টাইটান, এক মহাজাগতিক গবেষণাগার
১৬৫৫ সালের ২৫শে মার্চ নেদারল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হ্যোইগেন্স (Huygens) শনি গ্রহের টাইটান নামক উপগ্রহটি আবিষ্কার করেছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে সচরাচর যেমন হয়, যখন আবিষ্কৃত হয় তখন গুরুত্ব সহজে ধরা পড়ে না। হ্যোইগেন্স নিছক আকাশে দৃশ্যমান একটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন, আর দীর্ঘকাল পর বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে জানা গেল এই উপগ্রহের আদল অনেকটা পার্থিব গ্রহের মত। অর্থাৎ টাইটানের সুস্থিত ভূ-ত্বক আছে। বিজ্ঞানীরা একেবারে চেখে দেখেছেন বিষয়টি। ২০০৪ সালে প্রেরিত ক্যাসিনি-হ্যোইগেন্স নভোযানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল টাইটানের পূর্ণ মানচিত্র তৈরী। এই নভোযানের হ্যোইগেন্স নামক সন্ধানী যানটি টাইটানের ভূমিতে অবরতণ পর্যন্ত করেছে। এই ভূ-ত্বক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ সৌর জগতের বাইরের দিকের চারটি গ্রহের (বৃহস্পতি, শনি, ইউরোনাস ও নেপচুন) কোনটিরই ভূ-ত্বক নেই। শুধু ভূ-ত্বক দিয়েই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেনি টাইটান, অধুনা বিস্ময়কর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে একে নিয়ে। আমেরিকার “জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স“-এর ২৯শে জানুয়ারি (২০০৮) সংখ্যায় তেমনই একটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আর এই তথ্যটিই আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রথমেই তথ্যটি জানিয়ে দিচ্ছি-
নাসার ক্যাসিনি-হ্যোইগেন্স নভোযান থেকে প্রাপ্ত নতুন তথ্য: পৃথিবীতে সর্বসাকুল্যে যত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আছে তার থেকে কয়েক’শ গুণ বেশী তরল হাইড্রোকার্বন রয়েছে টাইটানে। এই হাইড্রোকার্বন ভূ-ত্বকের বহু নিচে লুকিয়ে নেই, বরং টাইটানের আকাশ থেকে হাইড্রোকার্বনের বৃষ্টি পড়ে। এই বৃষ্টির হাইড্রোকার্বন বিভিন্ন খাদে জড়ো হয়ে সৃষ্টি করে খাল ও নদীর।
![]()
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের বিজ্ঞানী রাল্ফ লোরন্ৎস। ক্যাসিনির রাডার থেকে এই তথ্য আদায়ের দায়িত্ব ছিল তার উপরই। তিনি বলেছেন, “পুরো টাইটান কার্বনবাহী পদার্থে আবৃত যা তাকে এক সুবৃহৎ জৈব রাসায়নিক যৌগের কানখানায় পরিণত করেছে”। প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিস্তারিত ভাবে বলছি এবার:
- ক্যাসিনির রাডার টাইটানের শতকরা প্রায় ২০ ভাগের মানচিত্র তৈরী করে ফেলেছে।
- মানচিত্রে কয়েক শত হ্রদ ও সাগরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের আশেপাশে অন্ধকারে আবৃত বালিয়াড়িতে বিরাজমান জৈব যৌগের পরিমাণ পৃথিবীর কয়লা মজুদের পরিমাণের থেকে বেশী।
- পৃথিবীতে মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিমাণ ১৩০ বিলিয়ন টন। টাইটানের একেকটি হ্রদেই এর সমপরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মিথেন ও ইথেন হিসেবে মজুত আছে।
তথ্যগুলো বুঝতে হলে টাইটানের পরিবেশ সম্বন্ধে কিছুটা জেনে নিতে হবে। সেখানে তাপমাত্রা ১৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতো নিম্ন তাপমাত্রায় সব হাইড্রোকার্বন জমে তরলে পরিণত হয় যার মধ্যে থাকেমূলত মিথেন ও ইথেন। আর “থোলিন” নামের আরেক ধরণের জৈব পদার্থ দিয়ে তরলভাগের আশপাশের বালিয়াড়িগুলো গঠিত হয়। আদিজৈবিক রাসায়নের যুগে বিদ্যমান জৈব পদার্থ বোঝাতে কার্ল সাগান এই থোলিন নামটি বেছে নিয়েছিলেন, ১৯৭৯ সালে। টাইটানের এই হ্রদ বা সাগরগুলোর গভীরতা সঠিকভাবে মাপা যায়নি, অনুমান করা হয়েছে কেবল। প্রতিটি জলাভূমির আশাপাশের পাহাড় ও বিস্তীর্ণ ভূমির প্রকৃতি পরীক্ষা করে সেই জলাভূমির গভীরতা অনুমান করা যায়। পৃথিবীর সাপেক্ষে এমন অনুমানের মাপকাঠি নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী টাইটানের হ্রদগুলোর গভীরতা অনুমান করা হয়েছে। পৃথিবীতে হ্রদগুরোর গড় গভীরতা ১০ মিটার। তবে টাইটানের কোন কোন হ্রদের গভীরতা এর থেকে বেশী।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে, এ নিয়ে এতো হৈ চৈ কেন। এতোকিছু জেনে কি লাভ? বিজ্ঞান সাধনা মানুষ লাভের কথা না ভেবে করলেও এ ধরণের মহাযজ্ঞের পিছনে লাভ না থেকে পারে না। প্রকৃতির প্রক্রিয়া অনুসন্ধানই এর মূল লক্ষ্য:
- মিথেন একটি গ্রিনহাউজ গ্যাস। তাই প্রচুর পরিমাণ মিথেনের কারণে টাইটানে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যা তার তাপমাত্রা ধরে রাখছে। কিন্তু মিথেন গ্যাস উপরে উঠতে উঠতে সহজেই বায়ুমণ্ডল ভেদ করে শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই তাই সেখানে মিথেন শূন্যতার সৃষ্টি হবে। ফলে তাপমাত্রা আরও কমে যাবে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতসহ আরও কয়েকটি কারণে মিথেনের পরিমাণ হঠাৎ কমে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে টাইটানের তাপমাত্রার পার্থক্য সূচিত হবে। আর সে তাপমাত্রায় পরিবেশটি হবে আরও আকর্ষণীয়, কারণ:
- আমাদের জীবজগৎ সম্পূর্ণ কার্বন-নির্ভর। সে ধরণের প্রতিকূল ও জটিল আবহমণ্ডলে কার্বনের বিবর্তন কিভাবে ঘটবে তা টাইটানের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। আর এর মাধ্যমে মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েও গবেষণা করা সম্ভব।
আগেই বলেছি হ্যোইগেন্স সন্ধানী যান টাইটান পৃষ্ঠে অবস্থান করছে, আর ক্যাসিনি নভোযান শনির আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু সময় পরপর ক্যাসিনি টাইটানের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। এ ধরণের ক্লোজ কন্টাক্টকে বলে “ফ্লাইবাই”। আজকেই ক্যাসিনি তার রাডার সামগ্রী নিয়ে আবার টাইটানের সাথে ফ্লাইবাইয়ে যাচ্ছে। আরও নাসার বিজ্ঞানী মহল গভীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে চাঞ্চল্যকর নতুন সব তথ্যের জন্য। আর আমার মনে টাইটান নিয়ে নতুন একটি পরীক্ষার চিন্তা আসছে: আমরা কি কৃত্রিমভাবে টাইটানে মিথেন সংকটের সৃষ্টি করতে পারি না?