আইইউটি’র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং – ১
আইইউটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই জানি থার্ড ইয়ার শেষে একটা এক মাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং হয়। পরে এ সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু জেনেছি। বড় ভাইরা বলেন, এই সময় নাকি সেই রকম মজা হয়, বিশেষত ঘোড়াশালের এক সপ্তাহ। কয়েকদিন আগে আইইউটি থেকে এবার পাশ করে যাওয়া আমাদের কলেজের (মির্জাপুর) বড় ভাইদের ফেয়ারওয়েল দিতে গিয়ে শুনলাম, তিন বছর আইইউটি নিয়ে কোন ফিলিংস না হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং শেষে নাকি মনে হয়, আইইউটিতে আর মাত্র এক বছর আছি। তখন নাকি খারাপ লাগা শুরু হয়। তাই অনেক দিক দিয়েই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং আইইউটিয়ানদের কাছে অনন্য।
আগের বারের তুলনায় এবার আমরা সুবিধা একটু কম পাচ্ছি। যেমন, গতবার সবাইকে দিনের খাওয়া-দাওয়ার জন্য ১২০ টাকা করে দেয়া হতো। এবার আমাদেরকে কোন টাকা দেয়া হচ্ছে না। তার বদলে সরাসরি খাবার সাপ্লাই করা হচ্ছে। ঘোড়াশালেও বাবুর্চির হাতে টাকা দেয়া হবে। আমাদের হাত থাকবে শূন্য। এজন্য সবাই একটু মনঃক্ষুন্ন হয়েছে। অবশ্য মেকানিক্যালের পোলাপান চালাক। ওরা আগেভাগেই স্যারদেরকে বলে টাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। মেকানিক্যালের সবাই দিনে ২৩০ টাকা করে পাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় বোধহয় টাকার পরিমাণটাও বেড়ে গেছে। আমরা হতভাগা, টাকার কথা ভেবে কি লাভ!
এবার সরাসরি ট্রেনিং এর কথায় চলে আসি। মোট চার সপ্তাহ ট্রেনিং হবে। একেক সপ্তাহ একেক জায়গায়। আমরা যে চার স্থানে যাচ্ছে তা হলো:
- বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)
- এনার্জিপ্যাক, সাভার
- বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এইআরই)
- ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
গতকাল আমাদের ট্রেনিং শুরু হয়েছে। চার গ্রুপ গিয়েছে চার জায়গায়। আমরা গেলাম বিটিসিএল-এ। বিটিটিবি-র নাম যে পরিবর্তিত হয়ে বিটিসিএল হয়েছে এটা আগে জানতাম না। আজকেই নেট ঘাটতে গিয়ে দেখলাম, ২০০৮ সালের ১লা জুন থেকে বিটিটিবি নতুন বিটিসিএল নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য বাজারে শেয়ার ছাড়া। সরকার একে একে বেসরকারী খাতে শেয়ার ছাড়তে থাকবে। এখনও বিটিসিএল এর সব শেয়ার সরকারের হাতেই আছে।
শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবনের বিপরীতে বিটিসিএল এর মূল ভবনে আমাদের কোস্টার প্রবেশ করে আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে। সরকারী ভবন যেমন হয় আর কি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় অনেক দিন আগের পোড়ো বাড়ি। কিন্তু ভিতরে ঠিকই হাইফাই অবস্থা। অবশ্য টেলিকমের যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য এর চেয়ে একচুল কম নিরাপত্তা আর জাঁকজমক দিয়েও চলতো না। ভিতরে ঢুকেও আমাদেরকে তিন গ্রুপে ভাগ হয়ে যেতে হলো। এক ইঞ্জিনিয়ার এক গ্রুপ করে ক্লাস নিতে শুরু করলেন।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তাবলীগ করেন। বিশাল লম্বা দাড়ি, কথাবার্তায় বেশ মোলায়েম আর নম্র; তাবলীগের লোকজন যেমন হয় আর কি। আমরা ভেবেছিলাম, সেড়েছে, কয় ঘণ্টা জানি লাগায়। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, ১০ মিনিট কথা বলে উনি অফ গেছেন। দশ মিনিটে শুধু বিটিসিএল এ কি আছে তার একটা ভাসা ভাসা বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করলেন।
কথাবার্তা উনি বিশেষ পটু নন বোঝা গেল। অবশ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহ করা যায় না। ১৯৮৮ সালে বুয়েট থেকে পাশ করেছেন, ইলেকট্রিকেলেই। ১০ মিনিটে উনার বলা কথাগুলোর সারমর্মটা এরকম। আসলে সারমর্ম বলা ঠিক হবে না। কারণ উনার পুরো কথাটাকেই একটা সারমর্ম বলে আখ্যায়িত করা যায়। উনি বললেন:
বিটিসিএল-এ মোট চারটি এক্সচেঞ্জ আছে। এক্সচেঞ্জ মানে কি সেটাও বললেন না। আমরা বুঝে নিলাম, টেলিফোন সুইচিং স্টেশনের কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবেও আসলে তাই। তো চারটা এক্সচেঞ্জ চার কোম্পানির। চারটা এক্সচেঞ্জ নিয়ে বলার আগে উনি দুই ধরণের এক্সচেঞ্জের নাম বলে দিলেন:
- লোকাল এক্সচেঞ্জ (একটামাত্র এক্সচেঞ্জের মধ্যে লোকাল কল)
- ট্যানডেম এক্সচেঞ্জ (এক এক্সচেঞ্জ থেকে আরেক এক্সচেঞ্জে কল)
তারপর শুরু করলেন চার এক্সচেঞ্জের কথা:
১। অ্যালকাটেল এক্সচেঞ্জ – বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এক্সচেঞ্জ। এর মধ্যে লোকাল আর ট্যানডেম দুটাই আছে। ট্যানডেমটা ৩৭,০০০ লাইনের, আর লোকালটা ১৮,০০০ লাইনের। সাথে এটাও বুঝিয়ে দিলেন যে আমাদেরকে কেবল অ্যালকাটেল নিয়েই বলা হবে। অন্য দুটা এক্সচেঞ্জের বিস্তারিত জানার সুযোগ নেই। বিটিসিএল-এ ঢোকার পর থেকেই দরজা আর দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় অ্যালকাটেলের পোস্টার লাগানো দেখছিলাম, উত্তরটা পেয়ে গেলাম।
২। এনইসি এক্সচেঞ্জ – পুরো নাম Nippon Denki Kabushiki Gaisha, জাপানী কোম্পানি। এদেরও লোকাল আর ট্যানডেম এক্সচেঞ্জ আছে।
৩। নেটাস এক্সচেঞ্জ – এটা তুরস্কের। নেটে সার্চ দিয়ে দেখলাম, নরটেলের তুর্কী অংশের নামই বোধহয় নেটাস (Netas)। আমি অবশ্য নিশ্চিত না, নেটে এটা নিয়ে কিছুই নেই। এদের শুধু লোকাল এক্সচেঞ্জ আছে।
৪। জেডটিই এক্সচেঞ্জ – চীনের জেডটিই কোম্পানির নাম আগে থেকেই জানতাম। পুরো নাম Zhong Xing Telecommunication Equipment Company Limited। এদেরও বাংলাদেশে কেবল লোকাল এক্সচেঞ্জ আছে।
আমাদেরকে অ্যালকাটেল এক্সচেঞ্জটাই ঘুরিয়ে দেখালেন। লোকাল আর ট্যানডেম দুটাই। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলার আগে অ্যালকাটেল নিয়ে দুয়েক কথা বলে নেই। এর পুরো নাম সম্ভবত Alcatel-Lucent Developer Exchange। বাংলাদেশে কেবল “Alcatel-Lucent বাংলাদেশ” নামে পরিচিত। অ্যালকাটেলের সাথে ফ্রান্সের Lucent Technologies একত্রিত হয়ে অ্যালকাটেল-Lucent গঠন করেছে। সদর দফতর ফ্রান্সেই।
সেই ফরাসি কোম্পানির হার্ডওয়্যার দেখার কাজে নেমে গেলাম আমরা। এই ছোট্ট গ্রুপেও দুই ভাগ আনা হলো। প্রথমে চারজনকে লোকাল এক্সচেঞ্জের হার্ডওয়্যার দেখালেন। দেখলাম একটা আলমারির মতো বাক্সে অনেকগুলো “সাবস্ক্রাইবার কার্ড”। প্রতিটা কার্ডে ১৬ জন করে সাবস্ক্রাইবার সংযুক্ত। কার্ডের কেবল একজন সাবস্ক্রাইবার বিজি থাকলেও তাতে লাল বাতি জ্বলতে আর নিভতে থাকে। এগুলো কিভাবে “মেইন ডিস্ট্রিবিউশন ফ্রেম” এর সাথে যুক্ত তাও দেখালেন। একটা তারের ভেতরে অতি সরু সরু ১৬টি তার। এমন ৮টি তার একসাথে হয়ে এমডিএফ-এ যায়। একটা বিষয় পরিষ্কার না, আমার মনে হচ্ছে, একসময় উনি বলেছিলেন এক কার্ড দিয়ে ২৫৬ জন সাবস্ক্রাইবার সংযুক্ত হতে পারে। তার মানে ১৬*১৬। এটাই বোধহয় ঠিক। যাহোক এতো বুঝে কাজ নেই।
লোকাল এক্সচেঞ্জের কন্ট্রোল প্যানেল আর পাওয়ার সাপ্লাইও দেখালেন। এরপর নিয়ে আসলেন ট্যানডেমে। ট্যানডেমের বিষয়-আশয়ও অনেকটা লোকালের মতো। তবে এখানে আইপি-র ব্যবহার আছে। মডেম নেক্সট জেনারেশন টেলিকম নেটওয়ার্কে ব্যভহৃত হবে। এজন্যই বিটিসিএল মডেমের মাধ্যমে আইপি-র ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য এই আইপিগুলো বোধহয় কেবল এক্সচেঞ্জের, সাবস্ক্রাইবারদের কোন আইপি দেয়া হয়নি। তবে চাইলেই দেয়া যাবে।
হার্ডওয়্যার শেষে আমরা সফ্টওয়্যার দেখতে গেলাম। কম্পিউটার আর সার্ভার রুম। অনেক দিন আগে গ্রামীণে গিয়ে ল্যাপটপে দেশের সব মোবাইল ফোনের হিসাব রাখা দেখে বিস্মত হয়েছিলাম। এখানে পিসি-তে অ্যালকাটেল এক্সচেঞ্জের সব টেলিফোনের হিসাব দেখানো হলো। কি হলে টেলিফোনের লাইনকে ভালো বলা যায় তা ব্যাখ্যা করার অপচেষ্টা করলেন। তারপর ঢাকায় বাসা এমন একজনের নাম্বার নিয়ে তার বাসার ফোন লাইনের সব বলে দিলেন। এরপরে সার্ভার দেখালেন, বোঝানোর অপচেষ্টা করলেন কিভাবে প্রতিটা কলের হিসাব স্বয়ংক্রিভাবে এসে যায়।
এ পর্যন্তই। এই পুরোটা শেষ হতে মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় লেগেছে। শেষ করার সাথে সাথে আমরা নিচে নেমে গিয়ে বাসে উঠলাম। খিদে পেয়েছিলো খুব। বাসে উঠেই লাঞ্চ শুরু করলাম। খাওয়ার পর কেবল অপেক্ষার পালা। অন্য গ্রুপগুলো এলেই আমাদের ট্রেনিং এর প্রথম দিনের ইতি ঘটিয়ে বোর্ড বাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা যাবে। ঢাকার পোলাপান তো বেজায় খুশী। শেরে বাংলা নগর থেকে যাদের বাসা কাছে তারা সবাই চলে গেলো। আমরা অ-ঢাকাবাসীরা আইইউটিতে ফিরে চললাম।
আইইউটিতে গিয়ে দেখি সাভার এনার্জিপ্যাকে যারা গিয়েছিলো তারা আমাদেরও আগে এসে গেছে। তাদের নাকি আরও কম সময়ে লেগেছে। কিন্তু এটমিক এনার্জ যাওয়া হতভাগাদের দুঃখের কথা ভেবে খুশী হলাম। শালারা সন্ধ্যার সময়ে ফেরত এসেছে। এনার্জির আতেলেরা সেই যে লেকচার শুরু করেছে, আর থামার নাম-গন্ধ নাই। এইসব নিয়ে বীতশ্রদ্ধ মুহিব সচলায়তনে একটা ব্লগও দিয়ে ফেলছে। ব্লগের নাম “জ্ঞানার্জনের জন্য চিনদেশ গমন।“
বিটিসিএল এ গিয়ে একটা কথা নতুন করে মনে হলো: সরকারী চাকরিতে যোগ দেয়া। আমার খুব ইচ্ছা রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়া। একরকম মনস্থির করে ফেলেছিলাম: বাইরে থেকে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে দেশে এসে কাজ শুরু করবো। বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি করবো। দেশে এসে “স্পারসো” (স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশন)-তে যোগ দেয়াটা খুব একটা খারাপ হবে না, এখন আবার ভেবে দেখলাম। সম্প্রতি ভারতের ইসরোর চন্দ্রাভিযানের খবর শুনে আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ কবে বহির্জাগতিক বস্তুগুলোর খোঁজ নেয়া শুরু করবে? কবে আমরা মহাকাশ যুগে প্রবেশ করবো? এতো পিছিয়ে থাকলে কি চলে?
শেষের কথাগুলো অবশ্য কেবলই স্বপ্ন। বাস্তবে এটা আশা করা বোকামি।
সরকারী চাকরীতে ঢুইকো। লাভ আছে। এখন বুঝবা না। পরে বুঝবা। সরকারী চাকরীর উপরে এই দেশে আর কুন চাকরী হয় নাকি?
আশার কথা শুনাইলেন ভাই। আমি সরকারীতেই ঢুকতেছি। দিন দিন স্বপ্নটা আরও বাড়তেছে এবং আরও বাস্তবমুখী হইতেছে।