারা এমন কিছু পোশাকের কারাগারে বন্দী যা কেতাদুরস্ত এবং বিশেষ করে কামনাব্যঞ্জক, তারা পুরুষদের পুরোপুরি সম্মোহিত করে ফেলে যে পুরুষদের আবার অধিকাংশ সময়ই কোন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকে, এবং এক সময় না এক সময় অবশ্যই হিচকক নারীরা লাঞ্ছিত হয়।

ভার্টিগো (১৯৫৮) হিচককের করা সেরা দুই বা তিনটি সিনেমার একটি এবং নিঃসন্দেহে এটিই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্বীকারোক্তিমূলক সিনেমা। কারণ তার আর্টকে যে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতো সেগুলো নিয়ে এখানে খুব খোলাসাভাবে কাজ করেছেন। হিচকক কিভাবে নারীদের ব্যবহার, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন তা নিয়ে ভার্টিগো। তার প্রতিনিধিত্ব করে স্কটি (জেমস স্টুয়ার্ট) যার মানসিক ও শারীরিক দুই দুর্বলতাই রয়েছে, যে একটি নারীর ছবিকে ভালবেসে ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে, যেন তেন নারী নয়, একেবারে হিচকক নারী। যখন সে তাকে পায় না তখন অন্য এক নারীকে তার মত পোশাক-মেকআপ পড়িয়ে, চুল রাঙিয়ে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন রূপ দেয়ার চেষ্টা করে যাতে তাকে হুবহু সেই রমণীর মত লাগে। এই পুতুল নারীর প্রতি তার কোন দয়া নেই, তাকে সে একটুও গ্রাহ্য করে না, নিজের স্বপ্নের বেদিতে তাকে অনায়াসে উৎসর্গ করতে পারে।

কিন্তু অবশ্যই যে নারীকে সে রচনা করছে এবং যাকে সে কামনা করে তারা একই। মেয়েটির নাম জুডি (কিম নোভাক); তাকে স্বপ্নের নারী, অর্থাৎ ম্যাডেলিনের ভূমিকায় অভিনয় করতে ভাড়া করা হয়েছিল এমন একটি খুনের মঞ্চ সাজানোর জন্য যা সম্পর্কে স্কটির মনে একটুও সন্দেহ জাগেনি। ভয়ংকর ফাঁদের শিকার হওয়ার বিষয়টি জানার পর সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, যদিও সব হিচকক পুরুষের মতোই তার মধ্যে কেবল এক ধরণের সুশীতল উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশই ঘটে। সে চিৎকার করে বলে: “Did he train you?…”- প্রতিটি অক্ষর তার হৃদয়ে একেকটি ছুরিকাঘাত, তারপরও পুরো কথাটা বের না করে থাকতে পারে না- সে যে নারীর আদলে জুডিকে গড়ে তুলতে চাচ্ছিল সেই স্বপ্নের নারীই আরেকজন পুরুষের সৃষ্টি। সেই পুরুষ কেবল স্কটির নারীই কেড়ে নেয়েনি, তার স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে।

এটা ভার্টিগোর একেবারে কেন্দ্রে একটি নৈতিক আপাতস্ববিরোধিতার জন্ম দেয়। অন্য পুরুষটি অর্থাৎ গেভিন (টম হেলমোর) এই নারীর প্রতি যা করেছে সে নিজেই তো তা করতে চেয়েছিল। এই পুতুল খেলার মধ্যবিরতিতে মেয়েটি গেভিনের বদলে স্কটির প্রতি অনুগত হয়ে পড়ে, এবং শেষদিকে টাকার জন্য নয় বরং ভালবাসার জন্য অভিনয় করতে থাকে।

এই সব সুতো একত্রিত হয় হিচককের চলচ্চিত্র জীবনের সেরা দৃশ্যে। স্যান ফ্রান্সিস্কো পুলিশ বিভাগের প্রাক্তন গোয়েন্দা স্কটিকে তার বন্ধু গেভিন ভাড়া করেছিল তার স্ত্রী ম্যাডেলিনকে অনুসরণ করার জন্য। তা করতে গিয়ে স্কটি মেয়েটির প্রতি ভয়ানক আসক্ত হয়ে পড়ে। এরপর মনে হয় ম্যাডেলিন মারা গেছে। এ আপাত মৃত্যুর পর একদিন কাকতালীয়ভাবে স্কটি জুডিকে দেখে; সে দেখতে ম্যাডেলিনের মত, যেন তার আরও কামনাময়ী ও স্বল্প মার্জিত একটি সংস্করণ। অবশ্যই সে বুঝতে পারে না যে দুজন একই নারী। সে তাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানায় এবং জুডি বেশ অপরিণামদর্শীর মতই রাজি হয়ে যায়। তাদের স্বল্পস্থায়ী অদ্ভূত ও আড়ম্বরপূর্ণ অভিসারের সময় মেয়েটি স্কটির প্রতি করুণা ও মায়া অনুভব করে। সুতরাং স্কটি যখন তাকে ম্যাডেলিনের মত করে সাজানোর প্রস্তাব দেয়ে তখন আহত হলেও দ্বিতীয়বারের মত একই চরিত্রে অভিনয় করতে সম্মত হয়।

সেরা দৃশ্যটি ঘটে হোটেলের ঘরে, নিয়ন আলোর আবেশে। জুডি পার্লার থেকে ঘরটিতে ফিরে আসে। স্কটি সন্তুষ্ট হয় না কারণ তাকে হুবহু ম্যাডেলিনের মত দেখাচ্ছে না, একই পোশাক পড়লেও তার নির্দেশনা মত চুল সাজানো হয়নি। জুডির চোখ ঈর্ষায় জ্বলে উঠে। সে বুঝতে পারে তার প্রতি স্কটি নির্বিকার, তাকে সে কেবলই একটি বস্তু হিসেবে দেখে যাকে ইচ্ছামত গড়ন দেয়া যাবে। কিন্তু ভালবাসে বলে সে সব মেনে নেয়। স্নানঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চুলের সাজ পাল্টায়, তারপর দরজা খুলে যখন স্কটির দিকে হেঁটে আসে তখন মনে হয় সে যেন একটি অলক্ষুণে সবুজাভ ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে। নিয়ন আলো দিয়েই এই অদ্ভুতুড়ে ধোঁয়াশা ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি স্বপ্নদৃশ্য।

হিচকক এ সময় স্কটি ও জুডির মুখ একের পর এক দেখাতে থাকেন। জুডির মুখে দেখা যায় অসীম বেদনা ও দুঃখের মাঝেও সন্তুষ্ট করার বাসনা, আর স্কটির মুখে পরম লালসা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হওয়ার আনন্দ। তবে আমরা দুজনেরই হৃদয় ভেঙে যাওয়ার বেদনা অনুভব করি: তারা দুজনেই একটি ছবির দাসে পরিণত হয়েছে, যে ছবি এমন এক ব্যক্তি তৈরি করেছে যে এই ঘরেও নেই। গেভিন “ম্যাডেলিন”-কে তৈরি করেছিল নিজের স্ত্রীকে হত্যা করে পার পাওয়ার জন্য।

স্কটি যখন “ম্যাডেলিন”-কে জড়িয়ে ধরে তখন এমনকি পটভূমিও পরিবর্তিত হয়ে যায়, ঘরটি বাস্তব দৃশ্যের পরিবর্তে স্কটির একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিতে ভরে ওঠে। বার্নার্ড হারমানের সুর এক ধরণের ভয়কাতর ও অস্থির ব্যাকুলতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এবং ক্যামেরা হতাশাজনকভাবে তাদেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, অনেকটা স্কটির স্বপ্নে দেখা কাগজের চরকার মত। ক্যামেরার ঘূর্ণন চলতেই থাকে যতক্ষণ না দৃশ্যটির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে মানুষের কামনা-বাসনার নিরর্থকতা। জীবনকে আমাদেরকে সুখী করতে বাধ্য করা যে সম্ভব নয়- সেই সত্যই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। মনস্তাত্ত্বিক, শৈল্পিক ও কারিগরি দিক দিয়ে প্রচণ্ড জটিল এই দৃশ্য বোধহয় হিচককের সমগ্র ক্যারিয়ারের একমাত্র মুহূর্ত যখন তিনি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করেছেন, তার বিষাদ ও আসক্তির পুরোটাই। (এটা কি কেবলই কাকতালীয় যে মেয়েটির নাম ম্যাডেলিন- একটি ফরাসি বিস্কুটের নাম- যা বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের গল্পে শৈশবের স্মৃতি ও ব্যাকুলতাকে বানের জলের মত উঠিয়ে আনে?)

আলফ্রেড হিচকক সর্বজনীন অনুভূতি যেমন ভয়, অপরাধবোধ, লালসা ইত্যাদি একেবারে সাধারণ কিছু চরিত্রের মধ্যে স্থাপন করেছেন এবং তাদের সেই অনুভূতিগুলোকে শব্দের চেয়ে ছবির মাধ্যমে বেশি প্রকাশ করেছেন। তার সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত চরিত্র- ভুলক্রমে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নিরপরাধ ব্যক্তি- আসলে অনেক গভীর আত্মপরিচয়বোধ থেকে উৎসারিত; এ যুগের বাগাড়ম্বরপূর্ণ অগভীর সুপারহিরো অ্যাকশন সিনেমাগুলো যার ধারেকাছেও যেতে পারবে না।

হিচকক দুই দিক থেকে একজন বিশাল ভিজ্যুয়াল শিল্পী: তিনি খুব অবশ্যম্ভাবী কিছু ছবি নিয়ে খুব সূক্ষ্ণ প্রেক্ষাপট স্থাপন করেন। যেমন জেমস স্টুয়ার্টের চরিত্রের ভার্টিগো অর্থাৎ উচ্চতাভীতি খুব স্বাভাবিক একটি দৃশ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে। শুরুর একটি দৃশ্যে একটি ছোট মইয়ের মত চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে তাকে নিচের রাস্তার দিকে তাকাতে দেখা যায়। তাকানোর মুহূর্তটিতে ফ্ল্যাশব্যাকে আমরা তার পুলিশের চাকরি ছাড়ার কারণটি দেখতে পাই। একটি খ্রিস্টান মিশনের ঘণ্টার টাওয়ার তাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে।

হিচকক একটি বিখ্যাত দৃশ্যের মাধ্যমে স্কটির দৃষ্টিভঙ্গি দেখান, আমাদেরকে টাওয়ারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে। তিনি ক্যামেরার লেন্স জুম করেন এবং একইসাথে পুরো ক্যামেরাটিকে পেছনের দিকে টানেন, এতে মনে হয় দেয়াল একইসাথে সামনে ও পেছনের দিকে যাচ্ছে। হিচকক সৃজিত এই স্থান কেবল দুঃস্বপ্নের যুক্তি দিয়েই সিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু একইসাথে লক্ষ্যণীয় কিভাবে তিনি খুব সূক্ষ্ণভাবে অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমার মধ্যে পতনের অনুভূতিগুলো গেঁথে দিয়েছেন। যেমন, স্কটির গাড়ি সবসময় স্যান ফ্রান্সিস্কোর পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নামে, কখনও উপরে ওঠে না; এবং দেখার বিষয় কিভাবে স্কটি সত্যিকার অর্থেই ভালবাসায় “পতিত” হয়।

আরও একটি উপাদান ভার্টিগো সিনেমাকে মহান করেছে যা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। শুরুতে সিনেমাটি কেবলই ম্যাডেলিনকে নিয়ে ছিল, কিন্তু যে মুহুর্তে আমরা গোপন সত্যটি জানতে পারি তখন থেকে তা একই পরিমাণ জুডিকে নিয়ে: তার বেদনা, তার হানি, যে ফাঁদে সে পতিত তার সবকিছু নিয়েই। হিচকক পুরো গল্পটাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে দুটি চরিত্র যখন মিশন টাওয়ারের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে, তখন আমরা দুজনের সাথেই নিজিদের যুক্ত করতে পারি, দুজনের জন্যই আমাদের ভয় হয়, এবং একদিক থেকে চিন্তা করলে জুডিকে স্কটির তুলনায় কম অপরাধী মনে হয়।

তবে নোভাক অভিনীত জুডি চরিত্রটিকে স্কটি যেমন বস্তু হিসেবে দেখে অনেক দর্শকও সেভাবে দেখে ফেলতে পারেন যা বেশ বিপদের কথা। আসলে জুডি হিচককের সব সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে সহানুভূতিশীল চরিত্রগুলোর একটি।

হিচকক বারংবার তার সিনেমার নারী চরিত্রগুলোকে আক্ষরিক এবং আলঙ্কারিক অর্থে অপদস্ত করেছেন, তাদেরকে মাটিতে দলেছেন, তাদের চুল এবং কাপড় নষ্ট করেছেন; এসবের মাধ্যমে অনেকটা যেন নিজের ফেটিশগুলোকেই কশাঘাত করেছেন। ভার্টিগোর জুডির মাধ্যমে তিনি নিজের গল্পের বলি হওয়া কোন নারীর প্রতি সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশী সহানুভূতি দেখিয়েছেন। আর নোভাক, জুডির চরিত্রটি বেশি অনমনীয় ভাবে করার জন্য প্রথমে যার সমালোচনা করা হয়েছিল, আসলে অভিনয়ের ক্ষেত্রে ঠিক সিদ্ধান্তগুলোই নিয়েছিলেন। নিজেকে জিজ্ঞাস করুন আপনি অসহনীয় কষ্টের মধ্যে থাকলে কিভাবে চলতেন, কিভাবে কথা বলতেন, তারপর আবার জুডির দিকে তাকান।

লেখক – রজার ইবার্ট
অনুবাদ – শিক্ষানবিস
প্রথম প্রকাশ – চলচ্চিত্র উইকি

Posted in থ্রিলার | মন্তব্য দিন

ম্যাজেলানীয় মেঘের রহস্য উন্মোচন

আমাদের গ্যালাক্সির নাম আকাশগঙ্গা। এর ব্যাস যেকোন সাধারণ সর্পিল গ্যালাক্সির মতোই, প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ, আর এতে তারার সংখ্যা ২০ থেকে ৪০ হাজার কোটি। আমাদের স্থানীয় গ্যালাক্সি জগতের অন্য সব গ্যালাক্সিই কোন না কোনভাবে আকাশগঙ্গার মহাকর্ষের টান অনুভব করে। আনুমানিক দুই ডজন ছোটখাটো গ্যালাক্সির ওপর আমাদের টান এতোই বেশি যে তাদেরকে আমাদের গ্যালাক্সির স্যাটেলাইট বলা হয়। স্যাটেলাইটের বাংলা উপগ্রহ, কিন্তু শব্দটি গ্রহের সাথে এতো বেশি সংযুক্ত যে স্যাটেলাইট গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা বেশ ঝামেলার, তাই ‘স্যাটেলাইট’ নামটিই এখানে প্রনিধানযোগ্য।

আকাশগঙ্গার স্যাটেলাইট গ্যালাক্সিগুলোকে মোটামোটি চারভাগে ভাগ করা যায়: ম্যাজেলানীয় মেঘ, উপবৃত্তাকার স্যাজিটারিয়াস, বামন গ্যালাক্সি এবং অন্যান্য। নামেই পরিচয়, যেমন ম্যাজেলানীয় মেঘ পৃথিবীর আকাশে দেখতে অনেকটা কোন সুদূর মেঘের মতো, স্যাজিটারিয়াস তারামণ্ডলে অবস্থিত গ্যালাক্সিগুলো প্রায় উপবৃত্তাকার আর অপেক্ষাকৃত ছোটগুলো বামন। এদের মধ্যে একটি বিশেষ কারণে ম্যাজেলানীয় মেঘ সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ম্যাজেলানীয় মেঘ মূলত দুইটি গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র এবং তাদেরকে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে দেখা যায়। এরা আকর্ষণীয় কারণ, আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় টানে একমাত্র এই স্যাটেলাইটগুলো ছাড়া অন্য সবাই তাদের সব গ্যাস হারিয়ে ফেলেছে। গ্যাসহীন গ্যালাক্সিতে নতুন তারার জন্ম অসম্ভব, কারণ গ্যাস ঘনীভূত হয়েই তারা তৈরি করে। তাই একমাত্র ম্যাজেলানীয় মেঘেই নতুন, অতি-উজ্জ্বল তারার দেখা মেলে।

বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র ম্যাজেলানীয় মেঘ

প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য সবাগুলোর মত ম্যাজেলানীয় মেঘ থেকেও কেন আকাশগঙ্গা সব গ্যাস বের করে আনতে পারল না? এর উত্তর জানার মত ক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়েছে অতি সাম্প্রতিক সময়ে। অনুমান করা হয়েছিল, ম্যাজেলানীয় মেঘ আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি দূরত্বে থেকে আকাশগঙ্গাকে আবর্তন করে। অতীতে আমাদের ধারণা ছিল এই মেঘদ্বয়ের কক্ষপথ আমাদের থেকে ১০০-২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। কিন্তু ২০০৬ সালে হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর বিজ্ঞানী নিটিয়া কালিভায়ালিলের (Nitya Kallivayalil) নেতৃত্বে একটি গবেষক দল প্রস্তাব করেন, এই কক্ষপথ অন্তত ৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটা সত্যি হলে ম্যাজেলানীয় মেঘের রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত হতো। কারণ কক্ষপথ দূরে হলে তার ওপর আমাদের মহাকর্ষীয় টান কম হবে এবং তথাপি তার গ্যাস হারানোর সম্ভাবনাও অনেক কমে যাবে।

নিটিয়া প্রস্তাবটি করেছিলেন হাবল মহাকাশ দুরবিন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাবলের নতুন তথ্য আরও ভালভাবে বিশ্লেষণ করে নিটিয়া তার পূর্ব অনুমানকেই সত্য প্রমাণ করেন। ম্যাজেলানীয় মেঘ যে আমাদেরকে অন্তত ৪০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থেকে আবর্তন করে তা নিয়ে এখন কোন সন্দেহ নেই বললেই চলে। তার বদলে এখন তৈরি হওয়া নতুন সন্দেহটি হচ্ছে, এই গ্যালাক্সি দুটি আসলেই আমাদেরকে আবর্তন করছে কিনা। আবর্তন করলেও তাদের কক্ষপথ যে ভয়ানক উপবৃত্তীয় তা নিশ্চিত। অর্থাৎ কোন সময় ম্যাজেলানীয় মেঘ আমাদের থেকে অনেক দূরে সরে যায়, আবার কখনও বা খুব কাছে চলে আসে। মহাবিশ্বের ইতিহাসে সম্ভবত মাত্র একবারই এরা আমাদের কাছে আসার সুযোগ পেয়েছে, এবং সেই সময়টা এখন। এ কারণেই তাদের তারাগুলোকে পৃথিবী থেকে এতো উজ্জ্বল দেখায়।

কক্ষপথ এতো উপবৃত্তীয় এবং দূরত্ব এতো বেশি হওয়ার কারণেই ম্যাজেলানীয় মেঘ গ্যাস হারায়নি এবং এখনও উজ্জ্বল নবীন তারা তৈরি করতে পারছে। তবে ক্ষুদ্র মেঘটির অবস্থা এতো ভাল নয়, বেশ করুণই বলতে হবে। আকাশগঙ্গার চেয়ে তার উপর বৃহৎ ম্যাজেলানীয় মেঘের আকর্ষণ অনেক বেশি, সেই আকর্ষণে সে বেশ দ্রুত গ্যাস হারাচ্ছে এবং অচিরেই হয়তো সব গ্যাস হারিয়ে একটি ভুতুড়ে বামন উপগোলকীয় (spheroidal) গ্যালাক্সিতে পরিণত হবে। বামন উপগোলকীয় গ্যালাক্সিতে গ্যাস এবং তথাপি কোন নবীন তারা থাকে না, যে কারণে তাদেরকে ভুতুড়ে দেখায় বললে ভুল হবে না।

Reference: Ken Croswell, Unraveling a Magellanic Mystery, Scientific American, April 2013

Posted in আকাশগঙ্গা | মন্তব্য দিন

রেনেসাঁর জ্যোতির্বিদগণ


রেনেসাঁ যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্মস্থান এবং কর্মস্থল দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে কে কোন কোন জায়গায় থেকেছেন তাও দেখানো হয়েছে।

Posted in Uncategorized | 3 টি মন্তব্য

টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেল

টলেমির মডেল ব্যাখ্যার একটা চেষ্টা করলাম। আরও অনুশীলন করলে আরও ভাল হতো সন্দেহ নেই, কিন্তু ধৈর্য্যের অভাব।

http://www.shikkhok.com/2012/10/astronomy-101-01-02/

Posted in ইতিহাস, গ্রহবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ১০১ | মন্তব্য দিন

হিগস কণা

আমার মাস্টার্স থিসিসের কারণে অন্যদিকে মন দেয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তারপরও ভাবলাম হিগস নিয়ে একটা আলোচনা শুরু হতে পারে। সেই সাথে একটা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা যেতে পারে: দেখি কে কতক্ষণ হিগস কণাকে সেই “ফালতু নামটিতে” ডাকা থেকে বিরত থাকতে পারে… :D

এক বন্ধু কি আবিষ্কৃত হয়েছে জানতে চেয়ে মেইল করেছিল তার উত্তর দিতে গিয়ে আমি বেশ কিছুটা লিখে ফেলেছি। সেটাই ভাবলাম এই নোটে পোস্ট করে রাখি। আমি আসলে গতকালের ঘোষণার ডিটেল কিছু জানি না, তাদের প্যারামিটার, কনফিডেন্স লেভেল সম্পর্কেও বিস্তারিত খবর নেইনি। থিসিস শেষ হলে নেব, মানে ২০ তারিখের পর। তবে হিগস বুঝতে সেই ফলাফলের ডিটেল না জানলেও চলবে। তাই সংক্ষিপ্ত বয়ান শুরু হোক:

প্রকৃতির সকল জানা পদার্থ এবং শক্তি যেসব মৌলিক কণা দিয়ে গঠিত তাদের শ্রেণীবিন্যাসের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল, মৌলিক পদার্থের যেমন পর্যায় সারণী, মৌলিক কণাদের তেমন স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেলের স্থায়ী কণাগুলোর সার্বিক শ্রেণীবিন্যাস এমন:

কণা দুই ধরণের: ফার্মিয়ন (পদার্থের গাঠনিক উপাদান) এবং বোসন (শক্তির গাঠনিক উপাদান)। তো সব ফার্মিয়নেরই ভর আছে। কিছু বোসনেরও আবার ভর আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল দিয়ে কোনভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না এই ভরের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে। মানে স্ট্যান্ডার্ড মডেল কণাগুলোর ভরের উপর নির্ভর করতো না, ভর না থাকলে সমীকরণ যা ভর থাকলেও তা।

এই প্রেক্ষিতে পিটার হিগস ষাটের দশকে ভরের উৎপত্তির একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তিনি বলেন প্রকৃতির সর্বত্র একটা ফিল্ড বা ক্ষেত্র আছে, যাকে পরবর্তীতে হিগস ক্ষেত্র নাম দেয়া হয়। সকল কণাকেই এই ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। যে যত সহজে চলতে পারে তার ভর তত কম। মানে ভরকে সে হিগস ফিল্ডে চলনক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে: এই ক্ষেত্রটা কি দিয়ে গঠিত? বলা হল, একটা কণা থাকতে হবে যা দিয়ে এই ফিল্ড গঠিত, নাম দেয়া হল হিগস কণা। সেদিক দিয়ে হিগস কণাই হবে সকল কণার ভর প্রদায়ক।

হিগস আবার সবচেয়ে মৌলিক কণাও বটে, যার ভর এবং শক্তি সবচেয়ে বেশি (এখানে অবশ্য ভর-শক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই)। LHC তে প্রোটনের সাথে প্রোটনের সংঘর্ষ ঘটানোর মাধ্যমে মৌলিক কণা তৈরি করা হয়। গ্লাস মেঝেতে ফেললে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, যত জোড়ে ফেলা হবে তত বেশি টুকরো হবে। তেমনি প্রোটনের সাথে প্রোটনের যত শক্তিশালী সংঘর্ষ ঘটানো হবে তত মৌলিক কণার সন্ধান পাওয়া যাবে। হিগসের শক্তি তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করা হয়েছিল। প্রোটন-প্রোটন কে যদি তার চেয়ে বেশি শক্তিতে সংঘর্ষ করানো না যায় তাহলে হিগস পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নাই।

গত ২ বছর ধরে তেমন শক্তিতেই প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষ ঘটানো হয়েছে। ফলাফল হিসেবে এমন একটা কণা পাওয়া গেছে যার শক্তি ১২৫ গিগা ইলেকট্রন ভোল্টের (আলোর গতির এককে) কাছাকাছি। হিগসের শক্তিও এমন হওয়ার কথা। উল্লেখ্য আর কোন কণার ভরই এমন হওয়া সম্ভব না। আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিচের ছবিটা দেখেন: গতকালই এই গ্রাফ প্রকাশ করা হয়েছে। ১২৫ জিইভি-র কাছাকাছি একটা টিলা চোখে পড়ে কি?

Mass distribution for the two-photon channel. The strongest evidence for this new particle comes from analysis of events containing two photons. The smooth dotted line traces the measured background from known processes. The solid line traces a statistical fit to the signal plus background. The new particle appears as the excess around 126.5 GeV. The full analysis concludes that the probability of such a peak is three chances in a million.

হিগসের পরিচয় খুব সুন্দর ও সহজভাবে পেতে চাইলে পিএইচডি কমিক্স এর এই ভিডিওটি দেখা যেতে পারে,

The Higgs Boson Explained from PHD Comics on Vimeo.

হিগস কণা বিষয়ক অন্যান্য লিংক:
: হ্যাড্রন সংঘর্ষপীঠে নতুন কণা আবিষ্কার
: হ্যাড্রন সংঘর্ষপীঠে হিগসের ছটা
: Live-Blogging the Higgs Seminar
: Latest Results from ATLAS Higgs Search
: CERN Higgs Boson July 4th 2012 press conference (full video)
: Higgs boson-like particle discovery claimed at LHC
: সার্ন থেকে হিগ্‌স বোসন – প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে!, অভিজিৎ রায়

Posted in কণা পদার্থবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান | 6 টি মন্তব্য

দ্য থার্টি নাইন স্টেপস

হিচকক অধিকাংশ সিনেমা যুক্তরাষ্ট্রে বানিয়েছেন দেখে আমরা ভুলেই যাই যে তিনি আসলে ব্রিটিশ এবং ইংল্যান্ড বানানো সিনেমাগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন দ্য থার্টি-নাইন স্টেপস এ হিচককীয় সিনেমার প্রধান সব বৈশিষ্ট্যই পূর্ণরূপ পেয়ে গিয়েছিল। হিচককীয় থ্রিলারের মূল বৈশিষ্ট্য- গতি, পরম সুন্দরী ব্লন্ড নায়িকা, নির্দোষ নায়কের গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে যাওয়া। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই ৩৯ স্টেপসে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে নায়কের পালিয়ে বেরানো পরবর্তীতে হিচককের অনেক সিনেমায় এসেছে- স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেইন, দ্য রং ম্যান, ভার্টিগো, নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট এবং দ্য ম্যান হু ন্যু টু মাচ। তবে গতির দিক দিয়ে এই সিনেমা একেবারে অনন্য। এত চমৎকারভাবে কাজটা করেছেন যে অনেক সময় নির্বাক ও সবাক সিনেমার সীমারেখা ধূসর হয়ে যায়।

স্পয়লার অ্যালার্ট শুরু

রিচার্ড হ্যানে নামক এক কানাডীয় নাগরিক বর্তমানে লন্ডনে বাস করছে। লন্ডনের এক মিউজিক হলে ‘মিস্টার মেমরি’ নামক এক শ্রুতিধরের স্ট্যান্ডআপ বিনোদনে বিনোদিত হচ্ছিল সে। এমন সময় প্রেক্ষাগৃহে গুলির শব্দ, হুড়োহুড়ি করে সবাই বেরিয়ে আসে। হ্যানে বের হতে সাহায্য করে অ্যানাবেলা স্মিথ নামের একটি মেয়েকে যে পরবর্তীতে তার বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ দেখায়। বাড়িতে আসার পর অ্যানাবেলা নিজেকে একজন স্পাই বলে দাবী করে, বাড়ির সামনের রাস্তায় সত্যিই দুজন লোক হাঁটাহাটি করছে দেখে হ্যানে তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ইংল্যান্ড থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার হতে চলেছে, নাম থার্টি নাইন স্টেপস, বিষয় অ্যারোনটিক্স। ঘুমনোর আগে অ্যানাবেলা স্কটল্যান্ডের মানচিত্র চায় এবং জানায় যে বিষয়টার সমাধানের জন্য তাকে স্কটল্যান্ডে বসবাসরত একজনের সাথে অবশ্যই দেখা করতে হবে যার একটি আঙুল অর্ধেক কাঁটা। কিন্তু রাত পোহানোর সুযোগ না দিয়েই অ্যানাবেলা নিহত হয়। ভোরে হ্যানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, লক্ষ্য স্কটল্যান্ডের সেই গ্রাম যেখানে আধা-আঙুলওয়ালার সাক্ষাৎ মিলবে। কিন্তু এর মধ্যে লন্ডনের সব পত্রিকায় ফলাও করে এক বেনামী (অ্যানাবেলা) নারীর হত্যা-সংবাদ প্রকাশিত হয়, হত্যার জন্য দায়ী করা হয় যথারীতি বাড়ির মালিক রিচার্ড হ্যানেকে। খুনের দায় মাথায় নিয়ে ইংল্যান্ডের মহামূল্যবান তথ্য দেশের ভেতর রাখতে ছুটে বেড়ায় হ্যানে, তার সাথে সাথে ক্যামেরা। বিস্তারিত পড়ুন

Posted in ফিল্ম রিভিউ | মন্তব্য দিন