ফিনিক্সের মঙ্গল অভিযান

2009 ফেব্রুয়ারি 16
by Khan Muhammad

মঙ্গলে অবতরণ

২০০৮ সালের ২৫শে মে, রোজ সোমবার, ইউটিসি সময় ২৩:৪৬; মঙ্গল পৃষ্ঠে আলতোভাবে অবতরণ করলো ফিনিক্স ল্যান্ডার। বাংলাদেশ সময় ধরলে ২৬শে মে সকাল ৫:৪৬-এর ঘটনা এটা। ১৯৯৭ সালে মার্স পাথফাইন্ডার যখন মঙ্গলে অবতরণ করে তখনই সাধারণ্যে বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ পাথফাইন্ডার মঙ্গলের সুন্দর সুন্দর ছবি পাঠাচ্ছিল। ফিনিক্স সেই পাথফাইন্ডার থেকে অনেক অনেক সমৃদ্ধ।

ফিনিক্স পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য মঙ্গলে অণুজীবের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করা এবং সেখানে পানির ইতিহাস খতিয়ে দেখা। এজন্যই ফিনিক্সকে মঙ্গলের উত্তর মেরুর একটি মরুময় স্থানে অবতরণ করানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন এখানটায় ভূপৃষ্ঠের সামান্য নিচেই বরফ আছে।

ফিনিক্সের এই অবতরণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। প্রথমত, অবতরণ নিয়েই অনেক সংশয় ছিল। কারণ ফিনিক্স যখন মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন তার বেগ ছিল ঘণ্টায় ২১,০০০ কিলোমিটার। সেখান থেকে মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে তার বেগ ঘণ্টায় মাত্র ৮ কিলোমিটারে নামিয়ে আনতে হয়েছিল। ১০ মাসে ৬ কোটি ৮০ লক্ষ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে ফিনিক্স। তার মধ্যে এই ৭ মিনিটই ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তার উপর ফিনিক্সের অবতরণটি ছিল আলতো। ল্যান্ডারের অবতরণ দুই ধরণের হতে পারে। একটি হল এয়ার ব্যাগের মাধ্যমে যা সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয়। অন্যটি হল প্যারাশ্যুট ফুলিয়ে আলতো অবতরণ। ১৯৭৬ সালে ভাইকিং ২ এর পর এটিই মঙ্গলে প্রথম আলতো অবতরণ। আর ইতিহাসে এটি তৃতীয় আলতো অবতরণ।

এই অভিযানের আরেকটি বিশেষত্ব হল, এই প্রথমবারের মত কোন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মিশন অন্য কোন গ্রহে অবতরণ করল। ফিনিক্স অভিযানের মূল নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার” লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ল্যাবরেটরি। আর সহযোগিতায় ছিল নাসার “জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি” এবং লকহিড মার্টিন স্পেস সিস্টেম্‌স নামক মহাকাশ কোম্পানি। অভিযানের শেষ ৭ মিনিট এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানের কমকর্তারাই অধীর আগ্রহে যার যার কন্ট্রোল রুমে বসে ছিল। জেপিএল এর কন্ট্রোল রুমে ছিলেন স্বয়ং নাসা প্রশাসক মাইকেল গ্রিফিন। অবতরণের সাথে সাথে অ্যারিজোনার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ফিনিক্সকে মঙ্গলের উত্তর ভূমিতে স্বাগত জানালেন। আর মাইকেল গ্রিফিন বলে উঠলেন, “এখানে বসে এই অনন্যসাধারণ অর্জন দেখে যতটা আনন্দিত হয়েছি ততটা আনন্দিত আর কিছুতেই হতে পারতাম না।”

ফিনিক্স মঙ্গলে নামলো আর মানুষের ভিনগ্রহে উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। নাসার এই প্রশাসকই ঘোষণা দিয়েছেন, ২০৩৭ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষ থাকবে। বিশেষভাবে ২০৩৭ সাল বলার কারণ, তিনি চান ২০৫৭ সালে মহাকাশ যুগের ১০০ বছর পূর্তি উৎসব ধুমধামের সাথে মঙ্গল এবং চাঁদে একযোগে পালিত হোক। এই উৎসবের প্রস্তুতির জন্যই ২০৩৭ থেকে ২০৫৭ এই বিশটি বছর বেছে নিলেন। কিন্তু মার্স সোসাইটি চাইছে আরও আগেই মঙ্গলে যাওয়া হোক। কারণ মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর সকল প্রযুক্তি এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছার। নাসার সাথে মার্স সোসাইটির মতানৈক্য এখানেই। নাসা চায় আগে চাঁদে ফিরে গিয়ে উপনিবেশ স্থাপন করতে। চাঁদে অনুশীলন শেষ হয়ে গেলে তারপর মঙ্গলে যাওয়া যাবে। কারণ চাঁদে যেতে মাত্র ৩ দিন লাগে যেখানে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও অনেক কম। কিন্তু মঙ্গলে যেতে লাগে ৬ মাস। নভোচারীরা সে অভিযানে অনেকটাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। তরপরও মার্স সোসাইটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে তারা ১২ জন নভোচারী নির্বাচন করে ডেথ ভ্যালিতে মঙ্গলীয় অনুশীলন চালাচ্ছে। ফিনিক্সের মঙ্গল অবতরণের ক্ষণটিও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করেছে এই সোসাইটি।

যেভাবেই হোক ২০৩৭ এর মধ্যে যে মঙ্গলে মানুষ যাচ্ছে এটা প্রায় নিশ্চিত। কারণ ইতোমধ্যে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, রাশিয়া এবং চীনও মঙ্গলের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। রাশিয়া তো বানর পাঠানোর পরিকল্পনাও করে ফেলেছে। আসলেই তো। আমাদের আরও আগেই মঙ্গলে যাওয়া উচিত ছিল। আমেরিকার অ্যাপোলো অভিযানের যুগের লোকেরা কেউ কখনও ভাবতে পারেনি যে ২০০৮ সালে আমাদের মহাকাশ অভিযানের অবস্থা এতো করুণ হবে। তখনকার সময়ের সব কল্পবিজ্ঞান এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান গ্রন্থেই এর প্রমাণ মিলে। বাংলাদেশের বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক আবদুল্লাহ আল-মুতীও আশা করেছিলেন, একবিংশ শতকের প্রথম দশকেই মানুষ মঙ্গলে উপনিবেশ স্থাপন করবে।

কার্ল সেগান বলতেন, মানুষের অন্তত দুটি উপনিবেশ থাকা প্রয়োজন। কারন যেকোন দুর্ঘটনায় পৃথিবী গণ-বিলুপ্তির শিকার হতে পারে। আর এরকম উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মঙ্গলই সবচেয়ে উপযোগী। কারণ মঙ্গলের দিন ২৪ ঘণ্টার কাছাকাছি এবং সেখানে ঋতু বৈচিত্র্যও পৃথিবীর মত। এই সব কিছু মাথায় রেখে ফিনিক্স অভিযানে নেমেছে। তার আসল কাজ সেখানে মানব বসতির উপযোগী পরিবেশের সন্ধান করা। এজন্য অবতরণের সময় মঙ্গলের কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান কৃত্রিম উপগ্রহগুলো থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তাকে। মার্স রিকনিসন্স অরবিটারের “হাইরাইজ” নামক ক্যামেরার মাধ্যমে কক্ষপথ থেকেই ছবি তোলা হয়েছে, ছবি থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্যারাশ্যুট ফুলিয়ে ফিনিক্সের নিম্ন গমন। এর মাধ্যমে মূলত অবতরণ স্থানগুলো সব চেখে দেখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোথায় নামলে ভাল হবে তা নির্ণয় করা হয়েছে।

ফিনিক্সের সাথে একটা বিশেষ ডিভিডি আছে। প্ল্যানেটারি সোসাইটি কর্তৃক নির্মিত এই ডিভিডির নাম “দ্য ফিনিক্স ডিভিডি”। ভবিষ্যতে যারা মঙ্গলে যবে তাদের স্বাগত জানানোই এই ডিভিডির কাজ। একে বলা হচ্ছে মঙ্গলের প্রথম লাইব্রেরি। কারণ এতে মঙ্গল নিয়ে রচিত সকল সাহিত্যের সংকলন স্থান পেয়েছে। এইচ জি ওয়েল্‌সের “ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস” আছে, সাথে আছে সিটিজেন কেইন-খ্যাত অরসন ওয়েল্‌সের রেডিও বিবরণী। বর্তমান যুগ পর্যন্ত সবই আছে। পৃথিবীবাসী অনেকেই নিজেদের নাম ও মন্তব্য পাঠিয়েছিল নাসার কাছে। নাসা সেগুলোও ডিভিডিতে পুরে দিয়েছে। এই প্রথম আর্থলিং-দের নাম অন্য কোন গ্রহে পৌঁছুল। আর্থলিং কথাটাও এতোদিন কেবল কল্পবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হতো। নাসার ওয়েবসাইটেই মঙ্গলের সাপেক্ষে আমাদেরকে আর্থলিং বলা হয়েছে। এভাবেই আমাদের কল্পবিজ্ঞান ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। সন্দেহ নেই, মঙ্গলে বসতি স্থাপনকারী প্রথম জীবেরাও আর্থলিং হবে, কিন্তু অ্যামেরিকার মত তারাও হয়ত একদিন স্বাধীনভাবে গ্রহ পরিচালনা শুরু করবে। তখন হয়ত তাদেরকে আমরা মার্সলিং ডাকবো।

সব মিলিয়ে একটা অসাধারণ গবেষণা ও জরিপ কাজের সূচনা করতে যাচ্ছে ফিনিক্স। নামার সময় তার কোন ক্ষতিই হয়নি। বিজ্ঞানীরা অনেকটাই বিস্মিত। এখন পর্যন্ত সব ঠিকমতো চলছে। আজই খবর এসেছে, ফিনিক্স খননকাজ শুরু করার জন্য তার রোবোটিক বাহুগুলো প্রস্তুত করা শুরু করেছে। একটু পর থেকেই শুরু হবে মঙ্গল বিদারণ। মঙ্গলকে হার মানতেই হবে মানুষের কাছে। জীবনকে আর বুঝি ঠেকিয়ে রাখতে পারলো না সে।

ফিনিক্সের পেলোড

এতক্ষণ আমরা ফিনিক্স অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনেছি। এবার সেগুলো খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। যে উদ্দেশ্যে ফিনিক্সকে পাঠানো হয়েছিল তার কতটুকু সফল হয়েছে সেটাই এখন বিবেচ্য। এর সাথে ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে ফিনিক্সের প্রভাব কতটুকু থাকবে সেটাও থতিয়ে দেখা যাবে।

এতক্ষণ আমরা ফিনিক্সের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখেছি:

- মঙ্গলে অণুজীবের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করা
- সেখানে পানির ইতিহাস খতিয়ে দেখা

এই লক্ষ্যগুলো খুব একপেশে মনে হতে পারে। মঙ্গল নিয়ে গবেষণার তো আরও অনেক বিষয় আছে, শুধু এ কাজের জন্য পুরো নভোযান প্রেরণের দরকার কি? এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে মঙ্গলে ফিনিক্স ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি নভোযান কাজ করছে। এই নভোযানগুলোর মধ্যে ল্যান্ডার, অর্বিটার, রোভার, ফ্লাইবাই সবই আছে। ল্যান্ডার গ্রহের এক স্থানে অবতরণ করে এবং সেখানেই কাজ করে। অর্বিটার অবতরণ করে না, কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। রোভার গ্রহের পৃষ্ঠে চলাচল করে, যাত্রাপথেই প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নেয়। আর ফ্লাইবাই নভোযান অন্য কোন পথে আবর্তন করে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পরপর গ্রহটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। কিংবা দূরের কোন লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে গমনকারী নভোযানও গ্রহটির কাছ দিয়ে একবার উড়ে যেতে পারে।

- মঙ্গলে বর্তমানে সক্রিয় অর্বিটারগুলো হচ্ছে: ২০০১ মার্স অডিসি, মার্স এক্সপ্রেস অর্বিটার ও মার্স রিকনিসন্স অর্বিটার।
- সক্রিয় ফ্লাইবাই নভোযান হচ্ছে: রোসেটা
- সক্রিয় একমাত্র ল্যান্ডার হল: ফিনিক্স
- রোভারগুলো হচ্ছে: স্পিরিট ও অপরচুনিটি

মঙ্গলীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান, মঙ্গলের ভূবিজ্ঞানসহ যাবতীয় বিষয় নিয়ে অর্বিটারগুলো কাজ করছে। আর ভূপৃষ্ঠের অন্যান্য বিশ্লেষণের জন্য তো রোভারগুলো রয়েছেই। ল্যান্ডারগুলো সাধারণত এ ধরণের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই অভিযানে নামে। সে হিসেবে ফিনিক্সের বর্তমান অভিযানের উদ্দেশ্য প্রকৃতপক্ষে একপেশে নয়। আর কিছুদিন এটা নিয়ে কাজ করার পর সে কক্ষপথে মূল নভোযানের সাথে মিলিত হবে। এরপর নতুন কোন মিশন নিয়ে হয়ত আবার মঙ্গল পৃষ্ঠে অবতরণ করবে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। ফিনিক্সের সফলতা যাচাই করতে হলে আগে আমাদের জানা প্রয়োজন, তাকে কি ধরণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। কোন নভোযানের নির্জীব যাত্রীদের সাধারণত পেলোড বলা হয়। তাই মঙ্গল গবেষণার জন্য প্রেরিত এই যন্ত্রপাতিগুলোকেও আমরা পেলোড বলতে পারি। ফিনিক্সের পেলোডগুলো হচ্ছে:

১। রোবোটিক বাহু – ভূপৃষ্ঠের ০.৫ মিটার পর্যন্ত খনন করতে পারে। এর কাজ মাটি ও ধূলির নমুনা সংগ্রহ করা।

২। রোবোটিক বাহুর ক্যামেরা – রোবোটিক বাহুর হাতার সাথে যুক্ত। এটা দিয়ে প্রথমেই নমুনা সংগ্রহের অঞ্চলের ছবি তোলা হয়, সেখান থেকে কি ধরণের নমুনা পাওয়া যাবে তা এই ছবির মাধ্যমেই বিশ্লেষণ করা হয়।

৩। সার্ফেস স্টেরিও ইমেজার – নভোযানের মূল ক্যামেরা। পাথফাইন্ডারের সাথে যুক্ত ক্যামেরার চেয়ে এর রিজলিউশন অনেক বেশী। এর মাধ্যমে মঙ্গলের আর্কটিক অঞ্চলের উচ্চ রিজলিউশন ছবি তোলা হয়।

৪। থার্মাল অ্যান্ড ইভল্‌ভ্‌ড গ্যাস অ্যানালাইজার – সংক্ষিপ্ত নাম টেগা (TEGA)। এতে উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লীর সাথে ভর বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র যুক্ত আছে। এরকম আটটি ওভেন আছে। প্রতিটি ওভেন একটি করে নমুনা বিশ্লেষণ করতে পারে। বুঝতেই পারছেন, এর মাধ্যমে সংগৃহীত নমুনায় কি কি পদার্থ আছে তা খতিয়ে দেখা যাবে।

৫। মার্স ডিসেন্ট ইমেজার – সংক্ষিপ্ত নাম মার্ডি (MARDI)। এর মাধ্যমে অবতরণের সময় মঙ্গল পৃষ্ঠের ছবি তোলার কথা ছিল। কিন্তু কিছু তথ্য হারিয়ে যাওয়ার কারণে অবতরণের সাত মিনিটে সে কোন ছবিই তুলতে পারেনি।

৬। মাইক্রোস্কপি, ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি অ্যান্ড কন্ডাক্টিভিটি অ্যানালাইজার – সংক্ষিপ্ত নাম মেকা (MECA)। এর মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আছে:

- আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র: এর কাজ মঙ্গল থেকে সংগৃহীত নমুনায় উপস্থিত রেগোলিথের ছবি তোলা। ভূপৃষ্ঠে মৃত্তিকা স্তরের নিচেই রেগোলিথ স্তর থাকে, রেগোলিথ স্তরের নিচে থাকে অধিশিলার স্তর। তাই অধিশিলার উপরে অবস্থিত আলগা শিলাবস্তুর আচ্ছাদনকেই রেগোলিথ বলা যায়।

- পারমাণবিক বল অণুবীক্ষণ যন্ত্র: আলোক অণুবীক্ষণের কাছে প্রেরিত নমুনার সামান্য অংশ নিয়ে কাজ করতে পারে। সে আট সিলিকনের টিপ দিয়ে এই নমুনা স্ক্যান করে এবং সিলিকন টিপ থেকে নমুনার বিকর্ষণের পরিমাণ নির্ণয় করে।

- ওয়েট কেমিস্ট্রি গবেষণাগার: এখানে চারটি প্রকোষ্ঠে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে মঙ্গলের নমুনার সাথে পৃথিবীর পানির মিশ্রণ ঘটানো হয়। এর ফলে মঙ্গলের মাটিতে উপস্থিত দ্রবণীয় উপাদানগুলো পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রধানত ক্ষার ধাতুর আয়নগুলো নিয়ে গবেষণা করা হয়। এর মাধ্যমে মঙ্গল জীবন বিস্তারের জন্য কতটা সহায়ক হতে পারে তা নির্ণয় করা সম্ভব।

- স্যাম্প্‌ল হুইল ও ট্রান্সলেশন স্টেজ: ৬৯টি নমুনা ধারকের মধ্যে ৬টি এখানে অবস্থিত। এগুলোর মাধ্যমে রোবটিক বাহুর কাছ থেকে নমুনা নিয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলোর কাছে পাঠানো হয়।

৭। থার্মাল অ্যান্ড ইলেকট্রিকেল কন্ডাক্টিভিটি প্রোব – সংক্ষিপ্ত নাম টিইসিপি (TECP)। এতে পাঁচটি সন্ধানী যন্ত্র আছে যা দিয়ে নিম্নলিখিত পরিমাপগুলো করা হয়:

- মঙ্গলীয় মাটির (রেগোলিথ) তাপমাত্রা
- তাপীয় পরিবাহিতা
- তড়িৎ পরিবাহিতা
- পরাবৈদ্যুতিক প্রবেশ্যতা (dielectric permittivity)
- বায়ুর দ্রুতি
- পরিবেশের তাপমাত্রা

৮। আবহাওয়বিজ্ঞান স্টেশন – নাম থেকেই এর কাজ বোঝা যাচ্ছে। এর সাথে বায়ু নির্দেশক এবং চাপ ও তাপ সেন্সর যুক্ত আছে। এগুলোর মাধ্যমে সে মঙ্গলের আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে চলে।

এবার আমরা ফিনিক্সের সফলতা আর ব্যর্থতা নিয়ে ভাবতে পারি। একটা ব্যর্থতার কথা ইতোমধ্যে বলে ফেলেছি। হ্যা, মার্ডি পরিকল্পনা মাফিক ছবি তুলতে পারেনি। এজন্যই অবতরণের যে ৭ মিনিটে ফিনিক্সের গতি ঘণ্টায় ২১,০০০ কিমি থেকে মাত্র ৮ কিমি-এ নামিয়ে আনতে হয়েছিল, সে সময় মঙ্গল পৃষ্ঠ ও নভোযানের ক্লোজ ছবি আমরা পাইনি। মার্স রিকনিসন্স অর্বিটারের হাইরাইজ ক্যামেরা দিয়েই কেবল অবতরণের ছবি তোলা গেছে। অবতরণের পর নাসা ফিনিক্স বিষয়ে যে খবরগুলো প্রকাশ করেছে সেগুলো সংক্ষেপে লিখে ফেললেই তার সফলতার সবকিছু জানা হয়ে যাবে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ফিনিক্স সফল হয়েছে। কর্মদক্ষতার দিকে অধিক নজর দেয়া এবং যোগাশ্রয়ী প্রোগ্রামিং মেনে কাজ করাই এর কারণ।

মঙ্গলনামা

ফিনিক্স মঙ্গলের মাটিতে পানি আর জীবন নিয়ে গবেষণা করছে। আমরা মানুষেরা পৃথিবীতে বসে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি, প্রয়োজনমত তাকে নিয়ন্ত্রণও করছি। মানবিক কৌতুহলের তুলনায় এ ধরণের অভিযান খুব বিস্ময়কর কিছু না। বরং বিস্মিত হই এই ভেবে, যে মানুষ ১৯৬৯ সালে চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিল সেই মানুষেরই আজ কেন এই বেহাল দশা। মহাকাশ অভিযানে আমাদের আরও অনেক এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এতোদিনে আমাদের মঙ্গলে থাকার কথা ছিল। আর্থার সি ক্লার্কও কিন্তু ভেবেছিলেন ২০০১ সালের মধ্যে মানুষ মঙ্গলে যেতে শুরু করবে। তার “২০০১: আ স্পেস অডিসি” উপন্যাস অন্তত সে কথাই বলে।

মানুষের কৌতুহলের সাথে তুলনা করার মত কিছু নেই। পৃথিবীর তাবৎ অভিযাত্রী আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দেয়। জেম্‌স কুক বা রুয়াল আমুনসেনের অভিযানকে কি মহাকাশ অভিযানের সাথে তুলনা করা যায় না? আমার তো মনে হয়, তাদের অভিযাত্রায় আত্মত্যাগটা আমাদের থেকে বেশী ছিল। কারণ তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতেন, আমরা তো পৃথিবীতে বসে কেবল যন্ত্র পাঠাচ্ছি। তারপরও কেন এতো অনীহা?

আমুনসেন দুই মেরুই জয় করেছিলেন। উড়োজাহাজে করে উত্তর মেরু দেখতে বেরিয়েছিলেন আমুনসেন। সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু এই উত্তর মেরুই পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়ায়। সঙ্গীদের খুঁজতে গিয়ে নিজেও নিখোঁজ হন। সেইসব অভিযাত্রীরা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। আর মহাকাশের প্রতি আমাদের আকর্ষণ তো সেই আদ্যিকাল থেকে। সাগরের চেয়ে পুরনো সেই আকর্ষণ। তারপরও কি পিছিয়ে থাকা মানায়? মার্স সোসাইটির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই মঙ্গলে উপনিবেশ স্থাপনের পক্ষে আমি। সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনের প্রস্তাবেও আমি আছি। যেতে না পারি, মানুষের অভিযাত্রার কাহিনী তো অন্তত শুনে যেতে পারব।

এই প্রেরণাই মঙ্গলের প্রতিটি অভিযান নিয়ে আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। এই প্রেরণাই অভিযাত্রার কথা বলতে বাধ্য করে। আমুনসেনের উত্তর মেরু অভিযান নিয়ে যেমন লেখা হয়েছে, তেমনি ফিনিক্সের উত্তর মেরু অভিযান নিয়ে লিখছি। এই কয় মাস মঙ্গলের উত্তর মেরুতে বসে সে কি কি করল তা-ই লিখব। আর আশা করবো, যেন তার পরিণতি আমুনসেনের মত না হয়।

২৭শে মে

২৭শে মে রোবটিক বাহু দিয়ে খননকাজ শুরু করার কথা ছিল। পরিকল্পনামাফিক পৃথিবী থেকে মার্স রিকনিসন্স অর্বিটারে কমান্ড পাঠানো হল। কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সময়মত তা ফিনিক্সে পৌঁছাল না। অগত্যা একদিন নিজ বুদ্ধিতে কাজ করল ফিনিক্স। তার বুদ্ধি খারাপ না। মালিকের কাছ থেকে হুকুম আসেনি দেখে সে ২৬শে মে’র কয়েকটা কমান্ড অনুযায়ী কিছু অতিরিক্ত কাজ করে রাখে। তার অতিরিক্ত কাজ কেবল ছবি তোলা। সেরকম কিছু ছবিই পরদিন অর্বিটারের মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌঁছায়।

২৮শে মে

পৃথিবী থেকে কমান্ড পেল ফিনিক্স। হুকুমমাফিক আশপাশের কিছু ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠালো সে। ছবিগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক। ফিনিক্স এমন এক স্থানে অবতরণ করেছে যেখানে বহুভুজাকৃতির গর্ত খনন করা খুব একটা কঠিন হবে না। ফিনিক্সের বর্তমান অবস্থান গ্রিন ভ্যালিতে যা উত্তর মেরুর বেশ কাছে। আরও জানা গেল এখানকার মাটি পৃথিবীর পার্মাফ্রস্টের মত। অর্থাৎ পানির ঘনীভবন তাপমাত্রার চেয়েও এখানকার মাটির তাপমাত্রা কম। এই মাটির একটু নিচেই বরফ থাকার কথা।

৩১শে মে

প্রথমবারের মত মঙ্গলের লাল মাটি স্পর্শ করল ফিনিক্সের রোবটিক বাহু। আবেগ থাকলে হয়তো আগে একটু ছুঁয়ে দেখতো। কিন্তু যন্ত্র বলে তেমনটি করেনি। একেবারে গোড়া থেকেই কাজ শুরু করে দিল। মঙ্গলের প্রথম নমুনা সংগৃহীত হল তখনই। মঙ্গলের দিনগুলোকে সল (sol) বলা হয়। ফিনিক্সের মঙ্গলে অবতরণের পঞ্চম সলে ল্যান্ডারের ঠিক নিচের মাটির ছবি তোলা হল। অবতরণের সময় তীব্র বেগে বাতাস নির্গমণের কারণে ল্যান্ডারের নিচে আলগা মাটিগুলো সরে গিয়েছিল। সে কারণেই নিচের স্তরটি ভেসে উঠেছে। অনেকে বললেন, এটাই বরফের স্তর হতে পারে।

১৯শে জুন

রোবটিক বাহুর খনন করা প্রতিটি গর্তের নাম রাখা হয়েছে। একটি গর্তের নাম “ডোডো-গোল্ডিলক্‌স”। এই গর্ত থেকে পাওয়া নমুনায় এক ধরণের উজ্জ্বল বস্তু ছিল যা মাত্র চারদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, কেবল পানি বরফের পক্ষেই এভাবে বাষ্পীভূত হওয়া সম্ভব।

২৪শে জুন

নাসার বিজ্ঞানীরা বেশ তৎপর হয়ে উঠেন। রোবটিক বাহু পরপর তিনটি নমুনা সংগ্রহ করে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষকের কাছে পাঠায়। ২৯তম সলে (২৪শে জুন) মেকা-তে অবস্থিত ওয়েট কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি নমুনা পায়। সাথে সাথেই কাজ শুরু করে।

২৬শে জুন

ওয়েট কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়। জানা যায়, মঙ্গলের মাটি সাধারণ ক্ষারীয়, পিএইচ ৮ থেকে ৯ এর মধ্যে। এতে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়ন আছে। লবণাক্ততা স্বাভাবিক। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মঙ্গলের মাটির লবণাক্ততা ও পিএইচ মৃদু তথা বিনাইন।

৩১শে জুন

মঙ্গলে পানি বরফের উপস্থিতি নিশ্চিত হল। নাসা থেকে জানানো হল, এর আগে ২০০২ সালে মার্স অডিসি যে পানি বরফের সম্ভাবনার কথা বলেছিল ফিনিক্স তা-ই প্রমাণ করল। এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব ফিনিক্সে অবস্থিত “টেগা” নামক যন্ত্রটির। টেগার মধ্যে একটা ভর বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র আছে। নমুনার তাপমাত্রা বাড়াতে বাড়াতে ০° সেলসিয়াস হওয়ার পরই যন্ত্রে পানি বাষ্পের উপস্থিতি ধরা পরে। মঙ্গলের নিম্ন চাপের কারণেই এত কম তাপমাত্রায় বাষ্পীভূত পানির অস্তিত্ব থাকে। এহেন সংবাদে আর্থলিঙেরা আরও উৎসাহী হয়ে উঠে।

৭ই জুলাই

দ্বিতীয় নমুনাটি ওয়েট কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। প্রথম নমুনার বিশ্লেষণ সফল হয়েছিল। সেই বিশ্লেষণে মঙ্গলের মাটির নিচে পানি বরফের স্তর আবিষ্কৃত হয়।

১০ই জুলাই

প্রথমবারের মত ফিনিক্সের থার্মাল ও কন্ডাক্টিভিটি প্রোব মঙ্গলের মাটি স্পর্শ করেছে। মাত্র ১.৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ কাঁটা মাটিতে ঢুকবে। এর মাধ্যমে মাটির এক স্পাইক থেকে আরেক স্পাইকে কত সহজে তাপ ও তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই মাটির উপরের স্তরে ঘনীভূত বা তরল পানির সূক্ষ্ণ স্তর আছে কি-না তা বোঝা যাবে।

১৬ই জুলাই

পানি বরফ তো ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। এখন এই পানি বরফের উপাদান বিশ্লেষণের জন্য সেরকম একটি নমুনা টেগা-তে পাঠাতে হবে। এরই রিহার্সেল হয়ে গেল। স্নো হোয়াইট গর্তের ভেতর ফুটো করে পানি বরফের স্তরে পৌঁছুল রোবটিক বাহুর রাস্প। রোবটিক বাহুর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার মাধ্যমে এই প্রাথমিক নমুনার গ্রহণযোগ্যতাও যাচাই করা হয়েছে।

১৭ই জুলাই

ফিনিক্সের সার্ফেস স্টেরিও ইমেজার মঙ্গলপৃষ্ঠের স্টেরিও তথা ত্রিমাত্রিক ছবি তুলেছে। বিজ্ঞানীরা এখন এগুলো নিয়েই গবেষণা করছেন। ইমেজারের ডান ও বাম চোখ থেকে তুলা পৃথক পৃথক ছবিগুলো সমন্বিত করার মাধ্যমেই এই ত্রিমাত্রিক ছবিগুলো তৈরী করা হয়েছে। মোট ১৪টি ছবি পৃথিবীতে পৌঁছেছে। এগুলো দেখার জন্য লাল ও নীল থ্রিডি চশমা লাগে।

২২শে জুলাই

ফিনিক্স সবচেয়ে বেশী সময়ে ধরে একটানা কাজ করল। দীর্ঘ ঘণ্টা একটানা পরীশ্রমের সমাপ্তি ঘটেছে। টেগায় কোন ধরণের নমুনা সরবরাহ করা হবে এবং সেগুলো কিভাবে আনা হবে তা নিয়েই দীর্ঘক্ষণ কাজ করেছে সে।

৩১শে জুলাই

নাসা ঘোষণা করেছে, ফিনিক্সের বর্তমান অভিযান সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত চলবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ শেষ হলে বিজ্ঞানীরা সেগুলো বিশ্লেষণ শুরু করবেন। বিজ্ঞানীদের আদেশে মঙ্গলের পৃষ্ঠে বসেই ফিনিক্স সে কাজগুলো করে যাবে।

১লা আগস্ট

এভিয়েশন উইকের প্রতিবেদনে বলা হয়, নাসা ফিনিক্সের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলে জীবনের সম্ভাবনার উপর একটি নতুন ঘোষণা দিতে যাচ্ছে বলে হোয়াইট হাউজকে জানিয়েছে। এই সংবাদকে কেন্দ্র করে মঙ্গলে প্রাণ আবিষ্কার নিয়ে নতুন করে কানাঘুষা শুরু হয়। অনেকে বলে, মঙ্গলে নাকি পারক্লোরেট পাওয়া গেছে এবং এ কারণেই সেখানে কোন জীব বেঁচে থাকতে পারবে না। নাসা এই সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাই মঙ্গলে উপনিবেশ স্থাপনের আশা এখনও জেগে আছে।

৫ই আগস্ট

মঙ্গলের মাটিতে পারক্লোরেট পাওয়া গেছে। অনেকে গুজব ছড়িয়েছে যে, পারক্লোরেট থাকলে সেখানে জীবনের বিস্তার অসম্ভব। কিন্তু নাসা বলছে, পারক্লোরেট থাকাটা জীবনের জন্য ভালও নয় আবার খারাপও নয়। কিন্তু পারক্লোরেট থাকা মানে মঙ্গলের জীবন নিয়ে আমাদের অন্যভাবে চিন্তা করতে হবে।
পারক্লোরেট একটি আয়ন। কেন্দ্রে একটি ক্লোরিন আয়ন এবং তার চারদিকে চারটি অক্সিজেন আয়ন নিয়ে এই আয়ন গঠিত। এটা জারক অর্থাৎ মুক্ত অক্সিজেন দান করতে পারে। পৃথিবীতে আতাকামার মত মরু অঞ্চলে এই আয়ন পাওয়া যায়। সাধারণ অবস্থায় তা অণুজীবের কোন ক্ষতি করে না। মাঝে মাঝে কিছু অণুজীবের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সহায়তাও করে। মঙ্গলে কি পরিমাণ পারক্লোরেট আছে তা-ই এখানে বিবেচ্য বিষয়।

১৪ই আগস্ট

ফিনিক্সের অণুবীক্ষণ যন্ত্র মঙ্গলের সর্বব্যাপী ধূলির কেবল একটি কণার সূক্ষ্ণ ছবি তুলেছে। এ ধরণের ছবি ইতিহাসে এটাই প্রথম। কলাটির ব্যাস মাত্র ১ মাইক্রোমিটার। অন্য কোন বিশ্ব থেকে তোলা মঙ্গলের সবচেয়ে সূক্ষ্ণ ছবি এটাই। উল্লেখ্য, এই ধূলিকণাই মঙ্গলকে তার অনন্য লাল রঙ প্রদান করে। এবার এই লাল নিয়ে গবেষণা চলবে।

২১শে আগস্ট

মাঝামাঝি গভীরতা থেকে একটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তা ফিনিক্সের গবেষণাগারে পাঠানোও হয়েছে। “বার্ন অ্যালাইভ ৩” নামক গর্ত থেকে সংগৃহীত এই নমুনার নাম “বার্নিং কোল্‌স”। মঙ্গল পৃষ্ঠের তিন সেন্টিমিটার নিচ এবং এরও নিচে অবস্থিত পানি বরফ স্তরের এক সেন্টিমিটার উপর থেকে এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। টেগার ৭ নম্বর প্রকোষ্ঠে রাখা নমুনাকে তিন পর্যায়ে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। প্রথমে নিম্ন তাপমাত্রায় (৩৫° সে), পরে মধ্যম তাপমাত্রায় (১২৫° সে) এবং সবশেষে উচ্চ তাপমাত্রায় (১০০০° সে)।
নিম্ন তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে পানি বরফ আছে কি-না দেখা হবে, মধ্যম তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করার মাধ্যমে নমুনাটিকে সম্পূর্ণ শুষ্ক করে ফেলা হবে। আর উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করার পর প্রাপ্ত গ্যাসকে ভর বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রে প্রেরণের মাধ্যমে নমুনার উপাদান বিশ্লেষণ করা হবে।

২৫শে আগস্ট

অবতরণের পর ৯০ সল তথা মঙ্গলের ৯০টি দিন পেরিয়ে গেছে। নমুনা সংগ্রহের কাজ এখনও চলছে। বিজ্ঞানীদের মূল উদ্দেশ্য মঙ্গলের উত্তর মেরু অঞ্চল বসবাসযোগ্য হতে পারে কি-না তা খতিয়ে দেখা। ইতোমধ্যে মাটিতে পানি বরফ পাওয়া গেছে। জানা গেছে মঙ্গলের মাটি ক্ষারীয়, এতে ক্ষার ধাতুর আয়নও পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে পারক্লোরেট। আবহাওয়াবিজ্ঞান স্টেশন তার কাজে সফল হয়েছে। পানি বরফের মেঘের সন্ধান পাওয়া গেছে, তাপমাত্রা নিরীক্ষণের মাধ্যমে ঋতু পরিবর্তনের উপর নজর রাখা হয়েছে।
মেকাতে রাখা নমুনা বাষ্পীভূত করার পর সে গ্যাস ভর বর্ণালীবীক্ষন যন্ত্রে প্রেরণের সময় একটু সমস্যা হচ্ছে। গ্যাসের চলাচলের পথে কিছু একটা ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একটু বিস্মিত। তবে অচিরেই সমস্যার সমাধান হবে।

১লা সেপ্টেম্বর

মঙ্গলে এ পর্যন্ত খননকৃত সবচেয়ে গভীর গর্তের নাম “স্টোন স্যুপ”। এই গর্ত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নমুনা মাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে কোন পানি বরফের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সাথে ধারাবাহিকভাবে তোলা মঙ্গলের বাতাসের ১০টি ছবি সংযোজনের মাধ্যমে একটি মুভি তৈরী করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে আকাশে মেঘের চলাচল। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই মেঘের মধ্যে জলীয় বরফ আছে।

৪ঠা সেপ্টেম্বর

ফিনিক্সের পরিবাহিতা প্রোবটা কাঁটার মত। এই প্রোব দিয়ে ল্যান্ডারের আশেপাশের আর্দ্রতা কম-বেশী হতে দেখা যায়। কিন্তু মাটিতে গেঁথে রাখা প্রোবের হিসাবে দেখা যায়, মঙ্গলের মাটি সম্পূর্ণ শুষ্ক। নাসা এমিস রিসার্চ সেন্টারের গবেষক অ্যারন জেন্ট এর ব্যাখ্যা দেন এভাবে: যে বাতাসে জলীয় বাষ্প আছে সে বাতাসের সংস্পর্শে থাকা সকল তলের সাথেই কিছু চলমান পানির অণু সেঁটে থাকে। এমনকি ০° সেলসিয়াসের চেয়ে কম তাপমাত্রায়ও এই অণুগুলো থাকতে পারে।
পৃথিবীতে পার্মাফ্রস্ট বিশিষ্ট অঞ্চলে এই সেঁটে থাকা পানির অণুগুলো একটি স্তর সৃষ্টি করে যা জীবন বিস্তারের জন্যও সহায়ক হতে পারে। মঙ্গলেও এ ধরণের স্তর আছে কি-না তা পরীক্ষা করা দেখা শুরু হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়ে বাতাসে যথেষ্ট আর্দ্রতা থাকা সত্ত্বেও মাটির উপর কোনরকম আর্দ্র স্তরের সাক্ষাৎ মিলছে না। গবেষণা চলছেই।

৮ই সেপ্টেম্বর

ফিনিক্সের ক্যামেরায় ধূলি দানব ধরা পড়ে। ইংরেজিতে এদের নাম ডাস্ট ডেভিল। এগুলো প্রায় ২ মিটার থেকে ৫ মিটার ব্যাসের ঘূর্ণিবায়ু। সেকেন্ডে ৫ মিটার বেগে চলাচল করে। পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা অনেক দিন থেকেই ধূলি দানবের আশায় বসেছিল। এই সংবাদ পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় পরদিন। অবশ্য এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ফিনিক্সের কারিগরি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন স্পেস সিস্টেম্‌স বলেছে, ধূলি দানবের কথা মাথায় রেখেই ফিনিক্সকে তৈরী করা হয়েছে।
ধূলি দানব তৈরী হওয়ার কারণ দিন ও রাতের তাপমাত্রার বিশাল পার্থক্য। ফিনিক্স যেখানে আছে সেখানে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা “- ৩০°” সেলসিয়াস আর রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা “- ৯০°” সেলসিয়াস।

৯ই সেপ্টেম্বর

রোবটিক বাহুর খনন করা একটা গর্তের নাম “স্নো হোয়াইট”। এই গর্ত থেকে সংগৃহীত নমুনা ওয়েট কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির চারটি প্রকোষ্ঠের শেষটিতে পাঠানো হয়েছে। জুলাই মাসে এই গর্ত থেকে পাওয়া নমুনাতেই টেগা পানি বরফ সনাক্ত করেছিল।
টেগাতে মোট আটটি ওভেন আছে যার মধ্যে চারটিতে নমুনা পুরে দেয়া হয়েছে। নাসার বিজ্ঞানীরা ভাবছেন বাকি চারটি ওভেনে একই সাথে নমুনা দিয়ে দেবেন। আগে একটি নমুনা বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার পরই কেবল অন্য ওভেনে নমুনা দেয়া হতো। এটা করা হচ্ছে খনন করার মত শক্তি থাকতে থাকতেই নমুনা সংগ্রহের কাজ শেষ করে ফেলার জন্য। সূর্য ইদানিং সবসময় দিগন্তে থাকে না। এ কারণেই মে মাসের তুলনায় ফিনিক্সে শক্তি উৎপাদনের মাত্রা কমে গেছে।

২২শে সেপ্টেম্বর

ফিনিক্স অভিযানে নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানীদেরকে “ডাইনামিক ডুয়ো অ্যাওয়ার্ড” প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়। নাসার ফিনিক্স টিম এবং অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সোসাইটির কয়েকজনকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। এরা হলেন: পিটার স্মিথ (প্রধান অনুসন্ধানকারী), মাইকেল ড্রেইক (লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সোসাইটির পরিচালক), আলফ্রেড ম্যাকইউয়েন (হাইরাইজের প্রধান অনুসন্ধানকারী), প্যাট ওইডা (সিনিয়র প্রকৌশলী) এবং রিগেল ওইডা-ও’ব্রায়েন (উড্ডয়ন প্রকৌশলী)।

২৯শে সেপ্টেম্বর

ফিনিক্স মঙ্গলের মেঘ থেকে পতিত তুষার সনাক্ত করেছে। এছাড়া মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অতীতে মঙ্গলের খনিজ পদার্থের সাথে তরল পানির মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল, ঠিক যেমন বর্তমানে পৃথিবীতে ঘটছে। নভোযানে স্থাপিত বিশেষ লেজার যন্ত্রের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের ৪ কিলোমিটার উপরে তুষার আছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করার আগেই এগুলো বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

৮ই অক্টোবর

মঙ্গলের উত্তরাঞ্চলে শরৎকাল আসছে। ফিনিক্স তাই মাটি খোঁড়া ও সেগুলো গবেষণাগারে সরবরাহ করার কাজে খুব ব্যস্ত। গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সে “হেডলেস” নামে পরিচিত একটি ১৬ ইঞ্চি পাথর সরিয়ে ফেলেছে। পাথরটির ছবি তোলার পর এতদিন এর নিচে চাপা পড়ে থাকা মাটির নমুনা সংগ্রহ করেছে। মেকাতে এখন এই নমুনা নিয়েই কাজ চলছে। পাথরের নিচ থেকে নমুনা নেয়ার বিশেষ কারণ আছে: পৃথিবীর আর্কটিক অঞ্চলের পানি বাষ্পীভূত হওয়ার পর প্রচুর লবণ ফেলে যায়। এই লবণ পাথরের আশপাশে বা নিচে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা তাই ধারণা করছেন, হেডলেসের নিচে থাকা এই মাটির নমুনাতেও প্রচুর লবণ থাকবে।

১৪ই অক্টোবর

১১-১২ই অক্টোবর (১৩৫৬-১৩৬ সল) নভোযানের পাশ দিয়ে একটি ভারী ঝড় বয়ে গেছে। অবশ্য ৩৭,০০০ বর্গকিলোমিটারের এই ঝড় নভোযানের কাছে আসার আগেই বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। তাই ফিনিক্সের কোন ক্ষতি হয়নি। বিজ্ঞানীরা কিন্তু খানিকটা ক্ষতি ধরে রেখেছিলেন। কোন ক্ষতি না হওয়ায় কাজ করতে আরও সুবিধা হচ্ছে। ঝড়ের সুবাদে মঙ্গলের আবহাওয়া নিয়ে আরও গবেষণা করা গেছে। এখনও মাটির নমুনা সংগ্রহ ও পরিবেশ থেকে বিভিন্ন উপাত্ত নেয়া অব্যাহত আছে। কিন্তু দিন দিন বায়ুমণ্ডল অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে। শীত আসতে আর বেশী দেরি নেই, শীতকাল মানেই ফিনিক্সের মৃত্যু। কারণ তখন যথেষ্ট সূর্যের আলো ফিনিক্সের সৌর প্যানেলে আসতে পারবে না এবং স্বভাবতই সে কোন শক্তি উৎপাদন করতে পারবে না।
এছাড়া ১৩ই অক্টোবর ফিনিক্সের বাহু টেগা-র ষষ্ঠ ওভেনেও নমুনা সরবরাহের কাজ শেষ করেছে। এগুলো সবই মঙ্গলীয় মাটির নমুনা। এই সরবরাহকে বোনাস বলা যেতে পারে। কারণ মিশনের লক্ষ্য ছিল টেগার আটটি ওভেনের কমপক্ষে তিনটিতে নমুনা সংগ্রহ করা। এরই মধ্যে ছয়টিতে নমুনা ভরে ফেলা সম্ভব হয়েছে।

১৫ই অক্টোবর

নিউ ইয়র্ক সিটির “পপুলার মেকানিক্স” সাময়িকী ফিনিক্স গবেষক দলকে পুরস্কৃত করেছে। ৪ বছর যাবৎ এ পুরস্কারটি দেয়া হচ্ছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে বিশেষ অবদানের জন্য এটা প্রদান করা হয়। এবার ফিনিক্স গবেষক দলের পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন প্রধান অনুসন্ধানকারী পিটার স্মিথ।

১৭ই অক্টোবর

টেগায় বিশ্লেষণের কাজ চলছে। এই গবেষণাগারে মাটির নমুনাকে সর্বোচ্চ ১,৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এর ফলে যে গ্যাস তৈরী হয় গবেষণাগারের “নাক” হিসেবে পরিচিত ভর বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রটি তা বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে, এর মধ্যে কি কি আছে। এভাবে আগামী কয়েক মাস ধরে গবেষণা চলবে। এমনকি সূর্যের আলোর অভাবে ফিনিক্সের মেকানিক্যাল কাজ সব বন্ধ হয়ে গেলেও বিশ্লেষণের কাজ চলতে থাকবে। গ্রীষ্মকাল প্রায় শেষ হতে চলেছে, আর সেই সাথে ফিনিক্সের বিদায়ক্ষণটি ঘনিয়ে আসছে।

২১শে অক্টোবর

নমুনা সংগ্রহের কাজ শেষ। ফিনিক্সকে আর বাহু বের করে কষ্ট করতে হবে না। এবার সংগৃহীত নমুনার বিশ্লেষণ শুরু হওয়ার পালা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ, গ্রীষ্মের শেষ দিকেই শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ যে হারে নেমে এসেছে, তাতে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শরতের শেষ দিকে বোধহয় শক্তি উৎপাদনের মত যথেষ্ট সূর্যালোক পাওয়া যাবে না। অবশ্য নমুনা সংগ্রহের কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরীর কাজ থেমে নেই। রোবটিক বাহুর মাধ্যমে “আপার কাপবোর্ড” ও “স্টোন স্যুপ” এলাকায় খনন এবং ছবি তোলার কজ চলছে। এর মাধ্যমেই ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরী হবে। জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির ডায়ানা ব্লেনি বললেন, “আমরা মঙ্গলের বরফ স্তরের গভীরতা, বিস্তার ও উৎপত্তি বোঝার চেষ্টা করছি। জলবায়ু ও ভূতত্ত্ব এক্ষেত্রে কতখানি অবদান রাখতে পারে সেটাও বিবেচ্য বিষয়।”

২৩শে অক্টোবর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “ন্যাশনাল স্পেস ক্লাব” নাসা ও ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার ফিনিক্স অভিযানকে ২০০৮ সালের “অ্যাস্ট্রোনটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাওয়ার্ড” প্রদান করেছে। জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির ব্যারি গোল্ডস্টিন গবেষক দলের পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন।

২৮শে অক্টোবর

ফিনিক্স অভিযান সময় ও সম্পদের সদ্ব্যবহার করেছে। সেই সম্পদ এখনও আছে, কিন্তু হাতে সময় নেই। স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার জন্য নাসার বিজ্ঞানীরা ফিনিক্সের কিছু যন্ত্রপাতি ইচ্ছে করে বিকল করে দিচ্ছেন। আজ থেকেই সেই বিকলায়ন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। অভিযান পাঠানো হয়েছিল ৯০ দিনের পরিকল্পনা করে। সেখানে ফিনিক্স পঞ্চম মাসেও সুন্দর কাজ করছে। কিন্তু গ্রীষ্ম শেষ, শরৎ চলে এসেছে। দিনের দৈর্ঘ্য কমে গেছে, সেই ছোট্ট দিনেরও অধিকাংশ সময় সূর্যের আলো অভিযানের স্থানটিতে পৌঁছায় না। স্বল্প তাপমাত্রায় টিকে থাকার জন্য ফিনিক্সের হিটারগুলোকে বেশী তাপ উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু তা করতে গেলে দ্রুত সব শক্তি শেষ হয়ে যাবে। তাই কয়েকটি হিটার বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। মেকানিক্যাল কাজগুলো করার আর দরকার নেই, এবার বিশ্লেষণ ঠিকমতো হলেই হয়। তাই হিটার বন্ধ করে ফিনিক্সের আয়ুষ্কাল একটু বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে।

২৯শে অক্টোবর

খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফিনিক্সকে “সেইফ মোড” এ চলে যেতে হয়েছে। দুটি ব্যাটারির একটি অকেজো হয়ে যাওয়ার কারণেই এমনটি করতে হয়েছে। এই মোডে থাকার সময় নভোযান সব ঝুকিপূর্ণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে পৃথিবী থেকে নতুন কমান্ডের জন্য অপেক্ষা করে। সেইফ মোডের খবর শোনার সাথে সাথেই জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি ও লকহিড মার্টিন প্রয়োজনীয় কমান্ড দিয়ে ব্যাটারি রিচার্জিং এর কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে তেমন কোন শক্তির অপচয় হয়েছে বলে মনে হয় না। আবহাওয়ার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা – ৯৬ ডিগ্রি সে. আর দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা – ৪৫ ডিগ্রি সে. এ পৌঁছেছে। নিম্ন তাপমাত্রা ও বরফ মেঘের আক্রমণে শক্তি উৎপাদন একেবারে কমে গেছে। এজন্যই হিটার চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে শক্তির ব্যবহার আরও বেড়ে গেছে।

৩০শে অক্টোবর

নাসার বিজ্ঞানীরা “মার্স অডিসি অর্বিটার” এর সাথে যোগাযোগ করেছেন। এই অর্বিটারের মাধ্যমে ফিনিক্সের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আরও ভাল করে জানা যাবে। এদিকে অর্বিটার ফিনিক্সে সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, শক্তি স্বল্পতার কারণে ফিনিক্স হয়ত দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা করে সক্রিয় থাকা শুরু করেছে। এই দুই ঘণ্টার মধ্যে আমরা অর্বিটারের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করতে না পারলে লাভ নেই। কিছুক্ষণের জন্যও যোগাযোগ করতে পারলে ফিনিক্সের বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট কাজগুলো আবার চালু করা যেত।

২রা নভেম্বর

অবশেষে অর্বিটারের মাধ্যমে ফিনিক্সের সাথে যোগাযোগ করা গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণাই সঠিক। ফিনিক্স দুপুড়ের পর বন্ধ হয়ে যায়। আবার সকালে সূর্যালোকের সাক্ষাৎ পেলে জেগে উঠে। দ্রুত তার আয়ু শেষ হয়ে আসছে। অভিযানের শেষ দিকে এমনটিই হবে বলে সবাই আশা করেছিলেন। কিন্তু ধূলিঝড়ের কারণে সেই শেষটা একটু আগে চলে এসেছে। এখন বিজ্ঞানীরা শেষ সময়ের বিশ্লেষণগুলো করে নিচ্ছেন। যেকোন দিনই হতে পারে ফিনিক্সের শেষ দিন।

১০ই নভেম্বর

পাঁচ মাসেরও বেশী সময় ধরে মঙ্গলে দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনার পর অবশেষে ফিনিক্স অকেজো হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ তার সাথে আমাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ২রা নভেম্বরের পর ফিনিক্স থেকে বিজ্ঞানীরা আর কোন সংকেত পাননি। তবে সে সম্পূর্ণ সফল। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল তিন মাস ধরে খনন, নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ করা। সেটা পাঁচ মাসে গিয়ে দাড়িয়েছে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহও সবাই ফিনিক্সের কাছ থেকে সংকেত পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবেন। কিন্তু সাধারণ হিসেবমতে আর কোন সংকেত আসার কথা না।

১লা ডিসেম্বর

প্রায় এক মাস ধরে ফিনিক্সের কাছ থেকে সংকেত পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আর কোন সম্ভাবনা নেই বুঝে সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অডিসি অর্বিটার আর কোন চেষ্টা করবে না। তাহলে ফিনিক্স থেকে পাওয়া সর্বশেষ সংকেত হল সেই ২রা নভেম্বরের সংকেতটি। গ্রহসংযোগ শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই যোগাযোগের চেষ্টা বন্ধ করে দেয়ার কথা হচ্ছিল। পৃথিবী এবং অন্য একটি গ্রহের মাঝে সূর্য এসে পড়লেই তাকে গ্রহসংযোগ বলে। বর্তমানে সূর্য, মঙ্গল ও পৃথিবী সংযোগকারী রেখার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত থাকবে।
তবে ফিনিক্সের অভিযান সর্বাংশে সফল। তিন মাসের জায়গায় পাঁচ মাস একটানা কাজ করেছে। মোট ১৫২ সল (মঙ্গলের দিন) ফিনিক্স মঙ্গলপৃষ্ঠে ছিল। এর মধ্যে ১৪৯ দিনই সে সবগুলো কাজ সুন্দরভাবে করেছে। তার উপর আমরা বেশ কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য পেয়েছি। নাসার মার্স এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রামের পরিচালক ডুগ ম্যাককুইশ্চন তো বলেই দিয়েছেন, “ফিনিক্স থেকে পাওয়া তথ্যের কারণেই আজ আমরা বলতে পারি, মঙ্গল একসময় বাসযোগ্য ছিল।”

ফিনিক্স স্মরণে

ফিনিক্সের এই অভিযান আমাদের জ্ঞান ও প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্স সোসাইটি যতই মঙ্গল-মঙ্গল করুক নাসা এক্ষেত্রে চন্দ্রাভিযানের মত সাহসী হতে পারছে না। ঝুঁকি নিয়ে মঙ্গলে যেতে চাচ্ছে না। ফিনিক্সের অভিযান তাই মার্স সোসাইটি সহ সকল মহাজাগতিক উপনিবেশপ্রেমীর জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে। আর বিজ্ঞানীদের জন্য এনেছে গবেষণার এক নতুন ক্ষেত্রে। ফিনিক্স থেকে পাওয়া সব তথ্যই কিন্তু এখন নাসা এবং ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার হাতে। এগুলো নিয়ে পরবর্তী কয়েক মাসও নিরন্তর গবেষণা চলবে। এরই মধ্যে “অ্যামেরিকান জিউফিজিক্যাল ইউনিয়ন” গবেষণার সর্বশেষ খবর জানিয়েছে। এ সময় প্রধান অনুসন্ধানকারী পিটার স্মিথ বলেছেন, “মঙ্গলের মেঘে আছে তুষার, ভূপৃষ্ঠে হিম, মাত্র কয়েক ইঞ্চি নিচে বরফ, আর হিম এবং বরফের মাঝে শুষ্ক মাটি।” এই শুনে আর কোন সন্দেহই থাকে না যে, পৃথিবীর ভূতত্ত্বকে ছাপিয়ে এখন আরেকটি ভূতত্ত্বের জন্ম হচ্ছে, যার নাম মঙ্গলীয় ভূতত্ত্ব। দুই ভূতত্ত্বের মূলনীতি এক, কিন্তু ফলাফলে অনেক পার্থক্য। ভবিষ্যতে মানুষের কাজ হবে এই পার্থক্য কমিয়ে আনা।

মঙ্গলের মাটিকে এখন আর ততটা রহস্যময় মনে হচ্ছে না। অনেক আগে আমরা মঙ্গল নিয়ে কল্পবিজ্ঞান রচনা করতাম। অনেকে মঙ্গলবাসীর কল্পনা করতেন। মঙ্গলের রূপ দেখে যারপরনাই হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু সেই পাথফাইন্ডার থেকে শুরু করে আজকের ফিনিক্স পর্যন্ত, প্রতিটি অভিযানই জনমনে ছাপ ফেলতে পেরেছে। পাথফাইন্ডারের জনপ্রিয়তা অবশ্যই সবচেয়ে বেশী ছিল, ফার্স্ট অফ আ কাইন্ড বলে কথা। এখন আমরা সবাই আশা করতে পারি, ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান আরও অনেক সমৃদ্ধ হবে, তাতে মঙ্গলকে বাসযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনাও থাকবে।

আমি সেদিনের কথা ভাবছি, যেদিন মঙ্গলে একটি বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির স্থাপন করা হবে। সেই মানমন্দিরের মাধ্যমে একযোগে পৃথিবী, চাঁদ ও মঙ্গল থেকে বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধান পরিচালিত হবে। এটা হতেই হবে। কারণ বিশাল বিরান এই মহাবিশ্বে বড্ড একা একা লাগছে। নিঃসঙ্গতাকে ছাপিয়ে উঠছে যুক্তি। বারবার মনে হচ্ছে, বহির্জাগতিক প্রাণ না থেকে পারেই না। যদি আদৌ না থাকে, তাহলে তাকে বলতে হবে স্থানের ভয়ানক অপব্যবহার।

One Response leave one →
  1. 2009 ফেব্রুয়ারি 16

    এটাই ফিনিক্স অভিযান নিয়ে লেখা আমার চূড়ান্ত লেখা। এটাই মহাকাশ বার্তায় প্রকাশিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এর আগে “ফিনিক্সের মঙ্গল অভিযান” এবং “ফিনিক্সের মঙ্গল অভিযান কেমন চলছে” নামে দুটি ব্লগ লিখেছিলাম। সেগুলো আংশিক। এটা পরিপূর্ণ। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ফিনিক্স অভিযান কাভার করা হয়েছে এখানে।

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS