আর্থলিংয়ের তোলা বহির্গ্রহের প্রথম ছবি?

2008 সেপ্টেম্বর 18

1RXS J160929.1-210524এই ১৫ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর তিনজন বিজ্ঞানী “জেমিনি নর্থ টেলিস্কোপ” দিয়ে এক বহির্জাগতিক গ্রহের ছবি তোলার বলে দাবী করেছেন। দাবী বলছি এইজন্যে যে, এটা বহির্গ্রহ নাকি অন্য কোন জ্যোতিষ্ক তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু বিষয়টা ইতোমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ বিজ্ঞানীরা প্রায় ৩০০টির মত বহির্জাগতিক গ্রহ আবিষ্কার করলেও কোনটির সরাসরি ছবি তুলতে পারেননি। সবগুলোই বিভিন্ন পরোক্ষ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং প্রমাণিত হলে, এটাই হবে পৃথিবীর মানুষের তোলা বহির্গ্রহের প্রথম ছবি।

যে তিন বিজ্ঞানী এই ছবি তুলেছেন তারা হলেন, David Lafrenière, Ray JayawardhanaMarten van Kerkwijk। তারা ব্যবহার করেছেন নর্থ জেমিনি টেলিস্কোপ। জেমিনি মানমন্দিরের অধীনস্থ এই দুরবিনটি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত। বিজ্ঞানীদের এই দল বৃশ্চিক রাশির উপরের অংশে অবস্থিত প্রায় ৮৫টি তারা নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তারা এবং এদের আশাপাশের সঙ্গীদের খোঁজ করা। এজন্য জেমিনি দুরবিনের খুব উচ্চ রেজল্যুশন ক্যামেরার সাহায্য নিয়েছিলেন।

নতুন জ্যোতিষ্কটি যে তারার সাথে বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে তার নামটা যথারীতি খুব বিদঘুটে: 1RXS J160929.1-210524 (১আরএক্সএস জে১৬০৯২৯. ১-২১০৫২৪)। তবে চিন্তার কারণ নেই, জনপ্রিয় হয়ে গেলে এর খুব সুন্দর একটি নাম নিশ্চয়ই দেয়া হবে। তারাটির অবস্থান আমাদের থেকে প্রায় ৪৭২ আলোকবর্ষ দূরে। অর্থাৎ সেখান থেকে আমাদের পৃথিবীতে আলো আসতে ৪৭২ বছর লাগে, স্বভাবতই আমরা তারাটি ৪৭২ বছর আগে কেমন ছিল তা দেখছি।

এটা প্রাক-প্রধান ধারার তারা। কোন তারা জীবনের অধিকাংশ সময়ই হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরী করে। এই সংযোজন বিক্রিয়ায় মাধ্যমে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা অভিকর্ষের বিরুদ্ধে ক্রিয়া করে ভারসাম্য রক্ষা করে। যে তারাগুলো এই ভরসাম্যপূর্ণ সময় অতিবাহিত করছে তাদের বলা হয় প্রধান ধারার তারা। বোঝাই যাচ্ছে 1RXS J160929.1-210524 প্রধান ধারায় প্রবেশের পথে। এজন্যই তাকে বলা হচ্ছে প্রাক-প্রধান ধারার তারা।

এছাড়া তারার বর্ণালী বিশ্লেষণ অনুযায়ীও তাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ফেলা হয়। তারা থেকে পাওয়া আলোর রং বিশ্লেষণ করে মাঝে মাঝে কালো দাগ পাওয়া যায়। এদেরকে বলে বিশোষণ রেখা। আলো যখন তারার কেন্দ্র থেকে আসতে থাকে তখন, তারার মধ্যে অবস্থিত রাসায়নিক বস্তুগুলোই কিছু কম্পাঙ্ক শোষণ করে নেয়। এ কারণেই কালো দাগ দেখা যায়। সুতরাং বিশোষণ রেখা দেখে তারার রাসায়নিক পদার্থ সম্বন্ধেও জানা যায়। এই তারার শ্রেণী K7। যেসব তারার ভর সূর্যের সাথে তুলনীয় এবং যেগুলোর বর্ণালী রেখায় CH, CN ও OH মূলকের আণবিক ব্যান্ড দেখা যায় তাদেরকে K শ্রেণীর মধ্যে ফেলা হয়। এই শ্রেণীরই একটি উপশ্রেণী K7। 1RXS J160929.1-210524 এর ভর সূর্যের ভরের ৮৫%, এটা দেখেই তার শ্রেণী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া এই তারা বয়সে সূর্যের তুলনায় বেশ নবীন।

ভূমিকাতেই বলেছি, বিজ্ঞানীরা বৃশ্চিক রাশির তারাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এই ছবি তুলেছেন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এই তারার অবস্থান বৃশ্চিক রাশিতে। পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান তারাগুলোকে আধুনিক কালে যে ৮৮টি তারামণ্ডলে ভাগ করা হয়েছে বৃশ্চিক তাদেরই একটি।

নতুন জ্যোতিষ্কের বর্ণালী বিশ্লেষণ থেকে অনেক কিছুই জানা গেছে। এর আয়তন আমাদের বৃহস্পতির প্রায় আট গুণ। এখানেই বিস্ময়ের শেষ না। এই বস্তু থেকে তারাটির দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের ৩৩০ গুণ। কোন তারার এতো দূরে অবস্থিত কোন বস্তু তাকে আবর্তন করতে পারে, এমনটা বিজ্ঞানীদেরই ধারণাতেই ছিল না। সৌরজগতের সবচেয়ে বাইরের গ্রহ নেপচুনের দূরত্বও পৃথিবী-সূর্য দূরত্বের মাত্র ৩০ গুণ। তাই, অনেকেই গ্রহ ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করার কথা ভাবছেন।
এই বস্তুর তাপমাত্রা ১৮০০ কেলভিন (১৫০০° সেলসিয়াস) যেখানে আমাদের বৃহস্পতির তাপমাত্রা মাত্র ১৬০ কেলভিন (-১১০° সেলসিয়াস)।

কিন্তু আগেই বলেছি, এই জ্যোতিষ্ক যে গ্রহ সেটা এখনও প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণ করাও খুব একটা সহজ না। টরন্টোর বিজ্ঞানীরা খুব আশাবাদী। কিন্তু সে আসলেই তারাকে কেন্দ্রে করে ঘুরছে কি-না তা বুঝতে প্রায় দুই বছর লেগে যাবে। ততদিন আমাদের অপেক্ষাই করতে হবে।

এর মধ্যে বিজ্ঞানীরা একই ধরণের অন্যান্য আবিষ্কারগুলোর সাথে একে মিলিয়ে দেখছেন। এর আগেও এরকম ছোট ছোট জ্যোতিষ্কের ছবি তোলা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো হয় নিঃসঙ্গ ছিল অর্থাৎ কোন তারার বন্ধনে বাঁধা পড়েনি, নয়তো এমন কোন তারাকে কেন্দ্র করে ঘুরছিল যেগুলো ইতোমধ্যে মরে গেছে। সুতরাং এটাও যে নিঃসঙ্গ নয় তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য Marten van Kerkwijk এ সম্বন্ধে বলেন,
আমরা অপেক্ষাকৃত নবীন তারাগুলোকে টার্গেট করছি। কারণ, সেক্ষেত্রে তাদের বন্ধনে আবদ্ধ গ্রহ বা গ্রহসম বস্তুগুলো শীতল হয়ে যাবে না। আর শীতল না হলে সেগুলোর উজ্জ্বলতাও আমাদের চোখে পড়ার উপযোগী হবে।

তবে এই জ্যোতিষ্ক যে আমাদের নিরাশ করবে না তার কিছু প্রমাণ হাতে আছে। যেমন, অবলোহিত ছবি নিয়ে দেখা গেছে, এর তাপমাত্রা তারা হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত না। তাই অনেকেই আশায় বুক বেঁধে আছেন।

প্রমাণিত হলে এটা অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। গ্রহ বিজ্ঞানে অনেক পরিবর্তন আসবে। আর এটাও প্রমাণিত হবে যে, মহাবিশ্বকে আমরা পৃথিবীতে বসে যেরকম ভাবছি তা আসলে সেরকম না। প্রকৃতি আমাদেরকে কত বিস্ময় উপহার দিতে পারে তার একটা প্রদর্শনীও হয়ে যাবে। প্রকৃতি তার রহস্য উন্মোচন সবে শুরু করেছে। আমরা যতই দেখছি ততই বিস্মিত হচ্ছি।

সূত্রঃ
- First Picture Of Likely Planet Around Sun-like Star – সায়েন্স ডেইলি

No comments yet

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS