রহস্যময় টাইটানের নতুন খবর
চাঁদ ছাড়া সৌর জগতের অন্যান্য উপগ্রহের নাম খুব একটা পরিচিত না। তবে মহাকাশ বিষয়ে যাদের সামান্য আগ্রহও রয়েছে তারাই টাইটান নামটি জানেন। কারণ প্রাণের সম্ভাবনা থাকায় অনেক দিন থেকেই মহাকাশ বিষয়ক আলোচনার মধ্যমনি হয়ে আছে এই উপগ্রহটি। শনির উপগ্রহ টাইটান সম্বন্ধে এক নতুন খবর প্রকাশ করেছে নাসার জেপ প্রপালশন ল্যাবরেটরি, এই ২০শে মার্চে। ক্যাসিনি নভোযান থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষক দল জানিয়েছে, টাইটানের পুরু ভূত্বকের নিচে পানি এবং মিথেনের বিশাল সাগর থাকতে পারে। ব্যাপারটা আমার কাছে আরও মজার লেগেছে আরেকটি কারণে। গতকালই আর্থার সি ক্লার্কের করা ভবিষ্যৎবাণীগুলো অনুবাদ করেছি। ক্লার্ক এক জায়গায় বলেছেন, ২০৫৭ সালে মহাকাশ যুগের ১০০ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হবে। শুধু পৃথিবীতে নয়, একই সাথে চাঁদ, টাইটান, ইউরোপা ইত্যাদি জ্যোতিষ্কে বসবাসকারী মানুষেরা একসাথে এই দিবস পালন করবে। এটা পড়ার পর থেকেই চারটি উপগ্রহ নিয়ে নতুন যেকোন তথ্যের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
নতুন কিছু জানার পর তা নিয়ে আরও কিছু জানা হতে থাকে অবিরাম। লক্ষ্য করলে যে কেউ এই তত্ত্বের সত্যতা খুঁজে পাবেন নিজের জীবনে। সেই তত্ত্ব মেনে আর্থার সি ক্লার্কের প্রবন্ধটি অনুবাদ করার পরদিনই সাইন্স ওয়ার্ল্ডে পেয়ে গেলাম টাইটানের রমরমা খবর, যে খবরটার কথা বললাম এখানে। এই বিষয়ের গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক হলেন রাল্ফ লরেঞ্জ। লরেঞ্জ, জন হপকিন্স অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির ক্যাসিনি রাডার বিজ্ঞানী। লরেঞ্জ এ সম্বন্ধে কি বলেছেন, তা-ই দেখা যাক প্রথমে:
“জৈব বালিয়াড়ি, হ্রদ, প্রণালী আর পাহাড়, সব মিলিয়ে টাইটান হয়ে উঠেছিল সৌর জগতের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং সক্রিয় জ্যোতিষ্ক। এখন দেখা যাচ্ছে, পুরো সৌর জগতে পৃথিবীর সাথে সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশী এই টাইটানের। …আমরা আরও দেখছি, টাইটানের ঘূর্ণন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের কারণেই আমরা টাইটানের অভ্যন্তরভাগে অনুসন্ধান চালাতে পারি।”
ক্যাসিনি-হ্যোইগেন্স ১৯৯৭ সালে শনির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে শুক্র আর বৃহস্পতির সাথে দেখা করে পৌঁছে যায় গন্তব্যে। হ্যোইগেন্স সন্ধানী যান আর ক্যাসিনি নভোযান দুয়ে মিলে শুরু করে শনি চর্চা। শনির বলয় আর তার উপগ্রহগুলোর বিস্তর পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আবিষ্কৃত হয় টাইটানের বিস্ময়কর সব ফিচার। একটি নভোযান যখন কোন জ্যোতিষ্কের বেশ কাছ দিয়ে অতিক্রম করে তখন তাকে নভোযানটির ফ্লাইবাই বলে। ক্যাসিনি আর টাইটানের মধ্যে এরকম অনেকগুলো ফ্লাইবাই ঘটেছে। এসব ফ্লাইবাই থেকে টাইটান সম্বন্ধে অনেক তথ্যের সন্ধান মিলেছে। জানা গেছে টাইটানের বায়ুমণ্ডল অতি পুরু, তবে সে বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ক্যাসিনি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে। আর পুরো টাইটান বরফের পুরু স্তরে আবৃত। এই বরফ স্তরের নিচে পানি আর মিথেনের সাগর থাকতে পারে, এমন তথ্য কিভাবে বের করলো বিজ্ঞানীরা, সে কথাই বলবো এবার:
অভিযানের বিজ্ঞানীরা সবাই মিলে ক্যাসিনির সিনথেটিক অ্যাপার্চার রাডারের মাধ্যমে ২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের মে মাস পর্যন্ত টাইটানের প্রচুর ছবি ও তথ্য পেয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে ক্যাসিনি মোট ১৯ বার টাইটানকে ফ্লাইবাই করেছে। ফ্লাইবাইয়ের সময় টাইটানের পুরু জৈব বায়ুমণ্ডলের নিচে কি আছে তাও দেখতে পেয়েছে ক্যাসিনি, ক্যাসিনির চোখ দিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানী মহল। আর ক্যাসিনির সন্ধানী যান হ্যোইগেন্স তো স্বয়ং টাইটানে অবতরণ করেছে। এভাবে উপগ্রহটির ভূত্বকে প্রায় ৫০টি ভৌগলিক ফিচারের অবস্থান চিহ্নিত করেছেন তারা। আগে টাইটানের যে তথ্যগুলো পাওয়া গিয়েছিলো তার সাথে মেলানো হয়েছে নতুন তথ্যগুলো। মেলাতে গিয়েই বিস্মিত হয়ে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। দেখা গেছে টাইটানের কোন কোন ভৌগলিক ফিচার যেমন হ্রদ, প্রণালী বা পাহাড় সর্বোচ্চ ১৯ মাইল পর্যন্ত সরে গিয়েছে। অর্থাৎ টাইটানের ভূত্বকের ফিচারগুলো স্থান পরিবর্তন করছে। এটি কেবল তখনই সম্ভব, যদি পুরু এবং শক্ত ভূত্বকের নিচে কোন সাগর তথা তরল অংশের অস্তিত্ব থাকে। এই তরল অংশের কারণেই কেবল ভূত্বক নড়তে পারে। এ বিষয়ে জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী এবং এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক “ব্রায়ান স্টাইল্স” বলেছেন,
“আমরা বিশ্বাস করি, টাইটানের বরফ এবং জৈব পদার্থে নির্মিত পুরু বহিরাবরণের প্রায় ৬২ মাইল নিচে অ্যামোনিয়া মিশ্রিত তরল পানির সাগর রয়েছে।”
শনির ৭টি উপগ্রহের মধ্যে টাইটান সর্ববৃহৎ। এর বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর থেকে ১.৫ গুণ পুরু। ক্যাসিনি-হ্যোইগেন্স প্রেরণ করা হয়েছে কেবল শনি ও তার উপগ্রহগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। সফল হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ টাইটান জ্যোতির্জীববিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জীবন সৃষ্টির জন্য দুইটি জিনিস লাগে, পানি এবং জৈব অণু। দুটিই রয়েছে টাইটানে। তাছাড়া টাইটানের গভীর সমুদ্রে যে পরিবেশ বিরাজ করছে তা প্রাণের সৃষ্টির সময় পৃথিবীর পরিবেশের সমতুল্য। টাইটানের রহস্য উন্মোচিত হলে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের প্রক্রিয়া সম্বন্ধেও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীরা এই সবগুলো বিষয়ে খুব আশাবাদী। লরেঞ্জ এ সম্বন্ধে বলেন,
“টাইটান সম্বন্ধে পরবর্তী গবেষণায় অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। উন্মোচিত হবে তার তরল অভ্যন্তরভাগ। টাইটানের ভূত্বকের ঘূর্ণন এবং বায়ুমণ্ডলের বায়ুপ্রবাহের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক আছে। তাই বলা যায় পরবর্তী বছরগুলোতে জানা যাবে যে, টাইটানে ঋতু পরিবর্তন ঘটে।”
এ নিয়ে চারটি উপগ্রহে জলের সন্ধান পাওয়া গেল। অন্য তিনটি হচ্ছে: বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টো। টাইটান এদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর বলে মনে হচ্ছে। তাই বিস্তারিত জানতে হবে শীঘ্রই।
বেশিদিন আর আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না। এই ২৫শে মার্চই আবার টাইটানকে ফ্লাইবাই করতে যাচ্ছে ক্যাসিনি। এবার টাইটান পৃষ্ঠের ৬২০ মাইল উপর দিয়ে উড়ে যাবে সে। এবারের মূল উদ্দেশ্য থাকবে নিউট্রাল ম্যাস স্পেকট্রোমিটার দিয়ে টাইটানের উর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ। আর একদম কাছে যাওয়ার সাথে সাথে ক্যাসিনির ভিজ্যুয়াল ও অবলোহিত ম্যাপিং স্পেকট্রোমিটার দিয়ে টাইটানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের উচ্চ রিজল্যুশন ছবি তোলা হবে। ক্যাসিনি-হ্যোইগেন্স প্রেরণে ভূমিকা রেখেছিলো পৃথিবীর তিনটি বড় বড় মহাকাশ সংস্থা: নাসা, এসা এবং ইটালিয়ান স্পেস এজেন্সি। আর এটি নির্মাণ, পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার যাবতীয় পালন করেছে ক্যালটেকের জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি। প্যাসাডেনাতে এর নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি অবস্থিত। এখানেই বহির্জাগতিক প্রাণ আর জাগতিক প্রাণের মেলবন্ধনের আশায় বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।