ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে?

2008 জুন 21

“ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, চিকো”-র নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্পাদিত “Magic, Witchcraft and Religion” বইয়ে ধর্ম ও অতিপ্রাকৃতের নৃবিজ্ঞান নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রবার্ট এইচ লোভির (Robert H. Lowie) একটি প্রবন্ধ আছে যার নাম “Religion in Human Life”। এটা পড়ার পরই কিছু লেখার তাড়া অনুভব করলাম। এমন একটা সময়ে প্রবন্ধটি লেখা যখন ধর্মের নৃবিজ্ঞান কেবল প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছিল এবং যখন সমাজের সাধারণ মানুষের উপর বিজ্ঞানের প্রভাব এতো বেশি ছিল না। ১৯৬৩ সালকে অনেকটা এরকমই ধরে নেয়া যায়। সমসাময়িক নৃতাত্ত্বিক চিন্তাধারা এবং সময়ের পটভূমিতে লোভির প্রবন্ধটি নিয়ে আলোচনা করাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। তবে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের আগে লোভির জীবন এবং প্রবন্ধটিতে তিনি ঠিক কি কি বলেছেন তা পরিষ্কার করে নিতে চাই।

রবার্ট লোভির জন্ম ১৮৮৩ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে। জন্মের ১০ বছর পর সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে চলে আসেন। তবে নিউ ইয়র্কের জার্মান পল্লীতে থাকার কারণে লোভিকে খুব ভিন্ন কোন সমাজের মাঝে পড়তে হয়নি। তার বাল্যকালের প্রতিবেশে ইহুদি চিন্তাধারার পাশাপাশি মুক্তচিন্তারও স্থান ছিল। এই প্রবন্ধেই লোভি বলেছেন, বাবা-মা ছোটকালে তাকে কোন ধমীয় শিক্ষা দেননি। তাই কোন নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি ছোটকাল থেকেই তার আগ্রহ গড়ে উঠেনি। ১৬ বছর বয়সে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং লক্ষ্য করেন আর্নস্ট হেকেল সহ সমসাময়িক দর্শনের মূল ধারার দার্শনিকদের মনোভাব সব ধর্মের প্রতিই বিরূপ। বয়স ২৫ হওয়া পর্যন্ত দার্শনিকদের এই মনোভাব কেবল দেখেই গেছেন। এরই মধ্যে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করেন এবং নৃবিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে উঠেন। নৃবিজ্ঞানকেই ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন। বিভিন্ন বর্ণনামূলক গবেষণার মাধ্যমে নৃবিজ্ঞান সমৃদ্ধকরণে বিশেষ অবদান রাখেন।

রবার্ট লোভি ঠিক কি কারণে ধর্মে আগ্রহী হয়ে উঠলেন তা অনুমান করা যায়। খ্রিস্টান মিশনারিদের মানসিক দৃঢ়তা এবং বিশুদ্ধ জীবনযাপনই তাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল। এরপর যখন মাঠ পর্যায়ে গবেষণার জন্য অ্যারিজোনা আর মন্টানায় গেলেন এবং সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মের বিশাল প্রভাব লক্ষ্য করলেন তখনই বোধহয় আগ্রহটা পাকাপোক্ত হয়ে গেল। সমসাময়িক অনেক নৃবিজ্ঞানীর মত তিনিও মেনে নিলেন, মানুষের বাস্তব জীবনে ধর্মের প্রভাব এতো বেশি যে এ নিয়ে পরিপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। লোভি যে কেবল ধর্মের নৃবিজ্ঞান নিয়েই কাজ করেছেন তা নয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে ধর্মের প্রভাব তাকে বরাবরই বিস্মিত করছে। “Religion in Human Life” প্রবন্ধে সে দিকগুলোই ফুটে উঠেছে। প্রথমেই তিনি গবেষণার ধরণ বলে দিয়েছেন, অবশ্যই তা নৃতাত্ত্বিক। নৃতত্ত্বের মূলকথা হল, সবাইকে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। অন্যদের বুঝতে না পারার মূল কারণ যে পক্ষপাতিত্ব তাকেই সমূলে উৎপাটন করে নৃবিজ্ঞান। লোভি এই কাজ আরও সহজে করতে পেরেছেন। কারণ ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে কোন ধর্মীয় সংস্কার গড়ে উঠেনি। এ কারণে তার অসুবিধা না হয়ে বরং আরও সুবিধা হয়েছে, তিনি সবকিছু নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সমর্থ হয়েছেন। লোভির দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি বড় দিক হল, তিনি স্বয়ং বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের পক্ষ নিয়েও কথা বলেননি, বিজ্ঞানী হয়েও বিজ্ঞানকে ধর্মের সমতলে নামিয়ে এনেছেন।

