“Did he train you? Did he rehearse you? Did he tell you what to do and what to say?”
আহত ও বেদনার্ত একটি চরিত্রের মুখে সিনেমার একেবারে শেষদিকে এই কথাগুলো শোনা যায়। ততক্ষণে আমরা চরিত্রটির প্রতি পুরোপুরি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছি। সে এমন এক নারীর প্রেমে পড়েছে যার কোন অস্তিত্ব নেই, এবং এই অস্তিত্বহীনাকে যে অস্তিত্ব দিয়েছিল সেই বাস্তব নারীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েই সে কথাগুলো বলছে। কিন্তু কাহিনী আরও স্পর্শকাতর। বাস্তবের নারীটি তার প্রেমে পড়ে গেছে, তাকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে নিজেই ফাঁদে পড়ে গেছে। আর পুরুষটি নিজের স্বপ্নকে রক্তমাংসের একজনের উপরে স্থান দিতে গিয়ে দুটোই হারিয়েছে।
এর উপরে আছে আরেক স্তর। আলফ্রেড হিচকক ইতিহাসের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রণকাতর চলচ্চিত্রকারদের একজন, বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলোর প্রতি। তার সব সিনেমাতেই ঘুরেফিরে নারী চরিত্রগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে: তাদের চুল সোনালী, তারা বরফ শীতল ও দূর দ্বীপবাসিনী, তারা এমন কিছু পোশাকের কারাগারে বন্দী যা কেতাদুরস্ত এবং বিশেষ করে কামনাব্যঞ্জক, তারা পুরুষদের পুরোপুরি সম্মোহিত করে ফেলে যে পুরুষদের আবার অধিকাংশ সময়ই কোন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকে, এবং এক সময় না এক সময় অবশ্যই হিচকক নারীরা লাঞ্ছিত হয়।
ভার্টিগো (১৯৫৮) হিচককের করা সেরা দুই বা তিনটি সিনেমার একটি এবং নিঃসন্দেহে এটিই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্বীকারোক্তিমূলক সিনেমা। কারণ তার আর্টকে যে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতো সেগুলো নিয়ে এখানে খুব খোলাসাভাবে কাজ করেছেন। হিচকক কিভাবে নারীদের ব্যবহার, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন তা নিয়ে ভার্টিগো। তার প্রতিনিধিত্ব করে স্কটি (জেমস স্টুয়ার্ট) যার মানসিক ও শারীরিক দুই দুর্বলতাই রয়েছে, যে একটি নারীর ছবিকে ভালবেসে ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে, যেন তেন নারী নয়, একেবারে হিচকক নারী। যখন সে তাকে পায় না তখন অন্য এক নারীকে তার মত পোশাক-মেকআপ পড়িয়ে, চুল রাঙিয়ে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন রূপ দেয়ার চেষ্টা করে যাতে তাকে হুবহু সেই রমণীর মত লাগে। এই পুতুল নারীর প্রতি তার কোন দয়া নেই, তাকে সে একটুও গ্রাহ্য করে না, নিজের স্বপ্নের বেদিতে তাকে অনায়াসে উৎসর্গ করতে পারে।
কিন্তু অবশ্যই যে নারীকে সে রচনা করছে এবং যাকে সে কামনা করে তারা একই। মেয়েটির নাম জুডি (কিম নোভাক); তাকে স্বপ্নের নারী, অর্থাৎ ম্যাডেলিনের ভূমিকায় অভিনয় করতে ভাড়া করা হয়েছিল এমন একটি খুনের মঞ্চ সাজানোর জন্য যা সম্পর্কে স্কটির মনে একটুও সন্দেহ জাগেনি। ভয়ংকর ফাঁদের শিকার হওয়ার বিষয়টি জানার পর সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, যদিও সব হিচকক পুরুষের মতোই তার মধ্যে কেবল এক ধরণের সুশীতল উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশই ঘটে। সে চিৎকার করে বলে: “Did he train you?…”- প্রতিটি অক্ষর তার হৃদয়ে একেকটি ছুরিকাঘাত, তারপরও পুরো কথাটা বের না করে থাকতে পারে না- সে যে নারীর আদলে জুডিকে গড়ে তুলতে চাচ্ছিল সেই স্বপ্নের নারীই আরেকজন পুরুষের সৃষ্টি। সেই পুরুষ কেবল স্কটির নারীই কেড়ে নেয়েনি, তার স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে।
এটা ভার্টিগোর একেবারে কেন্দ্রে একটি নৈতিক আপাতস্ববিরোধিতার জন্ম দেয়। অন্য পুরুষটি অর্থাৎ গেভিন (টম হেলমোর) এই নারীর প্রতি যা করেছে সে নিজেই তো তা করতে চেয়েছিল। এই পুতুল খেলার মধ্যবিরতিতে মেয়েটি গেভিনের বদলে স্কটির প্রতি অনুগত হয়ে পড়ে, এবং শেষদিকে টাকার জন্য নয় বরং ভালবাসার জন্য অভিনয় করতে থাকে।
এই সব সুতো একত্রিত হয় হিচককের চলচ্চিত্র জীবনের সেরা দৃশ্যে। স্যান ফ্রান্সিস্কো পুলিশ বিভাগের প্রাক্তন গোয়েন্দা স্কটিকে তার বন্ধু গেভিন ভাড়া করেছিল তার স্ত্রী ম্যাডেলিনকে অনুসরণ করার জন্য। তা করতে গিয়ে স্কটি মেয়েটির প্রতি ভয়ানক আসক্ত হয়ে পড়ে। এরপর মনে হয় ম্যাডেলিন মারা গেছে। এ আপাত মৃত্যুর পর একদিন কাকতালীয়ভাবে স্কটি জুডিকে দেখে; সে দেখতে ম্যাডেলিনের মত, যেন তার আরও কামনাময়ী ও স্বল্প মার্জিত একটি সংস্করণ। অবশ্যই সে বুঝতে পারে না যে দুজন একই নারী। সে তাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানায় এবং জুডি বেশ অপরিণামদর্শীর মতই রাজি হয়ে যায়। তাদের স্বল্পস্থায়ী অদ্ভূত ও আড়ম্বরপূর্ণ অভিসারের সময় মেয়েটি স্কটির প্রতি করুণা ও মায়া অনুভব করে। সুতরাং স্কটি যখন তাকে ম্যাডেলিনের মত করে সাজানোর প্রস্তাব দেয়ে তখন আহত হলেও দ্বিতীয়বারের মত একই চরিত্রে অভিনয় করতে সম্মত হয়।
সেরা দৃশ্যটি ঘটে হোটেলের ঘরে, নিয়ন আলোর আবেশে। জুডি পার্লার থেকে ঘরটিতে ফিরে আসে। স্কটি সন্তুষ্ট হয় না কারণ তাকে হুবহু ম্যাডেলিনের মত দেখাচ্ছে না, একই পোশাক পড়লেও তার নির্দেশনা মত চুল সাজানো হয়নি। জুডির চোখ ঈর্ষায় জ্বলে উঠে। সে বুঝতে পারে তার প্রতি স্কটি নির্বিকার, তাকে সে কেবলই একটি বস্তু হিসেবে দেখে যাকে ইচ্ছামত গড়ন দেয়া যাবে। কিন্তু ভালবাসে বলে সে সব মেনে নেয়। স্নানঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চুলের সাজ পাল্টায়, তারপর দরজা খুলে যখন স্কটির দিকে হেঁটে আসে তখন মনে হয় সে যেন একটি অলক্ষুণে সবুজাভ ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে। নিয়ন আলো দিয়েই এই অদ্ভুতুড়ে ধোঁয়াশা ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি স্বপ্নদৃশ্য।
হিচকক এ সময় স্কটি ও জুডির মুখ একের পর এক দেখাতে থাকেন। জুডির মুখে দেখা যায় অসীম বেদনা ও দুঃখের মাঝেও সন্তুষ্ট করার বাসনা, আর স্কটির মুখে পরম লালসা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হওয়ার আনন্দ। তবে আমরা দুজনেরই হৃদয় ভেঙে যাওয়ার বেদনা অনুভব করি: তারা দুজনেই একটি ছবির দাসে পরিণত হয়েছে, যে ছবি এমন এক ব্যক্তি তৈরি করেছে যে এই ঘরেও নেই। গেভিন “ম্যাডেলিন”-কে তৈরি করেছিল নিজের স্ত্রীকে হত্যা করে পার পাওয়ার জন্য।
স্কটি যখন “ম্যাডেলিন”-কে জড়িয়ে ধরে তখন এমনকি পটভূমিও পরিবর্তিত হয়ে যায়, ঘরটি বাস্তব দৃশ্যের পরিবর্তে স্কটির একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিতে ভরে ওঠে। বার্নার্ড হারমানের সুর এক ধরণের ভয়কাতর ও অস্থির ব্যাকুলতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এবং ক্যামেরা হতাশাজনকভাবে তাদেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, অনেকটা স্কটির স্বপ্নে দেখা কাগজের চরকার মত। ক্যামেরার ঘূর্ণন চলতেই থাকে যতক্ষণ না দৃশ্যটির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে মানুষের কামনা-বাসনার নিরর্থকতা। জীবনকে আমাদেরকে সুখী করতে বাধ্য করা যে সম্ভব নয়- সেই সত্যই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। মনস্তাত্ত্বিক, শৈল্পিক ও কারিগরি দিক দিয়ে প্রচণ্ড জটিল এই দৃশ্য বোধহয় হিচককের সমগ্র ক্যারিয়ারের একমাত্র মুহূর্ত যখন তিনি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করেছেন, তার বিষাদ ও আসক্তির পুরোটাই। (এটা কি কেবলই কাকতালীয় যে মেয়েটির নাম ম্যাডেলিন- একটি ফরাসি বিস্কুটের নাম- যা বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের গল্পে শৈশবের স্মৃতি ও ব্যাকুলতাকে বানের জলের মত উঠিয়ে আনে?)
আলফ্রেড হিচকক সর্বজনীন অনুভূতি যেমন ভয়, অপরাধবোধ, লালসা ইত্যাদি একেবারে সাধারণ কিছু চরিত্রের মধ্যে স্থাপন করেছেন এবং তাদের সেই অনুভূতিগুলোকে শব্দের চেয়ে ছবির মাধ্যমে বেশি প্রকাশ করেছেন। তার সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত চরিত্র- ভুলক্রমে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নিরপরাধ ব্যক্তি- আসলে অনেক গভীর আত্মপরিচয়বোধ থেকে উৎসারিত; এ যুগের বাগাড়ম্বরপূর্ণ অগভীর সুপারহিরো অ্যাকশন সিনেমাগুলো যার ধারেকাছেও যেতে পারবে না।
হিচকক দুই দিক থেকে একজন বিশাল ভিজ্যুয়াল শিল্পী: তিনি খুব অবশ্যম্ভাবী কিছু ছবি নিয়ে খুব সূক্ষ্ণ প্রেক্ষাপট স্থাপন করেন। যেমন জেমস স্টুয়ার্টের চরিত্রের ভার্টিগো অর্থাৎ উচ্চতাভীতি খুব স্বাভাবিক একটি দৃশ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে। শুরুর একটি দৃশ্যে একটি ছোট মইয়ের মত চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে তাকে নিচের রাস্তার দিকে তাকাতে দেখা যায়। তাকানোর মুহূর্তটিতে ফ্ল্যাশব্যাকে আমরা তার পুলিশের চাকরি ছাড়ার কারণটি দেখতে পাই। একটি খ্রিস্টান মিশনের ঘণ্টার টাওয়ার তাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে।
হিচকক একটি বিখ্যাত দৃশ্যের মাধ্যমে স্কটির দৃষ্টিভঙ্গি দেখান, আমাদেরকে টাওয়ারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে। তিনি ক্যামেরার লেন্স জুম করেন এবং একইসাথে পুরো ক্যামেরাটিকে পেছনের দিকে টানেন, এতে মনে হয় দেয়াল একইসাথে সামনে ও পেছনের দিকে যাচ্ছে। হিচকক সৃজিত এই স্থান কেবল দুঃস্বপ্নের যুক্তি দিয়েই সিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু একইসাথে লক্ষ্যণীয় কিভাবে তিনি খুব সূক্ষ্ণভাবে অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমার মধ্যে পতনের অনুভূতিগুলো গেঁথে দিয়েছেন। যেমন, স্কটির গাড়ি সবসময় স্যান ফ্রান্সিস্কোর পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নামে, কখনও উপরে ওঠে না; এবং দেখার বিষয় কিভাবে স্কটি সত্যিকার অর্থেই ভালবাসায় “পতিত” হয়।
আরও একটি উপাদান ভার্টিগো সিনেমাকে মহান করেছে যা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। শুরুতে সিনেমাটি কেবলই ম্যাডেলিনকে নিয়ে ছিল, কিন্তু যে মুহুর্তে আমরা গোপন সত্যটি জানতে পারি তখন থেকে তা একই পরিমাণ জুডিকে নিয়ে: তার বেদনা, তার হানি, যে ফাঁদে সে পতিত তার সবকিছু নিয়েই। হিচকক পুরো গল্পটাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে দুটি চরিত্র যখন মিশন টাওয়ারের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে, তখন আমরা দুজনের সাথেই নিজিদের যুক্ত করতে পারি, দুজনের জন্যই আমাদের ভয় হয়, এবং একদিক থেকে চিন্তা করলে জুডিকে স্কটির তুলনায় কম অপরাধী মনে হয়।
তবে নোভাক অভিনীত জুডি চরিত্রটিকে স্কটি যেমন বস্তু হিসেবে দেখে অনেক দর্শকও সেভাবে দেখে ফেলতে পারেন যা বেশ বিপদের কথা। আসলে জুডি হিচককের সব সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে সহানুভূতিশীল চরিত্রগুলোর একটি।
হিচকক বারংবার তার সিনেমার নারী চরিত্রগুলোকে আক্ষরিক এবং আলঙ্কারিক অর্থে অপদস্ত করেছেন, তাদেরকে মাটিতে দলেছেন, তাদের চুল এবং কাপড় নষ্ট করেছেন; এসবের মাধ্যমে অনেকটা যেন নিজের ফেটিশগুলোকেই কশাঘাত করেছেন। ভার্টিগোর জুডির মাধ্যমে তিনি নিজের গল্পের বলি হওয়া কোন নারীর প্রতি সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশী সহানুভূতি দেখিয়েছেন। আর নোভাক, জুডির চরিত্রটি বেশি অনমনীয় ভাবে করার জন্য প্রথমে যার সমালোচনা করা হয়েছিল, আসলে অভিনয়ের ক্ষেত্রে ঠিক সিদ্ধান্তগুলোই নিয়েছিলেন। নিজেকে জিজ্ঞাস করুন আপনি অসহনীয় কষ্টের মধ্যে থাকলে কিভাবে চলতেন, কিভাবে কথা বলতেন, তারপর আবার জুডির দিকে তাকান।
লেখক – রজার ইবার্ট
অনুবাদ – শিক্ষানবিস
প্রথম প্রকাশ – চলচ্চিত্র উইকি






