প্রকৃতিতে প্রথম অতিভারী মৌল
মাধ্যমিক পর্যায়ের রসায়ন বইয়েই আমরা সবাই পড়ে থাকি যে, সর্বমোট মৌলিক পদার্থের সংখ্যা ১০৯ টি যার মধ্যে ৯২টি প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এবং বাকি ১৭টি নিউক্লীয় চুল্লীতে কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করতে হয়। তখন পর্যন্ত পর্যায় সারণী ১০৯ মৌলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ১১৮ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ১১১ থেকে ১১৮ পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট মৌলগুলো গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করেছেন। ৯০ থেকে ১০৯ পর্যন্ত মৌলগুলোকে ভারী মৌল বললে, ১০৯ এর পরের গুলোকে স্বাভাবিক কারণেই অতিভারী মৌল বলা যেতে পারে।
সমস্যা হল অতিভারী মৌলগুলো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। কৃত্রিমভাবে তৈরী করা হলেও তারা হয় ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, খুব বেশিদিন টিকে না থাকলেও তাদের জীবনকাল একেবারে কম নয়। অর্থাৎ তৈরীর পর বেশ কিছু সময় টিকে থাকে তারা। এটাই প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিতে অতিভারী মৌলগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারে। যদি থেকেই থাকে তাহলে আমরা তাদের খুঁজে পাচ্ছি না কেন? এই প্রশ্নই ছিল সবার মনে। এখন মনে হচ্ছে, আমরা সেই অতিভারী মৌল খুঁজে পেয়েছি।
হিব্রু ইউনিভার্সিটি অফ জেরাজালেমের বিজ্ঞানী আম্নন মারিনভ এবং তার গবেষণা দল একটি অতিভারী মৌল খুঁজে পেয়েছেন। এতোদিন ধরে এই পৃথিবীতেই ছিল, কিন্তু আমাদের খুঁজে পেতে দেরী হয়েছে। ভারী থোরিয়াম ধাতুর মধ্যকার রাসায়নিক উপাদানগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা নতুন এই মৌলের সন্ধান পেয়েছেন।
তারা যা করেছেন তা হল একটার পর একটা থোরিয়াম কেন্দ্রিনকে ভর বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করিয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা দেখেছেন কোন কেন্দ্রিনের মধ্যে কি আছে। থোরিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ৯০ এবং এর দুইটি সমাণুক রয়েছে যাদের পারমাণবিক ভর যথাক্রমে ২৩০ ও ২৩২। তারা মূলত থোরিয়ামই পেয়েছেন। সাথে এদের কিছু অক্সাইড ও হাইড্রাইড অণু পাওয়া গেছে। কৌশলগত কারণে অন্যান্য কিছু জিনিসও পাওয়া গেছে যেগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না।
সবশেষে তারা এক অবিস্মরণীয় মৌলের সন্ধান পেলেন। এই অতিভারী মৌলটির পরমাণবিক সংখ্যা ১২২ বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এর পারমাণবিক ভর ২৯২। এতোদিন ধরে প্রকৃতিতেই তা বিরাজমান ছিল, আমরা খোঁজ পাইনি। এই অতিভারী মৌলের অর্ধায়ু প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর এবং এর প্রাকৃতিক প্রাচুর্যতা থোরিয়ামের তুলনায় ১ থেকে ১০*১০ই-১২ এর মধ্যে। থোরিয়াম বেশ সহজলভ্য মৌল যার প্রাচুর্য সীসার কাছাকাছি।
এই নতুন মৌল বিজ্ঞান জগতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছে। প্রমাণ করেছে, প্রকৃতিতে আরও অতিভারী মৌল থাকতে পারে। আমাদের সেগুলো খুঁজে নিতে হবে। ইতোমধ্যে পর্যায় সারণীতে একে স্থান দেয়া হয়ে গেছে। সারণীতে এর অবস্থান হবে অষ্টম পর্যায়ের তৃতীয় বিশেষ শ্রেণীতে। এটাই অষ্টম পর্যায়ের প্রথম মৌল। একটা নামও ঠিক করা হয়েছে মিস্টার ১২২ এর জন্য: একা-থোরিয়াম বা আনবিবিয়াম।
আনবিবিয়ামকে আমাদের জগতে স্বাগতম জানাই।
এখন থেকে অতিভারী মৌলের সন্ধান কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। পরবর্তী টার্গেট অবশ্যই হবে ইউরেনিয়াম। কারণ অতিভারী অ্যাক্টিনাইডের পরবর্তী স্থানগুলো ইউরেনিয়াম থেকে পাওয়া কোন মৌলই দখল করতে পারে।
*****
# আরজিভ তথ্যভাণ্ডারের ব্লগে এ বিষয়ক খবর
# আরজিভ তথ্যভাণ্ডারে মারিনভ ও তার দলের মূল গবেষণাপত্র
রিচার্ড ফাইনম্যান বলতেন, মৌলিক পদার্থের সর্বোচ্চ পারমাণবিক সংখ্যা ১৩৭ হতে পারে। ১৩৭ এর পর আর কোন মৌল থাকবে না। কারণ এর পরের মৌলগুলোর পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ স্তরের ইলেকট্রনের বেগ এতো বেশী হবে যে তা আলোর বেগের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।
আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে আলোর চেয়ে কোন কিছুর বেগ বেশী হতে পারে না। তাই ১৩৭ এর পরে মৌল না পাওয়াটাই খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু সিবোর্গ আবার ১২১ থেকে ১৫৩ পর্যন্ত মৌলগুলো নিয়ে সুপার-অ্যাক্টিনাইড গ্রুপ তৈরী করেছেন। তার পুরো গ্রুপটাই অবশ্য ভবিষ্যৎবাণীর মত।
ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে ইতোমধ্যে নিবন্ধ তৈরী হয়ে গেছে এ নিয়ে। লিংকটা দিলাম:
- ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে আনবিবিয়াম
- বাংলা উইপিডিয়াতে আনবিবিয়াম
ঝামেলা আছে। “নেচার” এবং “নেচার ফিজিক্স” সাময়িকী এই গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যান করেছে। মারিনভদের গবেষণাপত্র কেবল আরজিভে প্রকাশিত হয়েছে, পিয়ার রিভিউ ছাড়াই। অনেকেই বলছেন, পিয়ার রিভিউয়ে এটা টিকবে না।
রয়েল কেমিক্যাল সোসাইটিও এর সমালোচনা করেছে। অনেকে বলছেন, এটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য তাদেরকে আরও অনেক প্রমাণ হাজির করতে হবে।