লোভি লক্ষ্য করলেন, আদিম পৃথিবীতে এমন কোন সভ্যতা বা সংস্কৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না যাদের কোন ধর্মীয় ধারণা বা বিশ্বাস ছিল না। যেহেতু এটা সর্বব্যাপী ও সুপ্রতিষ্ঠিত সেহেতু এর কোন না কোন গুরুত্ব অবশ্যই থাকবে। এই গুরুত্বের কথা বুঝতে পারলেন আফ্রিকার আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে খ্রিস্টান চার্চের ধর্মপ্রচারক সবার মধ্যে একটি সাধারণ চেতনার দিকে লক্ষ্য করে। চেতনাটি হল, “অন্যকে সাহায্য করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের চেয়ে অনেক বড় কোন সত্ত্বার প্রতি বিশ্বাস থেকে পাওয়া সাহস”। এভাবেই বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তথ্য জোগাড় শুরু করলেন তিনি। সবকিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলেন। তার কাছে এগুলো ছিল কেবল মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন যা অবশ্যই বৈজ্ঞানিক গবেষণার দাবী রাখে। এর পাশাপাশি ধর্মবিরুদ্ধতার দিকেও চোখ পড়লো তার। সে সময় ধর্মের প্রতি পণ্ডিতদের তিন ধরণের মনোভাব ছিল। প্রথমত, ধর্ম এক ধরণের কর্তৃপক্ষ যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা হরণ করে; দুই, বাধা নিষেধের প্রতীক; তিন, জনগণের আফিম। ভলতেয়ারের বিখ্যাত উক্তি থেকে প্রথম মনোভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়, “প্রথম দুষ্কৃতিকারীটি যখন প্রথম বোকাকে ঠকিয়েছিল তখন থেকেই ধর্মের সূচনা।” আর শেষ মনোভাব যে মার্ক্সবাদ থেকে এসেছে তা না বললেও চলে। মার্ক্সের মতে ধর্ম হল পুঁজিবাদের হাতিয়ার যা দিয়ে তারা শোষণ প্রক্রিয়া চালু রাখে।

স্পষ্টতই বোঝা গেল, ধর্ম বুদ্ধিজীবী মহলে কতটা ভিত্তিহীন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এটাও সত্য যে, সাধারণ মানুষের কাছে তা কখনই গুরুত্ব হারায়নি। এক সময় চার্চের গুরুত্ব মানুষের কাছে কমে গিয়েছিল, কিন্তু ধর্মের শক্তি তখনও পুঞ্জিভূত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকেই ধর্মকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন, মুক্তি ও নিরাপত্তার আশায়। এ থেকে বোঝা যায় ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা ভাব মূলত উন্নতি ও প্রতিপত্তি থেকে আসে। মানুষ প্রভাবশালী ও ধনী হয়ে গেলে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা তার কাছে ফুরিয়ে যায়, অন্তত সে তা-ই মনে করে। এই অবজ্ঞা ভাব অনেক বিস্তৃত হয়েছে, যা দুটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়: এক, ধর্মের প্রতি অনেকেই নিবেদিত কিন্তু এদের মধ্যে অধিকাংশই হতদরিদ্র; দুই, অন্যরা অর্থাৎ যারা স্বচ্ছল তারা ক্যাথলিক ধর্মকে পরোক্ষভাবে পালন করে, সন্তানকে ব্যাপ্টাইজ করলেও নিয়মিত ধর্ম পালন তাদের দ্বারা হয়ে উঠে না। প্রোটেস্ট্যান্ট সুইডেন বা ইভানজেলিক্যালদেরও অবস্থাও এমন। এভাবেই আধুনিক সভ্য জগৎ থেকে ধর্ম উধাও হতে বসেছে, আপাত দৃষ্টিতে অন্তত তা-ই মনে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মাঝে কাজ করতে গিয়ে লোভি লক্ষ্য করলেন, অ্যামেরিকার আদিবাসী অর্থাৎ ইন্ডিয়ানদের অনেক গোষ্ঠীর মধ্যে ধর্ম এখনও বিশাল প্রভাব বিস্তার করে আছে, আদিম মানুষের জীবনে যেমন ছিল অনেকটা তেমনই।

নিউজিল্যান্ডের মাউরি গোষ্ঠীর লোকেরা যে কোন কাজের শুরুতেই ঐশীবাণী পড়ে নেয়, এমনকি একটি নৌকা বানাতে গেলেও বা বানানোর পর তা প্রথমবারের মত পানিতে ভাসাতে গেলেও। উত্তর ব্রাজিলের আপিনাই গোষ্ঠীর লোকেরা প্রতিদিন সূর্যের সম্মানে সমবেত ধর্মীয় সঙ্গীত গায়। এই উদাহরণগুলো লোভি পরোক্ষভাবে দিয়েছেন। নিজের গবেষণা ক্ষেত্র তথা ক্রো ও হোপি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় একাগ্রতা তাকে প্রত্যক্ষভাবেই বিস্মিত করেছে, অবশ্য এই দুই গোষ্ঠীর আচারানুষ্ঠানের মাহাত্ম তার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঠেকেছে।
হোপিরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের জন্য অনেক সময় ব্যয় করে যা সময়ের অপচয় বলে মনে হতে পারে। হিসাব করে দেখা গেছে বছরের প্রতি তিন দিনে এক দিন তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে ব্যয় করে। কোন আচারানুষ্ঠান এক বার শুরু হলে তিন দিনের আগে থামতেই চায় না। সপ্তাহ বা মাস ব্যাপী অনুষ্ঠানও আছে। তাদের সবগুলো অনুষ্ঠানই বৃষ্টিকেন্দ্রিক। বিষয়টা খুব স্বাভাবিক। চাষের জমিতে সেচ দেয়ার মত কোন প্রযুক্তি না থাকায় কেবল বৃষ্টির উপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। এজন্যই বৃষ্টি নিয়ে এতো বন্দনা। তাই হোপিদের উপাসনাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায় না। সাধারণ একজন ব্যক্তি সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করছে, বিষয়টা এমন নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে তাদের প্রাত্যহিক জীবন।
ক্রো ইন্ডিয়ানরাও ধর্মের প্রতি খুব একনিষ্ঠ। এই দুই গোষ্ঠীই ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান পালনে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করে, হোপিরা বোধহয় একটু বেশি। কিন্তু এদের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। হোপিদের কাছে উপাসনার ভাবগত দিক খুব একটা প্রাধান্য পায় না। কিন্তু ক্রো-দের বসবাস ভাবের জগতে। ক্রোদের অতিপ্রাকৃতের সাথে মুখোমুখী যোগাযোগ লোভিকে সর্বাধিক বিস্মিত করেছিল। তারা হরহামেশাই এমন যোগাযোগ স্থাপন করে। তাই ক্রো এবং হোপি-দের মধ্যে যে পার্থক্য তাকে একটি প্রতিষ্ঠিত চার্চ ও সাধারণ ইভানজেলিজ্‌মের মধ্যে পার্থক্যের সদৃশ বলে চালিয়ে দেয়া যায়।

আদিবাসীদের এই ধর্ম পালন আমাদেরকে আদিম মানুষের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি ধর্ম তাদের জীবনের কতটা অংশ জুড়ে ছিল। এটাই স্বাভাবিক, কারণ যারা ঈশ্বর ও পরকালে বিশ্বাস করে তাদের এছাড়া কোন উপায় নেই। ক্রো জনগোষ্ঠীর লোকেরা এটাকে ঐশ্বরিক যোগাযোগের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। লোভি বলেন,

“ক্রোদের জীবনের প্রতিটি কাজ ধর্ম অনুযায়ী সম্পাদিত হয় বললে হয়তো অত্যুক্তি করা হবে, কিন্তু এটা সত্য যে তাদের জীবনের প্রতিটি হতাশা ও কষ্টের সাথে ব্যক্তিগত ঐশ্বরিক যোগাযোগ রূপে ধর্মের উপস্থিতি থাকে।”

অর্থাৎ তাদের জীবনের যেখানেই হতাশা ও ব্যর্থতা সেখানেই ধর্ম। এই হতাশা ও ব্যর্থতাকে কিন্তু জীবনের অর্ধেক বলা যায়। তাহলে ধর্মকেও কি অর্ধেক বলতে হবে? না, ধর্ম তাদের জীবনে অর্ধেকেরও বেশি। তারা মনে করে, জীবনের সকল সফলতাই ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আসে। আর কেউ ব্যর্থ হলে ধরে নিতে হবে, তার কোন ঐশ্বরিক দূরদৃষ্টি নেই। এজন্য ব্যর্থ মানুষ মাত্রই সফল কারও কাছ থেকে কোন নিদর্শন নেয়। এই নিদর্শনের মাধ্যমে হয়তো কোন সফলতা আসে তার জীবনে। এভাবেই তার ঐশ্বরিক যোগাযোগের সূচনা ঘটে। ক্রো গোষ্ঠীর বৃদ্ধরা সবকিছু এভাবেই বর্ণনা করল লোভির কাছে। লোভির এক খ্রিস্টান বন্ধু তাকে এ সম্বন্ধে বলেছিল, “বৃদ্ধদের কাছ থেকে যখন এরকম কথা শোন তখন চোখ বন্ধ করে তোমাকে বিশ্বাস করে যেতে হবে।” আসলেই তো, এখানে সবকিছুই বিশ্বাসের। এর বাইরে কিছুই নেই। কিন্তু এভাবে বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হয়। তাই বিশ্বাসের জন্য কিছু যুক্তি দেয়া ভাল। অতিলৌকিক ঘটনা ঘটা বা তা বর্ণনার সময় এই লোকেরা যে সচেতন ছিল তার পেছনে অন্তত ৪টি যুক্তি আছে।
১। একজন সাদা মানুষের কাছে তারা কেন মিথ্যা বলবে? কারণ তারা তো জানেই, তাদের গল্প যত অবিশ্বাস্য হবে সাদা মানুষেরা তা ততই কম বিশ্বাস করবে।
২। তারা যে ধরণের দৃষ্টি অর্জন করে তা শুধুমাত্র হেঁয়ালির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তারা এরকম ঐশ্বরিক যোগাযোগের জন্য দুর্গম পাহাড়ের উপর চলে যায়। সেখানে চারদিন অবস্থান করে, নিজেকে কষ্ট দেয়। এটা কোন পুরাণ নয়, কারণ লোভি নিজেই এরকম ঘটনা দেখেছেন। নিছক হেঁয়ালির উপর এটা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
৩। যদি ধরেও নেয়া যায় যে, সফলতা অর্জনের আশায় সে নিজেই নিজের মধ্যে একটা স্বপ্ন বা হেঁয়ালির জন্ম দিয়েছে; তারপরও কথা থেকে যায়। কারণ, সেক্ষেত্রে ফিরে আসার পর তার সফলতার সম্ভাবনা থাকতো না, প্রশংসিত হওয়ার বদলে সে নিজের সম্মান হারাতো।
৪। অতিপ্রাকৃতের কাছ থেকে কোন পুরস্কার পেয়ে অনেকেই সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তাদের উপর নতুন বাধানিষেধ আরোপিত হয়েছে। যোগাযোগের সময় ঈশ্বর তাদেরকে একটি নিষেধাজ্ঞা দেন। এটা মেনে না চললে সে আবার ব্যর্থ হবে। লোভি এক বৃদ্ধকে দেখেছেন যে এ কারণে ঐশ্বরিক যোগাযোগের পর দিন থেকে কখনও ঘোড়ায় চরেনি।
সুতরাং এরকম দৃষ্টি অর্জন হেলা করার মত না। এই আচারানুষ্ঠান ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আর সমাজকে প্রভাবিত করে।

এবার বিশ্বের সাধারণ মানুষদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক যাদের পূর্বপুরুষরা এক সময় এমনই ছিল। এই সমাজেও ব্যক্তিগত চিন্তাধারা সমাজকে প্রভাবিত করে। আর এখানেও ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপাদান হল ধর্মীয় অনুপ্রেরণা। নিরাপত্তা ও নির্বাণের আশায় অধিকাংশ মানুষই ধর্মকে পুষে রাখে। কিন্তু তাদের ধর্মানুভূতির প্রকাশ আদিবাসীদের মত অতো স্পষ্ট হয় না। সে হিসেবে ধর্ম সমাজের অন্যতম ঐক্য আনয়নকারী হিসেবে কাজ করে। অবশ্যই ধর্ম সমাজ একাঙ্গীকরণের একমাত্র চালিকা শক্তি না। সঙ্গীত, শিল্প বা বিজ্ঞানও সে ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কে পালন করবে তা নির্ভর করে ঐ সমাজের মানুষ কার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে তার উপর। এটা ধ্রুব সত্য যে, বিজ্ঞান, শিল্প বা সঙ্গীতের সাথে মিশে যেতে পারে এমন মানুষ সমাজে বেশি নেই। সমাজের অধিকাংশ মানুষই এখন পর্যন্ত ধর্মের সাথে একাত্মতা পোষণ করতে পারে। এ ধরণের সমাজে একাঙ্গীকরণের দায়িত্ব ধর্ম ছাড়া আর কে-ই বা পালন করবে। লোভি বলেন,

“সাধারণ মানুষের জন্য সমাজ একাঙ্গীকরণের চালিকা শক্তি হিসেবে এখনও ধর্মের বিকল্প নেই। এই ধ্রুব সত্যটি কেবল ধর্মের অস্তিত্বই ঘোষণা করে না, একই সাথে এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে ফুটিয়ে তোলে।”

এবার দেখা যাক ধর্মকে ঝেড়ে ফেলে সমাজ কতটা একীভূত হয়ে উঠতে পারে। এমন একটা সমাজের কল্পনা করতে হবে যেখানে ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাৎসি জার্মানিই এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ। হিটলার খ্রিস্টান হওয়ার কারণে ইহুদি বিদ্বেষী ছিলেন না। কারণ সভ্য খ্রিস্টান কখনও ইহুদি নিধনকে স্বীকৃতি দিতে পারে না। তার এই চেতনার মূলে ছিল যুবক বয়স থেকে তিল তিল করে গড়ে উঠা চেতনা যা তাকে বলেছিল, ইহুদিরাই জার্মানদের সর্বশক্তিমান হয়ে উঠার পথে প্রধান অন্তরায়। আর জার্মানদের সর্বশক্তিমান হতে হবে এবং পুরো বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে জার্মানরা এ ধরণের চেতনা হিটলার পেয়েছিলেন ইউজেনিক্স থেকে। তিনি মনে করতেন জার্মানদের চেয়ে সভ্য ও উন্নত আর কেউ নেই। এভাবেই হলোকাস্টের সূচনা। হলোকাস্ট অবশ্যই ধর্মবিরোধী। খ্রিস্টান চার্চ হলোকাস্ট বা হিটলারের কুশাসন মেনে নিতে পারেনি। হিটলার নিজের চিন্তাধারার বিরোধী কোন পক্ষকেই টিকিয়ে রাখতে চাননি যার মধ্যে ধর্মপ্রচারকরাও পড়তেন। সংগঠিত ধর্মকে উপড়ে ফেলে নিজের ইউজেনিক্স কেন্দ্রিক নাৎসিবাদকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি “ইয়ুথ গ্রপ” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যরা উদ্দেশ্য ছিল, এমন যুব সমাজ গড়ে তোলা যাদের মধ্যে প্রথাগত ধর্মের প্রতি আনুগত্য থাকবে না। কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নেও এ ধরণের ধর্মহীন শিক্ষা প্রচলিত ছিল। কোন গ্রামের মানুষকে ধর্ম পালন থেকে বিরত রাখার একটি মোক্ষম উপায় হল, সেখান থেকে একটি শিশুকে ছিনিয়ে নেয়া এবং তাদেরকে বলে দেয়া, কেউ যদি ধর্ম পালন করে বা কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সাহায্য করে তাহলে শিশুটিকে মেরে ফেলা হবে। জার্মানির মত খ্রিস্টান রাষ্ট্রে হিটলার কিভাবে এই নীতি প্রয়োগ করেছিলেন তা বেশ দুর্বোধ্য। এভাবে সমাজ থেকে ধর্ম সরিয়ে নিলে কি হতে পারে তা লোভির ভাষায় বললে দাড়ায়:

“ধর্ম উধাও হওয়ার সাথে সাথে সমাজ থেকে নৈতিক মানদণ্ডও উধাও হয়ে যায়। সেই সমাজে যে কেবল ধর্ম থাকে না তা নয়, কোন সাধারণ বাধা সৃষ্টিকারী নীতিও থাকে না। কোন জাতি ধর্ম বাদ দিয়ে নৈতিকতা ধরে রাখতে পারবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”

হিটলার কতটা ধর্মবিরোধী ছিলেন তা নিয়ে বিস্তারিত চিন্তা করার অবকাশ আছে। কিন্তু এটা প্রায় নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং যুদ্ধে বিধ্বস্ত সৈনিকরা ধর্মের দারস্থ হতে বাধ্য হত। জার্মানি-অস্ট্রিয়া-পোল্যান্ড অঞ্চলের খ্রিস্টান চার্চও হিটলারের নীতিকে মেনে নিতে পারেনি। “দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক” সিনেমাতে চার্চের মাদার নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে “মারিয়া ফন ট্র্যাপ” পরিবারকে পালাতে যেভাবে সাহায্য করেছিলেন বাস্তবতা তেমনই ছিল কি-না জানি না, তবে সিনেমা তো বাস্তবতারই প্রতিফলন। নাৎসিদের ধর্মনাশ নিয়ে লোভি যা বলেছেন তা বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।

রবার্ট লোভি এরপর ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। গত ১০০ বছর ধরে এই সংঘাত ক্রমেই জোড়ালো হচ্ছে। তবে লোভি মনে করেন, এই সংঘাত মাত্র কয়েকটি বিষয় নিয়ে, বিজ্ঞানের সামগ্রিক শিক্ষার কথা চিন্তা করলে যা খুবই নগণ্য। তাই “স্বতন্ত্র বলয়” মেনে নিলেই বিষয়টা চুকে যায়। স্বতন্ত্র বলয়ে প্রথমে বলা হয়েছে ধর্ম ও বিজ্ঞান সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক ক্ষেত্রে আলোচিত হবে, একে অন্যের পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করবে না। পাশাপাশি কে কোন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করবে তাও বলে দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র বলয়ের প্রবক্তা স্টিফেন জে গুল্ড। এই কাজটা না করলে সম্ভবত তিনি আরও কম সমালোচিত হতেন। কেবল স্বতন্ত্র বলয়ের বিষয়টি মেনে নিলেই সব সংঘাত চুকে যায়। আর কে কোন বলয়ে থাকবে তা সমাধান করাও কঠিন নয়। কারণ বলয় ইতোমধ্যে ঠিক হয়েই আছে। তাই বর্তমানে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সংঘর্ষ নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে। তাই সব ঝেড়ে ফেলে এই একটি বিষয় দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। লোভির মতে, বিজ্ঞান কখনই নৈতিকতা ঠিক করে দিতে পারে না। নিজের মত করে কিছু বলার আগে লোভি কি বলেছেন তা-ই বলে নেয়া যাক।

লোভি প্রথমেই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অস্থিতিশীলতার কথা বলেছেন। তার মতে বিজ্ঞানের সব তত্ত্বকেই অনুকল্প (হাইপোথিসিস) বলা যায়। কারণ সবগুলোই অপেক্ষাকৃত ভাল কোন অনুকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি মানুষের আরেকটি ভুল ধারণার উল্লেখ করেছেন। অনেকেই মনে করে, বিজ্ঞান সমাজ এবং অর্থনীতির ঊর্ধ্বে। কিন্তু লোভি বলেন, বিজ্ঞানীরা কোন আইভরি টাওয়ারে বাস করেন না, তারা এই সমাজেরই মানুষ, এই সমাজের অর্থনীতিই তাদের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে। তাই সমাজ ও বিজ্ঞানের মধ্যে নিবিঢ় সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞানীদেরও একটা সমাজ আছে যা অনেক সময় অপেক্ষাকৃত ভাল তত্ত্বের স্বীকৃতি দেয় না। যেমন উইলিয়াম হার্ভে যখন রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছিলেন তখন, বিজ্ঞানী মহল তাকে হাতুড়ে ডাক্তার আখ্যা দিয়েছিল। এর পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে অনেক সময়ই ভুল ধারণা বিকশিত হয়ে উঠে, তবে অবশ্যই ভুল শোধরানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানই সবচেয়ে এক্সপার্ট। লোভির এই কথাগুলোকে বিজ্ঞানের জন্য খুব কট্টর বলে ধরে না নিলেও চলে। কারণ তিনি এগুলো বলেছেন বিজ্ঞানকে ধর্মের সমতলে নামিয়ে আনার জন্যই। মূল কথা বলেছেন এর ঠিক পরেই।

বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়েই বোধহয় ঠিক কথা বলছে, কিন্তু তারা যে ব্যক্তিদের নিয়ে বলছে বা যে সমস্যার সমাধান করছে সে ব্যক্তি ও সমস্যাগুলোই আসলে ভিন্ন। একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারও যদি ডায়াবেটিস থাকে তাহলে ধর্মের দারস্থ হয়ে কোন লাভ নেই। কিন্তু কেউ সাইকোসোমাটিক হলে আবার বিজ্ঞানের কাছে গিয়েও লাভ নেই। সাইকোসোমাটিক বলতে হতাশা থেকে উদ্ভূত একটি সমস্যাকে বোঝায়। লোভি তার এক ভাইয়ের উদাহরণ টেনে বুঝিয়ে দেন, কিভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস তাকে সুস্থ করে তুলেছিল। এ বিষয়ে তার শেষ কথা ছিল:

“সাধারণ মানুষ কেবল এমন একটি সমাধান চায় যা সত্যিকার অর্থেই কাজে দেবে। সেই সমাধান তৈরী করতে গিয়ে গণনায় কি পরিমাণ ভুল হয়েছে বা তা আদৌ কার্যকরী কি-না এ নিয়ে তারা বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামায় না।”

অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ম এমন একটি কার্যকরী সমাধান দিতে পারে।

এসব কারণেই লোভি স্পষ্ট করে বলে দেন, একজন সাধারণ মানুষ কখনই ধর্মের বদলে বিজ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক ডোরিস লেসিং সত্যমুখী দর্শনের জয়গান গেয়েছেন। তার মতে,

“সত্যকে অর্জন না করে আজীবন তার জন্য সংগ্রাম করে যাওয়াই সর্বোত্তম।”

কিন্তু লোভি মনে করেন, সাধারণ মানুষের কাছে লেসিংয়ের এই দর্শনের কোন গুরুত্ব নেই। তাই সাধারণ মানুষ সত্যকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, তার জন্য সংগ্রাম করতে চায় না। সে এ ধরণের সত্যের কাছ থেকে শান্তি, নিরাপত্তা ও আয়েশ চায় যা বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে কখনই আসতে পারে না। কারণ বিজ্ঞান নিজেই প্রচণ্ড গতিশীল, প্রগতিশীল ও বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। আর্নস্ট মাখ বিজ্ঞানের এই বৈশিষ্ট্যকে এভাবে তুলে ধরেছেন:

“বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ দর্শন হল বিশ্বের একটি অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে চলা এবং এই বয়ে চলাকে আপাত সম্পূর্ণ কিন্তু অপর্যাপ্ত বিশ্ব দৃষ্টির (ধর্ম) চেয়ে উত্তম বলে আখ্যায়িত করা।”

বিজ্ঞানের প্রকৃত দর্শন এটাই। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই বিজ্ঞানী নন। তাই তাদের পক্ষে এই দর্শন মেনে চলা সম্ভব না। তাদের পক্ষে কি সম্ভব তার একটি সুন্দর নিদর্শন পাওয়া যায় গ্যোটের কবিতাতে:

Wer Wissenschaft und kunst besitzt
Hat auch Religion;
Wer jene beiden nicht besitzt,
Der habe Religion.

যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈসর্গিক উদ্দ্যেশ্যকে তাড়া করার কাজে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে
তার উৎসাহই তার ধর্ম হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এই তাড়া করার কাজে জড়াতে না চাইলে
প্রথাগত ধর্মের উপর নির্ভর করে চলাই উত্তম।

এভাবে প্রবন্ধের শেষ প্রান্তে চলে আসেন লোভি। এ পর্যায়ে এসে তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, বিজ্ঞান মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। ধর্মের পক্ষেই কেবল চূড়ান্ত নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব। সবশেষে বলেন:

“যতদিন প্রকৃতির উপর যুক্তিযুক্ত নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের জৈব-মনোবৈজ্ঞানিক চালিকাশক্তির মধ্যে ব্যবধান থাকবে ততদিন বিশ্বাসেরও স্থান থাকবে। এই বিশ্বাস শুধু আয়েশই দেয় না সাথে নিরাপত্তা জোগায়; সম্ভাব্যতার বদলে নিশ্চয়তা প্রদান করে। তাই বলা যায়, ধর্ম ও বিজ্ঞান মানুষের জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের দুটি কাজ করে এবং এই দুয়ের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটতেই হবে এমন কোন কথা নেই।”

এতটুকু জানার পর ধর্ম নিয়ে চূড়ান্ত কোন মন্তব্য করার চেষ্টা করা যেতে পারে। ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে?
এই উত্তর দেয়ার আগে জানতে হবে কার বা কিসের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। যদি কোন মানুষের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয় তাহলে আমি প্রথমত গ্যোটের কবিতার সাথে একমত। অর্থাৎ যারা প্রথাগত ধর্মের বাইরে অন্য কিছুকে (বিজ্ঞান বা শিল্প-সাহিত্য) সমাজে বসবাসের জন্য তার চালিকাশক্তি হিসেবে খুঁজে পেয়েছে তার জন্য সেটাই সর্বোত্তম ধর্ম। কিন্তু যে সেটা খুঁজে পায়নি তার জন্য প্রথাগত ধর্ম মেনে চলাই উত্তম। কিন্তু, এই প্রথাগত ধর্মের কথা বললে তার মধ্যে গোঁড়ামিও এসে যায় যা অন্য ধর্মের সাথে বিরোধের সৃষ্টি করে। এই গোঁড়ামি এড়ানোর জন্য ডোরিস লেসিংয়ের মত আমিও বলব, সত্য বলে কোন কিছুকে ইচ্ছাকৃতভাবে মেনে নেয়ার চেয়ে বরং সত্যের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া ভাল। কারণ সত্যানুসন্ধানী কোন ব্যক্তির পক্ষে গোঁড়া হওয়া সম্ভব নয়। সে, সমাজে স্থান করে নেয়া এবং শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই কেবল ধর্ম পালন করবে।
এবার সমাজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা যায়। রবার্ট লোভি তো বলেই দিয়েছেন, মানুষের জীবনে যেহেতু এখনও ধর্মের স্থান আছে সেহেতু সমাজেও এর প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু সেটা ১৯৬৩ সালের কথা। তখনও বিজ্ঞান এতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আর তখন বিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত প্রযুক্তির ব্যবহারও ছিল সীমিত। গত ৪০ বছরে সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে আর ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে। ধর্মের প্রভাব হ্রাসের আরেকটি কারণ শিল্প ও সাহিত্যের প্রভাব বৃদ্ধি। প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণেই শিল্পের এই প্রসার ঘটেছে যার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ চলচ্চিত্র। এই পরিস্থিতিতে কেউ কি বলতে পারে, সমাজ জীবনে ধর্মের কোন প্রয়োজন নেই। এর উত্তর বিভিন্ন সমাজের জন্য বিভিন্ন রকম। কোন সমাজ ধর্মহীনতার দিকে এগোচ্ছে আর কোনটি এগোচ্ছে না তাও গবেষণার বিষয়। এই গবেষণার জন্য নৃবিজ্ঞানের বিকল্প নেই।
পরিশেষে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা আসে। সেক্যুলারিজ্‌ম তথা ধর্মনিরপেক্ষতা বা ইহজাগতিকতা বিকশিত হওয়ার পর আমরা ধরেই নিতে পারি, রাষ্ট্রে ধর্মের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। সেক্যুলারিজ্‌ম অর্থই হল, রাষ্ট্র ধর্মহীন থাকবে এবং ব্যক্তি বা সমাজ ধার্মিক না ধর্মহীন তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। তাই বলা যায়, এই যুগে রাষ্ট্র চালনার একমাত্র সমাধান সেক্যুলারিজ্‌ম।

সেক্যুলারিজ্‌ম মেনে নিয়ে তো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিরাজমান প্রায় সব সমস্যার সমাধানই করা গেল। কিন্তু বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সংঘাতের কি হবে? আগেই বলেছি, ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত সমাধানের প্রাথমিক উপায় “স্বতন্ত্র বলয়”। কিন্তু এই প্রাথমিক সমাধান বর্তমান যুগের সংশয়বাদী ও নাস্তিকদের মতের বিরুদ্ধে যায়। তাদের মতে, ধর্ম নৈতিকতার মানদণ্ড হতে পারে না। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের একমাত্র সংঘাত হল, বিজ্ঞান ধর্মকে নৈতিকতার মানদণ্ড হতে দেবে কি-না। এরও সমাধান আছে। তা হল নৈতিকতার অন্য কোন মানদণ্ড তৈরী করা এবং তার ভিত্তিতে সমাজকে গড়ে তোলা। সেই প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত ভালভাবে শুরু হয়নি। হলে তা দর্শন দিয়েই হবে। স্পিনোজার নীতিশাস্ত্র হয়তো আবার ফিরে আসবে। কিংবা সেই নীতিশাস্ত্রেরই কোন আধুনিক রূপ ধর্মের স্থান করে নেবে। তখন কি ধর্মের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে? এটা আমি বলতে পারব না। বরং পাল্টা প্রশ্ন করতে পারব, ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে যাবার মত? আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আছি। কারণ আমাদেরকে এমন একটি প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করতে হবে। আমি এখন পর্যন্ত এর জবাব খোঁজার চেষ্টা করিনি। তাই সরাসরি কোন উত্তর দিতে চাই না। অভিজিৎ রায়ের মত বলতে চাই, “Let the data decide”।

6 Responses leave one →
  1. 2008 জুন 22

    প্রবন্ধটা লিখে বেশ মজা পেয়েছি। তবে আমি নিজেই এটাকে সার্থক প্রবন্ধ বলব না। কারণ রবার্ট লোভির প্রভাবে অনেক কিছু মলিন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলেছি। রবার্ট লোভির লিংকটা কাজ করছে না। তাই বাংলা উইকিপিডিয়াতে তার জীবনীর লিংকটা এখানে দিয়ে দিলাম:

    http://bn.wikipedia.org/wiki/রবার্ট_লোভি

  2. 2008 জুন 22
    rahim permalink

    mia, tumi ki vandami suru karso naki? mia. fatramir ar jayga pao na? emun mair dimu je haga bair hoi jaibo.

  3. 2008 অক্টোবর 6
    Spiderlily permalink

    Dear Muhammad,
    It’s really excellent writing. If we want to keep Robert H Lowie’s view in our society that’s Religion and Science should keep Parallel way in our life, we can’t do it. For instant, If I say to general public to believe a law of science whatever that law is helpful or not, They don’t feel pressure themselves. But if we say about religious law, they will feel pressure to follow themselves otherwise after death they will be punished.
    I can give you clear example, if we tell a normal people that our earth moves round the sun, again if we say, but our religion opposes it. Most of the people will accept the religious myth what ever there is any logic or not. Let’s one village person, his names G Azom, he was in cultural program and he heard we should help all kind of people whoever he or she Muslim, Hindu or any other religion. After finish the program, he went to Mosque and he heard from Imam that Qur’an says, every Muslim should avoid or kill to other religion, if someone don’t do it, he just ignored the Qur’anic law, and he is called Kafer , he will be serious punished by Allah. Mr Muhammad, do you think , Azom can follow both Science and Religion follow?

  4. 2008 অক্টোবর 8

    Spiderlily,

    আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। বিষয়টা ভাবার মত। আমাদের সমাজে এখনও মানুষ ধর্মের কথা বেশী গুরুত্ব দেয়। কিন্তু মুক্ত শিক্ষা যকই বিকশিত হতে থাকে এই ঝোক ততই কমতে থাকে।
    ভবিষ্যতে যখন শিক্ষার এই পশ্চাদপদতা থাকবে না তখন মানুষ বিজ্ঞানকেই মেনে নেবে। কারণ, বিজ্ঞান প্রমাণ দেয়। মানুষ প্রমাণ চায়।
    আর ধর্ম যে এক ধরণের কুসংস্কার তা এখন অনেকেই বুঝতে পারছে।

  5. 2009 মার্চ 25
    prince47 permalink

    লেখাটা ভালো লেগেছে।
    রবিন

  6. 2009 মার্চ 25

    জেনে ভাল লাগল রবিন ভাই।

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS