লুনার রিকনিসন্স অর্বিটার

2009 জুন 20
by Khan Muhammad

রোমান্টিক সাহিত্যের সাবজেক্ট থেকে চাঁদ এখন আমাদের ঔপনিবেশিক সাবজেক্টে পরিণত হয়েছে। চাঁদ নিয়ে গবেষণা তো হচ্ছেই, সেই সাথে চাঁদে বসে গবেষণারও চেষ্টা চলছে। তবে এই গোলগাল অপার্থিব বস্তুটাকে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে সাহিত্যই বড় ভূমিকা রেখেছে। সাহিত্য বলতে অবশ্যই এখানে কল্পবিজ্ঞান বুঝতে হবে। সবচেয়ে চমৎকার বোধহয় কেপলারের লেখা কল্পবিজ্ঞান গল্পটি যেখানে দেখানো হয়েছিল এক ডাইনি বুড়ি চন্দ্রগ্রহণের সময় ছায়া বেয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে চলে গেছে। তবে উনবিংশ শতকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছিল জুল ভার্নের ফ্রম আর্থ টু দ্য মুন।

কয়েকদিন আগে মাইকেল অ্যান্ডারসনের “অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইস” সিনেমাটা দেখছিলাম। এটাও জুল ভার্নের উপন্যাস থেকে করা। এই সিনেমার একেবারে শুরুতে আরেকটি ঐতিহ্যবাহী সিনেমার ক্লিপ দেখানো হয়েছে। সেই যুগ সৃষ্টিকারী সিনেমার নাম Le Voyage dans la lune যার ইংরেজি হচ্ছে আ ট্রিপ টু মুন। ১৯০২ সালে মুক্তি পাওয়া এই ফরাসি সিনেমাটা করা হয়েছে জুল ভার্নের ফ্রম আর্থ টু দ্য মুন অবলম্বনে। নির্বাক এবং অবশ্যই সাদাকালো এই সিনেমা দেখে চাঁদের মোহ বেড়ে গেছে। এখানে দেখলাম, মানুষ রকেটে করে চাঁদে গেছে এবং গিয়ে অবতরণ করেছে একেবারে চাঁদের মুখে। দেখলাম চাঁদ আসলে একটা মানুষের মুখ যার চোখ, নাক, মুখ সবই আছে। রকেট গিয়ে গেঁথেছে ঠিক মুখের মধ্যে। রকেট থেকে নেমে এক রূপকথার জগতের সন্ধান পায় মানুষ।

এসব রূপকথার যুগ ফুরিয়েছে। এখন আর চাঁদ নিয়ে ফ্যান্টাসি গল্প লেখে না। চন্দ্রীয় কল্পবিজ্ঞান যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই বিজ্ঞানীরা শুরু করেছে। সবকিছুর ক্ষেত্রেই বোধহয় এমনটি হয়, কল্পবিজ্ঞান যেখানে শেষে বিজ্ঞানের সেখানেই শুরু। অন্যভাবে বলা যায়, বিজ্ঞান যা এখনও অর্জন করতে পারেনি তা নিয়েই কল্পবিজ্ঞান।

তবে চাঁদ নিয়ে আআমেরিকা রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধকালীন অস্থিরতাকে আমি সমর্থন করি না। মাত্র তিন বছরে পরপর ছয় বার চাঁদে গিয়ে চিরদিনের মত চন্দ্রাভিযান বন্ধ করে দেয়ার কোন যৌক্তিকতা পাই না। নাসার এই কাণ্ডটা আসলেই ধাঁধায় ফেলে দেয়। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ছয়টি নভোযান মানুষ নিয়ে চাঁদে গেছে। প্রতিটিতে দুজন করে মানুষ ছিল। মোট ১২ জন চাঁদের মাটিতে হেটেছে। রোবট প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়নি বলেই হয়থ তারা মানুষ পাঠানোর তাড়া অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সেটা এমনভাবে থামিয়ে দেয়ার কারণ খুঁজে পাই না। ১৯৭০ এর দশকে মানুষ মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যতটা আশাবাদী ছিল এখন ততটা হতে পারে। তখন সবাই ভাবতো ২০০০ সালের মধ্যে মানুষ মঙ্গলে চলে যাবে। সেটা হয়নি, হোক তাও চাই না। কারণ ছাড়া মানুষ পাঠানোর প্রয়জোন নেই তেমন। রোবট থাকতে মানুষ পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না।

লুনার রিকনিসন্স অর্বিটার, উৎক্ষেপণের আগে।

লুনার রিকনিসন্স অর্বিটার, উৎক্ষেপণের আগে।

অনেকদিন পর আবার আশা দেখতে পাচ্ছি। গত ১৮ই জুন চাঁদের উদ্দেশ্যে পৃথিবী ত্যাগ করেছে নাসার “লুনার রিকনিসন্স অর্বিটার”। অনেকদিন থেকেই এই মিশনের নাম শুনছিলাম। রিকনিসন্স শব্দ দ্বারাই আবেগটা বোঝা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে চাঁদ নিয়ে আবার সিরিয়াস চিন্তাভাবনা শুরু হবে। চাঁদ নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে আছে:

- চাঁদের উল্টো পৃষ্ঠে (যে পৃষ্ঠ পৃথিবী থেকে কখনই দেখা যায় না) একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির স্থাপন
- স্বয়ং মানুষ গিয়ে চাঁদের ভৌগলিক দিকগুলো নিয়ে আরও গবেষণা করা। এটা ইতিমধ্যে হয়েছে তবে এবার অবশ্যই আরও আধুনিক তথা সূক্ষ্ণ যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হবে।

এই রিকনিসন্স অর্বিটার এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই কাজ করবে, পরোক্ষভাবে। অর্বিটার শব্দ দ্বারাই বোঝা যাচ্ছে এটা চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবে না, চারদিকে ঘুরপাক খাবে। এবং ঘুরতে ঘুরতেই পুরো চাঁদের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরী করবে। আরও যা যা করবে তা হল:
- কোথায় মানুষ অবতরণ করতে পারে তা চিহ্নিত করা
- অ্যাপোলো মিশনের পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি খুঁজে বের করা
এছাড়া আরও অনেক ধরণের উদ্দেশ্য আছে যা নিচে সংযুক্ত লিংকগুলোতে গেলেই জানা যাবে।

অর্বিটারের কাল্পনিক ছবি

অর্বিটারের কাল্পনিক ছবি

আমি এই মিশন নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কারণে। পড়ার ইচ্ছা রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে। রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বর্তমানে চাঁধের উল্টো পিঠে একটা মানমন্দির আবশ্যক হয়ে পড়েছে। এটা তাদেরকে মহাবিশ্বের ইতিহাস উদঘাটনে সাহায্য করবে। মহাবিশ্বের ইতিহাসে dark ages তথা অন্ধকার যুগ নামে একটা সময় যে সময় সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। এ সম্বন্ধে জানা দরকার কারণ তখনই প্রথম ছায়াপথ ও তারা গঠিত হয়েছিল। আর এই যুগ নিয়ে জানার একমাত্র উপায় ২১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক বিশেষ তরঙ্গ। এই তরঙ্গ যখন শোষিত বা বিকিরিত হচ্ছিল তখন মহাবিশ্বের লাল সরণ ছিল ৬ থেকে ২০ এর মধ্যে। পৃথিবীতে বসে আমরা যে তরঙ্গ পাব সেটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অবশ্যই ২১ সেমি হবে না। কারণ লাল সরণের কারণে এটা অনেক বড় হয়ে গেছে।

যাহোক পৃথিবী থেকে এই দুর্বল সংকেত সনাক্ত করা যাচ্ছে না। কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। বিশেষত আয়নমণ্ডল। চাঁদে এই সমস্যাটা থাকবে না। পৃথিবীতে অবশ্যই এই সংকেত সনাক্তকরণের জন্য বেশ কিছু দুরবিন স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। এজন্যই মহাবিশ্বের ইতিহাস চর্চার অগ্রদূত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এব্রাহাম লোব চাঁদের উল্টো পিঠে একটি ২১ সেমি দুরবিন স্থাপনের উপর জোড় দিয়ে থাকেন। এ নিয়ে তার মৌলিক গবেষণাও আছে। এ ধরণের দুরবিন এবং তাকে ঘিরে পরিপূর্ণ মানমন্দির স্থাপনের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরী করা হয়ে গেছে। এখন কেবল রিচার্ড নিক্সনের মত প্রেসিডেন্ট দরকার যিনি অ্যাকশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে নিক্সনের মত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বিশুদ্ধ মানবিক উদ্দেশ্যে।

লুনার রিকনিসন্স অর্বিটার সম্পর্কে জানতে হলে

- ইংরেজি উইকিপিডিয়া নিবন্ধ
- ফেসবুক ফ্যানপেজ

[এলআরও সম্পর্কিত সকল আপডেট এই পোস্টের মাধ্যমেই জানাবো হবে। নিচে দেখুন]

এলআরও আপডেট

No comments yet

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS