ডারউইন দিবসের প্রস্তুতি

2009 ফেব্রুয়ারি 3
by Khan Muhammad

১২ই ফেব্রুয়ারি এসে যাচ্ছে। এবারের ১২ই ফেব্রুয়ারিকে একটু অন্যভাবে পালন করা হচ্ছে। এখানে অন্যভাবে বলতে কিন্তু উৎকর্ষ বুঝাচ্ছি। ডারউইন ও তার বিবর্তনবাদ নিয়ে এবার যত প্রচারণা হচ্ছে এবং হবে অতীতে কখনই এমনটি হয়নি। কারণ আমাদের সবারই জানা। এবারের ১২ই ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী এবং তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ “অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস” এর ১৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। এবারের ডারউইন দিবস তাই রীতিমত আরাধ্যের বিষয়। তবে ডারউইনবাদীরা অবশ্যই ডারউইন বা বিবর্তনবাদকে আরাধনা করেন না। আরাধনা করলে তো আর বিজ্ঞানী থাকা যায় না। যে কোন বিষয়ে সংশয় পোষণ এবং অপেক্ষাকৃত ভাল তত্ত্ব দিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপিত করা মানেই তো বিজ্ঞান।

বি�িন্ন বয়সে চার্লস ডারউইন

এবারের ডারউইন দিবসের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় এই আরাধনা বিষয়ে মানুষের ভুল ধারণার অপনোদন করা। কট্টর ধার্মিকেরা অনেক সময়ই এই বলে খোটা দেয় যে, “ওরা ডারউইনের পূজা করে আর আমরা ঈশ্বরের পূজা করি। কোনটা ভাল তোমরাই বল?” এই অমূলক কথাগুলোর জবাবও এবার দেয়া হচ্ছে। বিজ্ঞান লেখক বন্য আহমেদ তার ডারউইন দিবস প্রবন্ধের বিষয় হিসেবে এই আরাধনা বিষয়ক জটিলতাকেই বেছে নিয়েছেন। তার প্রবন্ধের মাধ্যমেই হয়ত অনেকে বুঝতে পারবে, কট্টর ধর্মবাদী বা উগ্রপন্থীদের তুলনায় বিজ্ঞানীরাই ডারউইনের তত্ত্বের সমালোচনা বেশী করেছে। তবে এই দুই সমালোচনায় পার্থক্য আছে। ধর্মবাদীদের সমালোচনা যুক্তিহীন এবং অবৈজ্ঞানিক যাকে সহজেই ধ্বংসাত্মক বলে আখ্যায়িত করা যায়। ব্যাপারটা এভাবে ব্যাখ্যা করি:

ডারউইন তত্ত্ব তখনই ভুল বলে প্রমাণিত হবে যখন জীবের সৃষ্টি নিয়ে এর চেয়ে ভাল কোন তত্ত্ব এসে যাবে। সেই তত্ত্বকে অবশ্যই বিজ্ঞানের সূত্র মেনে প্রমাণিত হতে হবে। তারপরই আমরা অন্যথা ভাবতে পারি। উগ্রবাদীরা সেটা করেনি। তারা চোখ বন্ধ করে গালাগাল করে গেছে, আর রাস্তা থেকে যতসব বৈজ্ঞানিক ডিগ্রিওয়ালা অপবিজ্ঞানীদের ধরে এনে মধুর বুলি বের করেছে। তাদের সেই মধুর বুলি নিরক্ষর ও প্রথাগতভাবে শিক্ষিত মানুষদের মাঝে বিতরণ করেছে। মূর্খ মানুষের অনেকেই তাকে সত্য বলে ধরে নিয়েছে।

আর বিজ্ঞানীরা কি করেছেন। তারা গত ১৫০ বছর ধরেই ডারউইন তত্ত্ব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে আসছেন। এর ফলে ডারউইন তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে আজ থেকে ৫০ বছর আগেই ডারউইন তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে কোন দ্বিধা ছিল না। তবে হ্যাঁ, এর প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ আছে। প্রাকৃতিক নির্বাচনই যে একমাত্র প্রক্রিয়াই তা আজ অনেকেই মেনে নিয়েছেন। অতি সূক্ষ্ণ জীবের মধ্যে এই প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করে সেটাই আজকের বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এমনকি আধুনিক জীববিজ্ঞানের সবগুলো শাখাই বিবর্তনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সবকিছুকেই বিবর্তনের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে। বংশগতিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে প্রত্নতত্ত্ব পর্যন্ত সবকিছুই বিবর্তনের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। এরা আবার বিবর্তনকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, বিজ্ঞানী মলে এর গ্রহণযোগ্যতা যত বেশী সর্বসাধারণের মাঝে এর গ্রহণযোগ্যতা ততটাই কম। এর প্রধান কারণ নিঃসন্দেহে ধর্ম নামক কুসংস্কারটি। এই কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা খুব কষ্টের কাজ। অনেক পড়াশোনা করেও মানুষ এ কাজটি করতে পারে না। আর সে কারণেই বিবর্তনকেও মেনে নিতে পারে না। ধর্ম কোন প্রমাণ বা যুক্তির ধার ধারে না। বহু বছর আগে কোন এক ধূর্ত পয়গম্বর যা বলে গিয়েছিলেন তাকেই ধ্রুব সত্য ধরে নেয়ার কারণে তাদের অন্তরে কিছু ঢোকে না। তারা বলে, নাস্তিক বা ধর্মহীনদের অন্তর নাকি তালাবদ্ধ। অথচ তাদের অন্তরই তালাবদ্ধ। ঘরের সবগুলো দরোজা বন্ধ করে কেবল অন্ধত্বের দরোজাটা তারা খুলে রেখেছে। অন্য কোন দরোজা দিয়ে আসা অতিথিদেরকে তারা পাত্তাও দেয় না। তাদের কোন কথাই তারা শোনে না।

এর একমাত্র সমাধান বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ। বিজ্ঞানের সাধারণ বিষয়গুলো যখন সবার কাছে খোলাসা করে বলা হবে তখনই তাদের সে ঘরের দরোজা একটি একটি করে খুলে যেতে থাকবে। ডারউইন দিবস এই জনপ্রিয়করণে অনেক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। শুধু আমার না, বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি মাত্রেরই সে বিশ্বাস আছে।

ডারউইন দিবস উপলক্ষ্য বাংলাদেশেও বেশ কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান এবং ওয়ার্কশপ করছে। এছাড়া বিজ্ঞান লেখক এ পেশাদার বক্তা আসিফের উদ্যোগে অনুষ্ঠান হচ্ছে। ডিসকাশন প্রজেক্টের ব্যানারে ডঃ অজয় রায় ড়্যালি করছেন। সাথে সেমিনারও থাকছে। আশাকরি এই অনুষ্ঠান গুলো সুষ্ঠুভাবে শেষ হবে। বিজ্ঞানপুরীতে ডারউইন দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ পাতা খোলা হবে। সেটা মূলত সংকলন জাতীয় হবে। মুক্ত-মনা এমনিতেই একটি সংকলন করছে। তাদের সংকলনের লিংক এখানে দেয়া থাকবে। মুক্ত-মনার গত বছরের ডারউইন দিবস পাতাটিও চমৎকার ছিল। এবারেরটাও নিঃসন্দেহে চমৎকার হবে।

বিশ্বব্যাপী ডারউইন দিবস উৎযাপন উপলক্ষ্যে একটি ওয়েবসাইট করা হয়েছে। এখানে লিংকটি দিচ্ছি:
- http://www.darwinday.org/home/index.html

One Response leave one →
  1. 2009 ফেব্রুয়ারি 3

    মুক্ত-মনার ডারউইন দিবস পাতায় আমি লেখা পাঠাচ্ছি। একটি লেখা পাঠিয়ে দিয়েছি। সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান থেকে অনুবাদ করা। সচলায়তনে প্রকাশ করেছি। সেই লিংকটিই দিচ্ছি:

    http://www.sachalayatan.com/shikkhanobish/21305

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS