আইইউটি’র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং – ২
বিটিসিএল এ প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানপুরীতে একটা ব্লগ লিখে ফেলেছিলাম। দ্বিতীয় দিনের অভিজ্ঞতা প্রথম দিনের চেয়ে ভালো ছিলো। কারণ টেকনিকেল জিনিসের পাশাপাশি ব্যবসায়র হাল হকিকতও কিছু জেনেছিলাম। এ নিয়ে সচলায়তনে লিখলাম। কিছু জিনিসে গোলমাল ছিল, সেগুলোও পরিষ্কার হয়ে গেল। তৃতীয় দিন তুলনামূলক খারাপ কেটেছে। তবে চতুর্থ দিন অর্থাৎ আজকের দিনটা ছিল সবচেয়ে ভালো। কোন দিন কি দেখলাম সেটাই প্রথমে বলে ফেলি:
১ম – ভূমিকা, অ্যালকাটেলের লোকাল এক্সচেঞ্জ (শেরে বাংলা নগর)
২য় – অ্যালকাটেলের লোকাল ও ট্যানডেম এক্সচেঞ্জ (শেরে বাংলা নগর)
৩য় – এরিকসনের ট্যানডেম এক্সচেঞ্জ (রমনা)
৪র্থ – এরিকসনের ট্রাঙ্ক অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ বা ট্যাক্স (রমনা)
৫ম – ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঙ্ক এক্সচেঞ্জ বা আইটিএক্স (মহাখালী)
আজকে তৃতীয় ও চতুর্থ দিনের একটা মজার ঘটনা নিয়েই লিখছি। মজাটাও অবশ্য টেকনিকেল। টেকনিকেল বিষয়ে নজর না দিলে ধরা বেশ মুশকিল হয়ে যাবে।
তৃতীয় দিন রমনায় গেলাম। ইনস্ট্রাক্টরকে খুব একটা সুবিধার মনে হলো না। নিজে খুব বেশী জানেন তেমনও না। কিন্তু আমাদেরকে বোঝাতে চাইছেন যে তিনি অনেক কিছু জানেন। আর যে বিষয়টা সবচেয়ে খারাপ লেগেছে তা হলো ঘাড়ে একটা বিশাল অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দেয়া। উনি বক্তৃতা করেছেন ট্যানডেম এক্সচেঞ্জের উপর। এটা কাকে বলে কিভাবে কাজ করে এবং তার এরিকসন এক্সচেঞ্জে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এইসব। শেষে গিয়ে “এসপিসি সিস্টেম” (Stored Program Control exchange) এর উপর একটা বিশাল অ্যাসাইনমেন্ট করতে বললেন। এসপিসি সম্বন্ধে আমরাও আগে পড়িনি। উনি একটা ছবি দেখিয়ে কিসব কিসব বললেন। তার পরই অ্যসাইনমেন্টের কথা। এজন্য প্রথমেই মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো।
এমন অবস্থায় এক্সচেঞ্জের ভেতর ঢুকলাম। হাতে-কলমে কিছু জিনিসপত্র দেখালেন। ট্যানডেমের কোন লাইন কিভাবে কানেক্টেড থাকে, কার্ডগুলো কিভাবে কাজ করে তাই দেখালেন। এক পর্যায়ে আসলো পাওয়ার সাপ্লাইয়ের কথা। আমরা গিয়ে দেখি পাওয়ার ম্যাগাজিনের প্রথমেই ভোল্টেজ ও কারেন্ট লেখা আছে। এটা বর্তমানে “- ৫২ ভোল্ট” ও “২৭৩ অ্যাম্পিয়ার” এ চলছে। বললেন ভোল্টেজের রেঞ্জ – ৪৪ থেকে -৫৬ পর্যন্ত হতে পারে। এর বেশী বা কম না। জানলাম, সব ধরণের টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি “- ৪৮ ভোল্ট” চালানো হয়। এর থেকে একটু কমবেশী হতে পারে। যথারীতি প্রশ্নবাণ ছুটে গেলো আমাদের মধ্যকার পেশাদার প্রশ্নকর্তাদের কাছ থেকে।
- কেন, কেন? -৪৮ ই রাখতে হবে কেন? আর ঋণাত্মকই বা কেন? ধনাত্মক দিলে অসুবিধাটা কোথায়?
স্যার উত্তরও দিলেন। তবে উত্তর দেয়ার সময় উনারও যে একটা দ্বিধা আছে তা টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু যা বললেন তার সবই একবাক্যে মেনে নিলাম। উনি বললেন,
- ধনাত্মক বিভব মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, শক করে। কিন্তু ঋণাত্মক হলে শকের কোন ঝামেলা নেই। এজন্যই টেলিফোনের লাইন ধরলে কিছু হয় না, অথচ বিদ্যুতের লাইন ধরলে অক্কা পাওয়া আশংকা থাকে।
ভালোয় ভালোয় সব কেটে গেলো। আজকে আবার গেলাম রমনায়। KPI-1b স্থান। আমরা আগের দিন যে রুমে গিয়েছিলাম আজ গিয়েছি ঠিক তার পাশের রুমটাতে। গতকাল ট্যানডেম বুঝেছিলাম। আজ বুঝবো ট্যাক্স বা ট্রাঙ্ক অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ। আজকের ইনস্ট্রাক্টরকে দেখেই বেশ অভিজ্ঞ ও জানলেওয়ালা মনে হলো। খুব কনফিডেন্সের সাথে বলছিলেন, আমাদের প্রশ্নকর্তাদের প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছিলেন দক্ষতার সাথে। মাঝে একবার বাংলালিংকের ইঞ্জিনিয়ার এলেন। এই ট্যাক্সের সাথে বাংলালিংকের একটা “ই১” লাইনে সমস্যা হয়েছে। আমাদের সামনেই ট্রাবলশ্যুট করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে গেলো। কিভাবে কি করলেন তাও ব্যাখ্যা করে বোঝালেন। ব্যাখ্যাটা ছিল এরকম:
আসলে এক ট্যাক্স থেকে অন্য ট্যাক্স বা ট্যানডেমে সরাসরী তার দিয়ে সংযোগ দেয়া হয় না। মাঝখানে অন্ততপক্ষে চারটা “ডিডিএফ” (ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন ফ্রেম) থাকে। প্রথম ট্যাক্সের সাথে একটা ডিডিএফ থাকে। ট্যাক্স থেকে সবগুলো ই১ বের হয়ে ডিডিএফ এ যায়। এই ডিডিএফ থেকে আরেকটা ডিডিএফ এ যায় যেটা ট্রান্সমিশন মাধ্যমের সাথে যুক্ত। ট্রান্সমিশন মাধ্যম থেকে অন্য পারের ডিডিএফ এ যায়। অর্থাৎ যে ট্যাক্স বা ট্যানডেমের সাথে যুক্ত হতে হবে সেটার প্রথম ট্রান্সমিশন ডিডিএফ এ। এই ডিডিএফ থেকে দ্বিতীয় ট্যাক্স বা ট্যানডেমের ডিডিএফ এ যায় এবং সেখান থেকে ই১ গুলো যুক্ত হয়। এটা করা হয় ট্রাবলশ্যুটিয়ে সুবিধার জন্যই।
যদি পুরোটা এক তারের মাধ্যমে করা হতো তাহলে, কোথাও সমস্যা হলে পুরোটাই পরিবর্তন করতে হতো। কিন্তু এখন কোথাও সমস্যা হলে প্রথমে নির্ধারণ করা হয় কোন অংশে সমস্যা হয়েছে। তারপর শুধু সেই অংশের তারটা পরিবর্তন করে দেয়া হয়।
বাংলালিংকের এই সমস্যাটা হওয়ার পর, তিনি প্রথমেই নিজের ডিডিএফ থেকে আউটগোয়িং লাইনটা খুলে নিয়ে নিজের ইনপুটেই লাগিয়ে দিলেন। এতে একটা লুপ তৈরী হলো। লুপের মাধ্যমে বোঝা গেল এতে কোন সমস্যা নেই। এরপর রমনা এক্সচেঞ্জেরই চার তলায় অবস্থিত ট্রান্সমিশন ডিডিএফ থেকে লাইনটা লুপ করা হলো। দেখা গেলো সেখানেও কোন সমস্যা নেই। এরপর বাংলালিংকের ট্রান্সমিশন ডিডিএফ লুপ করে দেখা গেলো সমস্যাটা সেখানেই। তার মানে সে তারটা পরিবর্তন করে দিলেই হবে। পুরোটা ঘরে বসে কম্পিউটারে নিয়ণ্ত্রণ করতে দেখলাম। বেশ মজা লাগলো।
এভাবে উনাকে আমরা প্রথম থেকেই একটু শ্রদ্ধা করতে শুরু করলাম। আমাদের লেকচার ও পরিদর্শন হয়েছে দুই গ্রুপে। আমরা হলাম ই২ গ্রুপ। আমরা মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ করে বেরিয়ে এলাম। ই৩ গ্রুপ সেই যে ঢুকলো আর বেরনোর নাম নেই। এর মধ্যে আমি, ইমন, রুবায়েত আর মুরাদ বঙ্গবাজার ঘুরে এলাম। রমনা এক্সচেঞ্জ থেকে হাটা পথ। আমি কিছুই কিনি নাই। এটাই আমার স্বভাব। জীবনে কখনও নিজের কাপড় নিজে কিনি নাই। অন্যের কাপড় কেনা দেখলাম। বুঝতে পারছিলাম একটা শীথের কাপড় দরকার। কিন্তু কিনতে বাধলো। বঙ্গ থেকে ফিরে দেখি ই৩ এখনও ফিরে নাই। আরও আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো। দেড় ঘণ্টার মামলাকে তিন ঘণ্টা বানিয়ে ই৩ শালারা বীরদর্প বেরিয়ে এলো। টিজও যে খেলোনা তা-না।
তবে ই৩-র কাছ থেকে একটা বীরত্বের কাহিনী শুনলাম। উনাদের দেরীর কারণটা তো আমরা আগেই বুঝেছিলাম। সকল পেশাদার ও অপেশাদার প্রশ্নকর্তারা মিলে যে স্যারকে তুলোধুনো করেছেন আর স্যারও যে কনফিডেন্সের সাথে ধীরে ধীরে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তা তো বুঝতেই পাচ্ছিলাম। কিন্তু আগের দিনের অ্যাসাইনমেন্টওয়ালাকে হেনস্ত করার খবর শুনে তাদের সে আঁতলামিকে মাফ করে দিতে হলো। তারা -৪৮ ভোল্টের বিষয়টা নিয়ে আজকেও প্রশ্ন তুলেছিলো। আজকের দক্ষ স্যার নাকি অন্য উত্তর দিয়েছে। আজকের স্যার শক খাওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে লিকেজ কারেন্ট নিয়ে এসেছেন। ঋণাত্মক ভোল্টেজের লিকেজ কারেন্টের মাধ্যমে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এই তো সুযোগ। ট্যাক্সের রুম থেকে বেরিয়ে ত্যানারা আবার ট্যানডেমের রুমে প্রবেশ করেছেন। গতকালের ইনস্ট্রাক্টরকে প্রশ্ন করলেন,
- স্যার সব টেলিকম যন্ত্রপাতিতে -৪৮ ভোল্ট ব্যবহার করা হয় কেন?
স্যার বললেন,
- আজকে আবার হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
- না স্যার, এমনি কালকে ক্লিয়ার হয়নি তো, তাই।
- ও, তা আমি তো কালকেই নিরাপত্তার ব্যাপারটা বলে দিয়েছি।
- কিন্তু স্যার আজকে ট্যাক্সের ইনস্ট্রাক্টর তো অন্য কথা বললেন।
- ও তোমরা আজকে পাশের রুমে ছিলে। “-” ভাই তো খুব অভিজ্ঞ আর পুরনো। দেখি উনার সাথে আমি কথা বলে দেখি।
এই বলে তিনি ট্যাক্সের স্যারকে ফোন লাগালেন। সব শুনে ই৩ গ্রুপের প্রেস্টিজ পাংচারকারীদের দিকে চেয়ে বললেন। হুম, ঠিকই তো আছে। তারপর শক খাওয়া আর লিকেজ কারেন্টের মধ্যে একটা গোজামিল দিয়ে কোনমতে নিজের প্রেস্টিজটা রক্ষা করলেন। স্যারকে আর না বাজিয়ে বীরের দল আমাদের মাঝে ফিরে এলো। আমরা বাসের মধ্যে চিতপাত হয়ে ঘুমুতে ঘুমুতে আইইউটিতে ফিরে এলাম।
হলে এসে নেটে সার্চ দিয়েই -৪৮ ভোল্টের বিষয়টা পেয়ে গেলাম। উইকি-আনসার্স এ গিয়ে এর পাঁচটা কারণ খুঁজে পেলাম। দেখলাম এখানে শকের ব্যাপারটাও আছে আবার লিকেজ ভোল্টেজের ব্যাপারটাও আছে। দুজনেই যে পাট নেয়ার চেষ্টা করেছেন এইবারে বুঝলাম। উল্লেখ্য, দুজনেই বুয়েটের ছাত্র। ট্যাক্সের স্যার বুয়েটের ফার্স্ট বয় ছিলেন আর ট্যানডেমের স্যার নাকি ছিলেন সপ্তম। যদিও এক ব্যাচে না। আমি বুঝে পেলাম না, বুয়েটের প্লেস হোল্ডাররা সব সরকারী চাকরিতে ঢুকলো কেন।
যাহোক টেলিকমে কেন -৪৮ ভোল্ট ডিসি ব্যবহার করা হয় তার কারণগুলো বিস্তারিত লিখে শেষ করে দেই। উইকি-আনসার্স থেকে পাওয়া কারণগুলো এরকম:
১। ঋণাত্মকের তুলনায় ধনাত্মক ভোল্টেজ ধাতুর বেশী ক্ষয় করে।
২। টেলিকমের বিভিন্ন কাজ করার ক্ষেত্রে মানব দেহের জন্য ঋণাত্মক ভোল্টেজ বেশী নিরাপদ।
৩। বজ্রপাতের সময় টেলিকম যন্ত্রপাতির বর্তনীতে ধনাত্মক ভোল্টেজের সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ঋণাত্মক ভোল্টেজ (ইলেকট্রনের অভাব) সৃষ্টি হওয়া ধনাত্মক আধানকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে অধিক তাপ উৎপন্ন হতে পারে না।
৪। লম্বা দূরত্বের টেলিফোন লাইনের মধ্য দিয়ে পাওয়ার ট্রান্সমিশনের জন্য ঋণাত্মক ভোল্টেজ বেশী নিরাপদ।
৫। একটা আদর্শ “লেড-এসিড ব্যাটারি” ৬ ভোল্ট সরবরাহ করে। এরকম আটটি ব্যাটারি দিয়ে মোট ৪৮ ভোল্ট তৈরী করা যায় যা টেলিকম যন্ত্রপাতির জন্য বেশ আদর্শ মান। লম্বা লম্বা তারের মধ্য দিয়ে ট্রান্সমিশনের জন্য এই ৪৮ ভোল্টই সর্বোচ্চ নিরাপদ ভোল্টেজ।
৬। আর্দ্রতার কারণে যন্ত্রপাতি থেকে গ্রাউন্ডের মধ্যে লিকেজ কারেন্টের সৃষ্টি হয়। এই লিকেজ কারেন্ট ইলেকট্রোপ্লেটিং এর মাধ্যমে কপারের তারকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। ঋণাত্মক ভোল্টেজ এই লিকেজ কারেন্ট সৃষ্টিকে কমিয়ে রাখে।
ব্যাপার টা এত জটিল নয়। In fact AC এর জন্য যেমন Phase কে বেজ ধরে সব কিছু ডিজাইন করা হয়েছে, তেমনি DC জন্য (-Ve) বেজ ধরে সব কিছু ডিজাইন করা হয়েছে। সব কিছু মানে সব কিছু, প্রোডাকশন, ট্রান্সমিশন, কনজামন্স। আর এইজন্য সমস্ত ম্যানুফ্যাকচারার (-Ve) কে মাথায় রেখে মেশিন ডিজাইন করে।
(-Ve) কে ক্যানো বেজ ধরেছে এই উত্তর অন্য, টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার এটা বলতে পারবে না, এটা বলতে পারবে পাওয়ার এর ইঞ্জিনিয়ার।
তাহলে তো প্রথম দিনের ঐ ইনস্ট্রাক্টরকে এভাবে আক্রমণ করা ঠিক হয়নি। অবশ্য আমার কোন দোষ নাই। তাকে দ্বিতীয় দিন প্রশ্ন করার কাজে আমি ছিলাম না।
বেজ ধরার বিষয়টাই যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে।