কণা কোয়ান্টাম থেকে তরঙ্গ: ১
ময়মনসিংহে আমাদের বর্তমান বাসা থেকে ২০০ গজ হাটলেই মুসলিম ইনস্টিটিউট লাইব্রেরি। অনেক আগে থেকেই তাই এই লাইব্রেরিতে যাতায়াত। একটি বিশেষ কারণে ময়শনসিংহ শহরের সরকারী গণগ্রন্থাগারে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলিম ইনস্টিটিউটে খুঁজতে খুঁজতে জনপ্রিয় বিজ্ঞানের উপর ভাল ভাল বেশ কিছু বই পেয়েছি। সবগুলো বই একসাথে জড়ো করে রেখেছি। একটা একটা করে ইস্যু করে পড়া যাবে। সবগুলো বইই প্রাচীন এবং বাংলাদেশের সাধারণ বই বাজারে বেশ দুর্লভ। এবার ইস্যু করলাম জর্জ গামফের “The Creation of The Universe” এর মোহাম্মদ আবদুল জব্বারকৃত অনুবাদ এবং রুশ লেখক ইয়া আ স্মোরোদিনস্কির একটি বইয়ের বঙ্গানুবাদ যার নাম “কণা কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ”।
ইংরেজি অনুবাদ থেকে কণা কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ বইয়ের বাংলা অনুবাদ করেছেন সুব্রত বড়ুয়া। আর মূল রুশ থেকে ইংরেজি অনুবাদটি করেছেন ভি কিজিন। রাশিয়া জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাহিত্য ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। এই বইটি পড়তে গিয়ে আবার প্রমাণ পেলাম। আর রুশ বইয়ের বঙ্গানুবাদও বেশী হয়েছে। এই বইটি থেকেই কিছু কিছু বিষয় নিজের ভাষায় লিখে রাখার চেষ্টা করছি এখানে।
নভোবস্তুসমূহের গতি
জন্ম থেকেই আকাশ দেখে বিস্মিত হয়ে এসেছে মানুষ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাদের এ বিস্ময় থেকে যুক্তির উদ্ভব না ঘটে উদ্ভব ঘটেছে অন্ধ বিশ্বাসের। আদিকাল থেকেই মানুষ মনে করতো যেকোন বস্তুর স্বাভাবিক গতিপথ হচ্ছে সরল রেখীয়। অন্য যেকোন ধরণের গতিপথের পেছনে কোন না কোন কারণ রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করতো। তারা এটাও বুঝতে পারছিল যে, আকাশ তথা স্বর্গের সব বস্তু বৃত্ত পথে গমন করে। তার মানে এই বৃত্তীয় গতির পেছনে কোন নির্দিষ্ট চালিকাশক্তি আছে। এই চালক থেকেই এসেছে অন্ধ বিশ্বাস।
এ কারণে কেপলারের সূত্র আসার পরও কেউ এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু প্রগতির কারণে একসময় আমাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। উপবৃত্তাকার পথে গ্রহের গতি এবং নিউটনের সাধারণ মহাকর্ষ তত্ত্ব এখন যেকোন স্কুল ছাত্রের কাছেও পরিষ্কার। আমরা কি আশা করতে পারি, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান এবং বিশেষত এর তরঙ্গ-অপেক্ষক বিষয়খ ধারণাও স্কুল ছাত্রদের কাছে এমন পরিষ্কার হয়ে যাবে, সাধারণ্য সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়ে এসে যাবে কোয়ান্টামের জগৎ?
অধিকাংশ লোকই মনে করেন এক সময় কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান সাধারণ বোধে পরিণত হবে। এর সকল সীমাবদ্ধতার সমাধান করা যাবে। কারণ বিজ্ঞানে কোন অতীতমুখীনতা নেই। সবসময়ই সে নবীনকে সাদরে গ্রহন করে এসেছে। এ সত্ত্বেও কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের একটি বিষয় নিয়ে খোলাসা করে আলোচনা করা উচিত।
একসময় আমরা ভাবতাম পৃথিবী একটা বিশাল তিমির উপর অবস্থিত, এই তিমিটি আবার বিরাট একটা কচ্ছপের পিঠে আছে যে কচ্ছপটা মহাসমুদ্রের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। তখন সাধারণ কেউ এই মহাসমুদ্রের সীমা বা এর কার্যকারণ নিয়ে ভাবতো না। গুটিকয়েক ব্যক্তি অবশ্য সবসময়ই ভেবেছে। বর্তমানেও এ ধরণের একটা ব্যাপার আছে। আমরা সবাই মহাবিশ্বের গঠনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। কিন্তু মহাবিশ্বের বক্রতা এবং এর সুনির্দিষ্ট অবয়বের বিষয়টা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন ঠেকে। আমরা তা বুঝি না এবং বুঝতেও চাই না।
পৌরাণিক কাহিনীর বিকাশে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে মানুষের অনুরূপতার ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী পার্থিব যেকোন জীবকে সরলরৈখিক মাত্রায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা যায়। এভাবে বৃদ্ধি করার মাধ্যমেই মানব মনে দৈত্য, বামন বা গালিভারের জন্ম হয়েছে। নীতিগতভাবে গালিভারের ভ্রমণের কোন বিরোধিতা করা যায় না। কিন্তু মানুষকে কখনও সরলভাবে তথা তার সকল অঙ্গের সরলরৈখিক মাত্রায় ১২ গুণ বৃহদাকৃতির করা যায় না, এই যুক্তি চলে আসে। তখন এই যুক্তিকেই সবার কাছে স্ববিরোধী মনে হয়।
পৃথিবীতে অনুরূপতার কোন স্থান নেই, এটা প্রথম উপলব্ধি করেন গ্যালিলিও। তার “Dialogue On Two New Sciences” বইয়ে বলেন:
যদি কোন মানুষ বা জন্তুর আকৃতি আনুপাতিক হারে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয় তাহলে তারা আমাদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারবে না। যুক্তি অত্যন্ত সহজ। যদি দেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বিগুণ বর্ধিত করা হয় তবে দেহের ওজন বাড়বে ৮ গুণ। এতো ওজনের কারণে হাড়গুলো ভেঙে পড়বে। সমপরিমাণ শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য হাড়গুলোর প্রস্থচ্ছেদ চতুর্গুণ নয় বরং ৮ গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। অতএব কোন জন্তুর আকার বৃদ্ধি করতে হলে একই সঙ্গে ত আরও মোটা ও পুরু হয়ে পড়বে।
এই আবিষ্কার অতি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হল, পৃথিবীর সকল কিছু সবচাইতে অনুকূল আকৃতি অর্জন করে। মানুষের উচ্চতার ভিন্নতা আছে, কিন্তু গড় উচ্চতার তুলনায় তার ভিন্নতার ব্যাপ্তি মাত্র ২০ শতাংশ। মহাকর্ষ বলের কারণেই এই অনুকূলতার উদ্ভব। এ কারণেই পহাড়গুলো যথেচ্ছভাবে উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়নি, আবার মহাসমুদ্রও যথেচ্ছ গভীরতা প্রাপ্ত হয়নি।
মহাবিশ্বে দৃশ্যমান বস্তুগুলোর আকৃতিতে পার্থক্য আছে। কিন্তু ইলেকট্রনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আজ পর্যন্ত কেউ দুটি ইলেকট্রনের মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায়নি। এরও নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। দৃশ্যমান বস্তুগুলোর আকার-আকৃতি যেমন মহাকর্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে তেমনি ইলেকট্রনের এই নির্দিষ্ট আকার-আকৃতিও নিশ্চয়ই সেই অতিক্ষুদ্র জগতের কোন কারণ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। এখান থেকেই ভিন জগতের চিন্তার সূচনা।
এখানে একটা সমস্যা আছে। এই কোয়ান্টাম জগতের অনুরূপতার সূত্র তো অন্যরকমও হতে পারে। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানে যে অসুবিধাগুলো আছে প্রচলিত অনুরূপতার ধারণা ভেঙে পেলাই কি তার কারণ? তা হলে আমাদেরকে একেবারে ভিন্ন সব সূত্র তৈরী করতে হবে। কারণ ভিন্ন অনুরূপতাতে প্রকৃতির সব সূত্রগুলোও ভিন্ন হয়ে পড়ে। এই সাধারণ ধারণা থেকেই আমাদের কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান চর্চার শুভ সূচনা।
স্বল্প দূরত্বে কি ঘটে?
প্রকৃতির সবকিঝুই পরমাণু তথা এটম দ্বারা গঠিত, প্রাচীন গ্রিসেই এই চিন্তা ছিল। আরিস্ততলের প্রভাবে এটা চাপা পড়ে গেলেও উনবিংশ শতকে তা আবার প্রাধান্য বিস্তার করে। অষ্টাদশ শতকে ধারণা ছিল সবকিছুর গাঠনিক একক হচ্ছে “মোনাড” যার বিশেষ কোন ধর্ম নেই। কিন্তু উনবিংশ শতকে পরমাণু তত্ত্ব বিস্তার লাভ করে এবং এর মাধ্যমে সবকিছু ব্যাখ্যা করে সফলতা পাওয়া যায়। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, সবকিছু পরমাণু দিয়ে গঠিত হলে পরমাণু কি দিয়ে গঠিত?
সৌর জগতের মতই পরমাণুর একটা কাঠামো আছে যেখানে কেন্দ্রীনকে ঘিরে ইলেকট্রন আবর্তিত হয়। এই মতবাদ অনুরূপতার নীতির সাথেও মিলে গেল। প্রাচীনকালে যেমন, মহাসমুদ্র নিয়ে সবাই নিরব থাকতো, তেমনই এই নিদর্শ (মডেল) নিয়ে অনেককাল সবাই নিরব থাকলো। কেউ প্রশ্ন করলো না, ইলেকট্রন বা প্রোটন কি দিয়ে গঠিত। ইলেকট্রন বা প্রোটনের গঠন অনেক পরের বিষয়, তারও আগে এই নিদর্শ বাতিল হয়ে গেল। চিরায়ত বলবিজ্ঞান অনুসারে, কেন্দ্রীনের চারপাশে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক ইলেকট্রন অবশ্যই তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ নিঃসরণ করবে এবং এক সময় কেন্দ্রে পতিত হবে। এভাবে গোটা নিদর্শটাই ভেঙে পড়বে।
১৯১২ সালে রাদারফোর্ডের গবেষণাগারে পরমাণুর গ্রহীয় নিদর্শ আবিষ্কৃত হয়। নিল্স বোর এখানে আমন্ত্রিত হন। কেপলারের সমস্যাটি পেছনে ফেলে এ নিয়ে কয়েক বছর ব্যয় করেন। এটি রক্ষার জন্য তাকে এমন সব শর্ত নয়ে আসতে হয় যা চিরায়ত বলবিজ্ঞানের জন্য অবমাননাকর। কিন্তু চিরায়ত’র বিরোধিতা করায় আপেক্ষিকতাকে যেমন তিক্ত পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়েছিল কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। কারণ, সৌভাগ্যবশত কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান সবার অলক্ষ্য ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।
এরপর ১৯২৬ সালে হাইজেনবার্গের কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান এবং শ্র্যোডিঙারের তরঙ্গ বলবিজ্ঞান প্রকাশিত হয়। এর হাত ধরেই দৃঢ় ভিত্তির উপর দাড়িয়ে যায় নতুন এই বিজ্ঞানটি।